আপেলের খোসাই সবচেয়ে উপকারী

0
176

বলা হয়ে থাকে, মাত্র তিনটি আপেল এই দুনিয়া পাল্টে দিয়েছে। এক আপেলের কারণে আদম (আঃ) স্বর্গচ্যুত হন। আরেক আপেলের কারণে নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তিতত্ত্ব আবিষ্কার করেন। বাকি আপেলটি হচ্ছে অ্যাপল কম্পিউটার।

তারপরও গাছ থেকে আপেল পড়ছিল, পড়ছে এবং পড়তে থাকবে। এটি এক ধরনের ফল, যা রোসাসি গোত্রের ম্যালিয়াস ডমেস্টিকা প্রজাতিভুক্ত। আপেল গাছ ৫ থেকে ১২ মিটার দীর্ঘ এবং চওড়া ও শাখা-প্রশাখাযুক্ত শীর্ষভাগবিশিষ্ট বৃক্ষ। আপেল ফল হেমন্তকালে পাকে এবং ৫-৮ সেন্টিমিটার ব্যাসের হয়।

সাধারণভাবে আপেল অ্যাসপিরিনের বিকল্প হিসেবে কাজ করে। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা গেছে, আপেলে রয়েছে এমন একটা রাসায়নিক যৌগ, যা অ্যাসপিরিনের ব্যথানাশক উপাদান। আর সেটি হলো সেলিসাইলেট বা সেলিসাইলিক অ্যাসিড। উল্লেখ্য, সেলিসাইলেট একটি এন্টিননফ্লামেটরি যৌগ। শুধু ব্যথানাশক হিসাবেই নয়, অন্ত্রের ক্যান্সার, এথেরোসেক্লরোসিস রোধ করতেও আপেলের ভূমিকা রয়েছে। আপেল ছাড়াও বেরি জাতীয় ফল আর শাকসবজিতেও সেলিসাইলেট পাওয়া যায়।

পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে একটা জনপ্রিয় প্রবাদ হচ্ছে ‘প্রতিদিন একটি করে আপেল খেলে তা একজন ডাক্তারকে দূরে সরিয়ে দেয়’। প্রকৃত অবস্থাটা তা-ই। কারণ আপেল কিডনির ক্যান্সার রোধ করে। সুইডিশদের মধ্যে কিডনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার হার সবচেয়ে বেশি। তাই সুইডিশদের ওপর আপেলের এই গুণটি নিয়ে একটি গবেষণা চালানো হয়েছিল। গবেষকরা কয়েকজনকে প্রতিদিন একটি করে আপেল খাইয়ে দেখতে পান, যারা প্রতিদিন একটি করে আপেল খেয়েছেন তাদের কিডনির ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অন্যদের তুলনায় অনেক কমে গেছে। কমলা, গাঢ় সবুজ শাকসবজি ও গাজরেও একই উপকারিতা পাওয়া যায়।

আপেলে ট্যানিন নামক এক প্রকার রাসায়নিক পদার্থ থাকে। আপেলে এটার ঘনমাত্রা নির্ভর করে ঋতু ও আপেলের পরিপক্বতার ওপর। আপেল সবুজ থাকলে ট্যানিনের পরিমাণ বেশি থাকে এবং পরিপক্বতার সঙ্গে সঙ্গে পরিমাণ কমতে থাকে। আপেল কেটে টুকরা করে রাখলে ট্যানিন বায়ুর সংস্পর্শে আসে। আর আপেলে থাকা কিছু এনজাইমের জন্য বাতাসের অক্সিজেনের সঙ্গে ট্যানিনের বিক্রিয়ায় অক্সাইড তৈরি হয়, যা আপেলের টুকরোয় কমলা রঙের আভা তৈরি করে।

সম্প্রতি চীনের ইউনিভার্সিটি অব হংকংয়ের একদল গবেষকের একটি গবেষণা রিপোর্ট ‘জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড ফুড কেমিস্ট্রিতে প্রকাশিত হয়েছে। এতে বলা হয়, মানবদেহে এমন কিছু ক্ষতিকর উপাদান থাকে, যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেহের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করে দেয়। যার ফলে দেহে দেখা দেয় বিভিন্ন বার্ধক্যজনিত সমস্যা। সেই ক্ষতিকর উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে দেহে প্রতিরোধ গড়ে তোলা না গেলে বয়সের তুলনায় বেশি বুড়ো হয়ে যায় মানুষ।

তারা বলেন, আপেলের অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের নাম পলিফেনালস। এই যৌগটির কারণে আপেল শুধু বার্ধক্যকেই দূরে রাখে না, আয়ুও বাড়ায়। বয়স্ক ব্যক্তিরা প্রতিদিন যদি একটি করে আপেল খান তাহলে তারা অনেক বছর সুস্থ, সবল এবং কোনো প্রকার বার্ধক্যজনিত রোগ ছাড়াই চলতে, ফিরতে ও শান্তিতে বেঁচে থাকতে পারবে।

