কলমই ছিল তার সারাজীবনের বন্ধু

0
2
আব্দুস সালাম। ছবি: সংগৃহীত

রেহানা সালাম:

তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে আজকের তরুণ সাংবাদিকদের অনেকেই চেনেন না আব্দুস সালামকে। অথচ বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ইতিহাসে চির অম্লান, চির অক্ষয় হয়ে আছে যে তিন সম্পাদকের অবদান, তাদেরই অন্যতম আব্দুস সালাম।

তিনি ছিলেন ভাষা আন্দোলনে কারাবরণকারী প্রথম সম্পাদক, সাবেক পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য, বাংলাদেশ অবজারভারের সাবেক সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রেস ইন্সটিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা মহাপরিচালক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। গতকাল ২ আগস্ট ছিল তার ১০৯তম জন্মবার্ষিকী।

এ দেশে সত্যভাষণ কখনও ক্ষমতাসীনদের কাছে কাম্য নয়। বিশেষ করে যে সত্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও স্বপ্ন। আমরা দেখেছি দেশবিভাগের আগেও স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে অবিভক্ত ভারতের অনেক লেখক, কবি, প্রকাশক ও সাংবাদিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। নিষিদ্ধ হয়েছে সংবাদপত্র ও সাংবাদিক। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের পরও সাংবাদিক নির্যাতনের এ দৃশ্য বদলাতে আমরা দেখেনি।

বিশেষ করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিষয়ে পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর অবহেলা-অবজ্ঞা, অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে যখনই সংবাদপত্রগুলো, বিশেষ করে বাংলা দৈনিক ইত্তেফাক, সংবাদ এবং ইংরেজি দৈনিক অবজারভার প্রতিবাদের ঝড় তুলতো, তখনই পশ্চিমা শাসকগোষ্ঠীর বিরাগ ও প্রতিহিংসার শিকার হতেন এ তিন পত্রিকার সম্পাদক। ১৯৫০ থেকে ১৯৭২ সাল পর্যন্ত অবাধ স্বাধীনতা নিয়ে আব্দুস সালাম তার সন্তানতুল্য অবজারভারকে এ দেশের শিক্ষিত, সচেতন, দেশপ্রেমিক মানুষের বিশ্বস্ত সঙ্গী করে তুলেছিলেন। আব্দুস সালামের কলম কখনও আপস করেনি।

কোনো লোভ-লালসা তাকে কখনও সত্যচ্যুত কিংবা পেশার প্রতি অবিশ্বাসী করে তুলতে পারেনি। সাংবাদিকদের সব আন্দোলনে তিনি ছিলেন তাদের পাশে। এ অঞ্চলের বঞ্চিত জনগণের অধিকার আদায়ের আন্দোলন-সংগ্রামে আব্দুল সালামের কলম শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছিল। আর তাই ইংরেজি সংবাদপত্রের সম্পাদক হওয়ার পরও আব্দুস সালাম ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে রেখেছিলেন অবিস্মরণীয় অবদান। সে সময়ে তাকে করাবরণও করতে হয়েছিল। বন্ধ হয়ে গিয়েছিল অবজারভার পত্রিকা।

শুধু একবার নয়, সত্য লেখার জন্য আব্দুস সালামকে দু’-দু’বার কারাবাস করতে হয়েছে। কিন্তু তিনি ইচ্ছা করলেই অন্যরকম জীবন কাটাতে পারতেন, সম্পদের পাহাড় গড়তে পারতেন, হতে পারতেন কোনো পত্রিকার মালিক-সম্পাদক। আব্দুস সালাম উচ্চপদের সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন।

কিন্তু বিবেকবান, হৃদয়বান, দেশপ্রেমিক এ মানুষটি সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের সঙ্গে শাসকগোষ্ঠীর বিমাতাসুলভ আচরণের প্রতিবাদে সেই লোভনীয় ও নিরাপদ সরকারি চাকরি ছেড়ে ১৯৫০ সালে সাংবাদিকতার অনিশ্চিত পেশা বেছে নেন। এ সংবাদপত্রটি তখন এ দেশের শিক্ষিত সমাজে ইংরেজি শিক্ষার প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে।

রাজনীতির ক্ষেত্রেও আব্দুস সালামের অনীহা তৈরি হয়। যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নৌকা মার্কা নিয়ে শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের অনুরোধে ফেনী থেকে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে জয়লাভ করার পরও তিনি রাজনীতিকে কখনও জীবন চলার পথ হিসেবে বেছে নেননি। কলমই ছিল তার সারাজীবনের বন্ধু, এ বন্ধুকে আব্দুস সালাম কখনও ত্যাগ করেননি।

১৯৭২-এর পর সদ্য স্বাধীন দেশে আব্দুস সালামকে রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝির শিকার হতে হয়েছিল। একটি বিশেষ আমলা মহল তার মেধা, সাহস ও আপসহীনতায় ভয় পেতে শুরু করে। অবজারভারের বিপুল জনপ্রিয়তাও তাদের এ নেতিবাচক মনোভাবের কারণ ছিল। ফলে গণতন্ত্রের এক মহাদলিল দ্য সুপ্রিম টেস্টের ভুল ব্যাখ্যা হল। আব্দুস সালামকে বাধ্যতামূলক অবসরে যেতে হল। তারপরও তার কলম থেমে যায়নি। বাংলাদেশ টাইমস, ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন কাগজে তিনি কলাম লিখতে লাগলেন। ১৯৭৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মাত্র ৬৫ বছর বয়সে আব্দুস সালাম চলে যান না ফেরার দেশে।

রেহানা সালাম : আব্দুস সালামের কনিষ্ঠ কন্যা; সভাপতি, সাংবাদিক আব্দুস সালাম স্মৃতি সংসদ
(সংগৃহীত)

Leave a Reply