ইতিহাস প্রণয়নের স্বার্থেই মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি রাজাকারদের তালিকা জরুরি

একান্ত সাক্ষাৎকারে যশোরের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার রাজেক আহমেদ

0
69
বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশনার্থে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে যশোর জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের কমান্ডার রাজেক আহমেদের সাক্ষাতকার গ্রহণ করছেন মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও দৈনিক আমার কাগজ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ফজলুল হক ভূইয়া রানা

ফজলুল হক ভূইয়া রানা:
“স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক অতিবাহিত হবার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি না হওয়া জাতির জন্য লজ্জাষ্কর ও দুঃখজনক। অন্যদিকে স্বাধীনতা বিরোধীদের চিহ্নিত করতে না পারাটাও বড় ব্যর্থতা। মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস প্রণয়ন এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার স্বার্থেই মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার-আলবদরদের শনাক্ত করতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা এবং রাজাকারদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা করা জরুরি।”
কথাগুলো বলছিলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ যশোর জেলা ইউনিটের কমান্ডার রাজেক আহমেদ। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা ও গ্রন্থ প্রকাশনার্থে তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গত ১৯ ও ২০ অক্টোবর বৃহত্তর যশোর জেলা সফরকালীন তাঁর এ সাক্ষাতকার গ্রহণ করা হয়।
শুরুতে রাজেক আহমেদ স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে বলেন, মুক্তিযুদ্ধে যশোরবাসীর রয়েছে গৌরবময় ইতিহাস। তিনি জানান, পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে সহযোগী অন্যদের নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারত চলে যান। পরে ভারতের উত্তর প্রদেশের দেরাদুনে গিয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেখানে জেনারেল ওভান, মেজর আর কে মালদোভা, লে. কর্ণেল পি পি পুরকায়স্থ প্রমুখ ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের তত্ত¡াবধানে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স (বিএলএফ) বা ‘মুজিব বাহিনীর’ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। রাজেক আহমেদ প্রথম ব্যাচে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। বৃহত্তর যশোর অঞ্চলে বিএলএফ প্রধান ছিলেন আলী হোসেন মনি এবং ডেপুটি প্রধান ছিলেন শেখ রবিউল আলম। প্রশিক্ষণ শেষে যশোর এসে আলী হোসেন মনি’র নেতৃত্বে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন ও যুদ্ধে অংশ নেন রাজেক আহমেদ।
আলাপচারিতায় তিনি বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীনতার সাড়ে চার দশক অতিবাহিত হবার পরও এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা সম্পন্ন হয়নি। অন্যদিকে যে প্রক্রিয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা হচ্ছে তাতে একদিকে যেমন দুর্নীতি-অনিয়মের সুযোগ থাকছে, তেমনি তালিকা হচ্ছে ত্রæটিপূর্ণ। তাঁর মতে, সঠিক তালিকা করতে হলে সারা দেশে একযোগে কাজ করতে হবে। অর্থাৎ একদিন সময় নির্ধারণ করে দিয়ে যাচাই-বাছাই কাজ করতে হবে। এক্ষেত্রে স্থানীয় প্রবীণ ও বয়োবৃদ্ধদের উপস্থিতিতে শুনানি হবে। একাত্তুরে স্থানীয় পর্যায়ে যারা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন, যাচাই প্রক্রিয়ায় তাঁদের উপস্থিতিও নিশ্চিত করতে হবে। তখন কেউ অসত্য তথ্য কিংবা জালিয়াতির চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিক তার প্রতিবাদ আসবে। প্রয়োজনে ক্রস চেকের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য জানা সম্ভব। তাছাড়া একই দিন একই প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাই হলে কেউ একাধিক স্থানে গিয়ে ফায়দা নেয়ার সুযোগ পাবে না।