অন্য এক গবেষণায় দেখা গেছে, আপেলের খোসায় রয়েছে অরসলিক অ্যাসিড, যা মানবদেহের পেশির ক্ষয়রোধ করে। রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের মাত্রা কমায়। নিয়ন্ত্রণে রাখে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে সুগারের মাত্রা। তাই আপেল খেতে হবে খোসাসহ। গবেষণাটি করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী ড. ক্রিস্টোফার অ্যাডামস। এটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে সেল মেটাবোলিজম জার্নালে।

গবেষকরা বলেন, লাল রংয়ের আপেলের খোসায় অপেক্ষাকৃত বেশি কুয়েরসিন থাকে। অর্থাৎ জুস নয়, খোসাই বেশি উপকারী। কুয়েরসিনসমৃদ্ধ অন্যান্য উৎস হচ্ছে কালোজাম ও রসুন।

অনেকক্ষণ মুখে কিছু না দিলে মুখ শুকিয়ে যায়। সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা হয় তা হলো মুখে একটা খারাপ গন্ধ হয়। এসব ক্ষেত্রে একটা আপেল খেয়ে নিলে মাউথওয়াশের কাজ হবে। মুখে ফিরে আসবে সজীবতা। অস্বস্তিকর গন্ধটাও থাকবে না। বাড়তি পাওনা হিসাবে পুষ্টি তো পাচ্ছেনই।

মানব শরীর সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখতে প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ ফলমূল খাচ্ছে। তবে যিশু খ্রিস্টের জন্মের ছয় হাজার ৫শ বছর আগেই মানুষ উপকারী যে ফলটির সঙ্গে সবচেয়ে বেশি পরিচিত, তার নাম আপেল। এতে স্বল্প পরিমাণে থাকে চর্বি ও ক্যালোরি। আপেলে আরো আছে ভিটামিন-এ ও ভিটামিন-সি, পটাসিয়াম, ফসফরাস, ম্যাগনেসিয়াম, বোরন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। সবকিছু মিলিয়ে আপেল পুষ্টিকর খাবারের মধ্যে অন্যতম। এ ফলটি নিয়মিত খেলে ক্যালসিয়াম বা আয়রনের ঘাটতি সহজেই পূরণ হয়ে যায়। দাঁতে নানা কারণেই সমস্যা দেখা যায়। আপেল খেলে দাঁতের রোগ কেবল নির্মূলই হয় না, দাঁত শক্তিশালীও হয়। রক্ত পরিসঞ্চালন স্বাভাবিক থাকে।

আপেলের আদি নিবাস মধ্য এশিয়া। কিরগিজস্তান, তাজাকিস্তান ও কাজাখস্তানে আপেলকে আলমা বলা হয়। ধারণা করা হয়, আলমা থেকেই ফলটির নাম হয়েছে আপেল। আপেলের সমতুল শব্দ চেকে jablko, ডাচে appel, ফিলিপিনোতে mansanas, ফিনিশে omena, ফ্রেঞ্চে pommes, জার্মানে apfel, ইতালিয়ানে mela, লাতিনে pomum, মালয়ে epal, নরওয়েজিয়ানে eple, পর্তুগিজে maca, স্পেনিশে manzana, তুর্কিতে elma ও ওয়েলশে afal।

গ্রিক পুরাণে রয়েছে, একদা দেবতা জিউস অলিম্পাস পর্বতে এক বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। মহাবীর প্যালেয়াসের সঙ্গে জলদেবী থেতিসের বিয়ে। সে বিয়েতে সব দেব-দেবীকে দাওয়াত দেয়া হয়, শুধু কলহ আর মতভেদের দেবী এরিসকে বাদ দিয়ে। এরিস এতে খুবই রেগে গিয়ে অনুষ্ঠানের দিন হেসপেরিদাসের বাগান থেকে একটি সোনালি আপেল নিয়ে অনুষ্ঠানে ছুড়ে মারেন, যেটার গায়ে লেখা ছিল ‘সবচেয়ে সুন্দরীর জন্য’।

দেবী ‘হেরা’, ‘এথিনা’ এবং ‘আফ্রোদিতি’ দেবতা জিউসের কাছে আপেলটি দাবি করেন। জিউস পক্ষপাত না করে, সুন্দরী নির্ধারণের দায়িত্ব ট্রোজান বীর প্যারিসকে দিয়ে দেন।

নির্ধারিত দিনে তিন দেবী আইদা ঝরনায় গোসল করে বিবস্ত্র হয়ে আইদা পর্বতে প্যারিসের সামনে এসে দাঁড়ান। তিনজনই এত সুন্দরী ছিলেন যে প্যারিস কাউকেই নির্বাচন করতে পারলেন না। তখন তিনজনেই প্যারিসকে নজরানার লোভ দেখিয়ে তাদের বিজয়ী করার অনুরোধ জানান।

হেরা প্যারিসকে ইউরোপ ও এশিয়ার রাজা বানানোর কথা বলেন। এথিনা তাকে সর্বাধিক জ্ঞান ও যুদ্ধকৌশল শেখানোর প্রস্তাব দেন। আর আফ্রোদিতি তাকে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী নারীকে পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখান, যিনি ছিলেন স্পার্টার রানী, রাজা ম্যালেনাউসের স্ত্রী হেলেন। প্যারিস আফ্রোদিতির নজরানা গ্রহণ করে তার হাতে আপেলটি তুলে দেন। প্রকৃতপক্ষে সবচেয়ে সুন্দরী ছিলেন হেরা। পরে হেলেনকে নিয়ে যাওয়ার জন্যই গ্রিকরা ট্রয় আক্রমণ করে। শুরু হয় ট্রোজান যুদ্ধের, ধ্বংস হয় ট্রয় নগরী।

এই কারণে বিভিন্ন সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে আপেলকে বলা হয়েছে নিষিদ্ধ ফল। গ্রিক পুরাণেও আপেলকে নিষিদ্ধ ফল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো কট্টর খ্রিস্টানরাও এক সময় আপেল খেতেন না। তাদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, আপেল অনিষ্টকারী ফল। এ ফল খাওয়ার কারণেই অ্যাডাম ও ইভ স্বর্গ থেকে বিতাড়িত হন। তবে এসবের প্রচলন সত্ত্বেও এ ফলের জনপ্রিয়তা দাবিয়ে রাখা যায়নি। এ সুস্বাদু ফলটির প্রসার হয়েছে দুনিয়াজুড়ে। যত ফল আছে সম্ভবত তার মধ্যে আপেলই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ফল।

আপেল ইউরোপে ছড়িয়েছে বিশ্ববিজয়ী বীর আলেকজান্ডারের মাধ্যমে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে তিনি মধ্য এশিয়ার কয়েকটি দেশ জয় করে দেশে ফেরার সময় বেশ কিছু আপেল গাছ সঙ্গে করে নিয়ে যান। সেগুলো রোপণ করেন নিজ দেশ গ্রিসে। আবহাওয়া এ ফলের উপযোগী হওয়ায় আপেল গাছের দ্রুত বিস্তার ঘটে তার মাতৃভূমিতে। এখান থেকেই এই ফলের চাষ দ্রুত ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। উত্তর আমেরিকায় আপেলের চাষ শুরু হয় ১৬০০ সালে।

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে হেরাক্লেস ছিলেন গ্রিক মহাবীর। তার আরেক নাম হারকিউলিস। বস্তুত হেরাক্লেস থেকে হারকুলেস, আর হারকুলেস থেকে হারকিউলিস নামের উদ্ভব ঘটে।

সোনার আপেলের খোঁজে হেরাক্লেস অনেক বিশাল পথ পাড়ি দিয়েছিলেন। গ্রিস থেকে অনেক দূরে হেস্পিরিডিস নামক এক জায়গায় ছিল সোনার আপেল।

হেরাক্লেস লিবিয়া, মিসর, ইথিওপিয়া, এশিয়া অতিক্রম করে অ্যাটলাস পর্বতে পৌঁছান। যাত্রা পথে হেরাক্লেসের সঙ্গে দেখা হয় প্রমিথিউসের। প্রমিথিউস তাকে আরেক মহাবীর আতলান্ত্যসের সঙ্গে দেখা করতে পরামর্শ দেন। তার জন্যই অ্যাটলাস পর্বতে ঁেপৗছলেন হেরাক্লেস। গ্রিকরা বিশ্বাস করত অ্যাটলাস পর্বতে আকাশ মাটিতে গিয়ে মিশেছে এবং আতলান্ত্যস নিজেই পৃথিবীর ওপর অর্ধবৃত্তাকার মহাকাশ ধরে রেখেছেন। এই বীরের নামানুসারেই পরবর্তীতে আটলান্টিক মহাসাগরের নামকরণ হয়।

হেরাক্লেস প্রমিথিউসের কথানুসারে আতলান্ত্যসকে সোনার আপেল পেড়ে আনতে পাঠালেন। আতলান্ত্যস যখন আপেল পাড়তে গিয়েছিলেন তখন হেরাক্লেসকেই নিজের কাঁধে আকাশ ধরে রাখতে হয়েছিল। প্রচণ্ড ভারে যদিও তার পা হাঁটু পর্যন্ত ডেবে যায়, তবুও আতলান্ত্যস ফিরে না আসা পর্যন্ত হেরাক্লেস আকাশ কাঁধে নিয়েই অপেক্ষা করেন।

LEAVE A REPLY