অন্যদিকে ভবিষ্যত প্রজন্ম যাতে স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস জানতে পারে এবং তাদের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চিরঞ্জীব রাখতে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশাপাশি স্বাধীনতা বিরোধী ও পাক হানাদার বাহিনীর এ দেশীয় সহযোগী রাজাকার-আলবদর-আল শামস সদস্যদের তালিকা করে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ প্রসঙ্গে তিনি রাজনৈতিক নেতৃত্বের অদূরদর্শিতায় আক্ষেপ করে বলেন, স্বাধীনতা বিরোধী অনেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে ঢুকে পড়েছে। এ প্রক্রিয়ায় তারা শুধু পুনর্বাসিত হননি, নেতৃত্বের আসনেও বসেছেন। এমনকি স্বাধীনতার স্বপক্ষ শক্তির বিভাজনেও কলকাঠি নাড়ছেন। কাজেই এদের চিহ্নিত করে রাজনীতিকে পরিশুদ্ধ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
রাজেক আহমেদ বলেন, মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় হচ্ছে আমাদের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ অর্জন। এ স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব নতুন প্রজন্মের। কাজেই স্বাধীনতার প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছাতে হবে। এ জন্য পাঠ্যপুস্তকে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সন্নিবেশিত করা ছাড়াও শিক্ষার্থীদের সেটি আত্মস্থ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষার্থীদের অন্তত সপ্তাহে একদিন জাতীয় পতাকা হাতে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে পাঠদান করতে হবে। সেখানে জাতীয় পতাকার গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল এবং কিভাবে স্বাধীনতা অর্জন হয়েছে তা বুঝাতে হবে।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, দেশ স্বাধীন হয়েছে বলেই আজ অনেকে বড় বড় চেয়ারে বসার সুযোগ পাচ্ছেন। অথচ যাঁদের ত্যাগের বিনিময়ে এই অর্জন সেইসব মুক্তিযোদ্ধাদের যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। কাজেই মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান প্রদানের বিষয়টি সাংবিধানিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। যাতে সরকার পরিবর্তন হলেও সম্মানের ক্ষেত্রে হেরফের না হয়। তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সাংবিধানিকভাবে ‘জাতীয় বীর’ ঘোষণার দাবি জানান। একই সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পৃথক পরিচয়পত্র এবং তাঁদের ভিআইপি মর্যাদা প্রদানের দাবি জানান। তাঁর মতে, মুক্তিযোদ্ধাদের যাতায়াতে রাষ্ট্রীয় পরিবহনে (সড়ক, রেল ও বিমান) বিশেষ সুবিধা প্রদান করতে হবে। তাছাড়া মুক্তিযোদ্ধারা কোনো কাজে সরকারী দফতরে গেলে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তাদের সেবা করেন এবং কোনো হয়রানির শিকার না হন- এ সংক্রান্ত সরকারী নির্দেশনা জারির দাবি জানান এ বীর মুক্তিযোদ্ধা। তিনি বলেন, ১৬ ডিসেম্বর কিংবা ২৬ মার্চ এ দুইদিন স্থানীয়ভাবে প্রশাসন আয়োজিত অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধাদের আমন্ত্রণ জানানো হলেও বছরের বাকী সময় তাঁদের খোঁজ কেউ নেয় না। এ সময় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে আরো বলেন, সারা দেশেই মুক্তিযোদ্ধাদের বৃহৎ সাংগঠনিক কাঠামো হচ্ছে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। তবে মেয়াদ উত্তীর্ণের কারণে সরকারের নির্দেশে সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব বর্তেছে স্থানীয় প্রশাসনের ওপর। দুর্ভাগ্যজনকভাবে যশোরের জেলা প্রশাসন সংসদ নিয়ে ছিনিমিণি খেলা খেলছে। তারা যশোরে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কার্যালয় সিলগালা করে রেখেছে। ফলে মুক্তিযোদ্ধারা অবসর সময়ে গিয়ে কোথাও বসারও সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে সংসদের কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাদের নামে চাঁদাবাজি অব্যাহত রয়েছে বলে রাজেক আহমেদের অভিযোগ।

LEAVE A REPLY