ক্যাডার বৈষম্য দূর হবে কবে?

0
137

বাদল হুমায়ুন:

বর্তমানে ক্যাডার হলো মূলতঃ দুটি। একটি হলো সাধারণ ক্যাডার এবং অন্যটি হলো টেকনিক্যাল ক্যাডার। পুলিশ ক্যাডারকে আলাদা ভাবে দেখানো যেতে পারে। আবার সাধারণ ক্যাডার ২৭ ভাগে বিভক্ত যথা- ০১. প্রশাসন ০২. পুলিশ ০৩. পররাষ্ট্র ০৪. অডিট ০৫. কাস্টমস ০৬. পরিবার পরিকল্পনা ইত্যাদিটেকনিক্যাল ক্যাডার হলো ০১. ডাক্তার ০২. ইঞ্জিনিয়ার ০৩. কৃষিবিদ ০৪. শিক্ষা। সাধারণ ক্যাডারের কর্মকর্তারা ৮০০ নম্বরের লিখিত এবং ২০০ নম্বরের ভাইভা দিতে হত। সাথে সাথে টেকনিক্যাল ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ৫০০ নম্বরের লিখিত এবং ২০০ নম্বরের ভাইভা দিতে হতো (২৫ তম বিসিএস পর্যন্ত)। যদিও বর্তমানে সাধারণ এবং টেকনিক্যাল উভয় ক্যাডার কর্মকর্তাদের ৯০০ নম্বরের লিখিত এবং ২০০ নম্বরের ভাইভা দিতে হয়।
উল্লেখ্য, পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সাধারণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের যে মেধা তালিকা তৈরি করা হয় সে অনুযায়ী ক্যাডার বন্টন করা হয় না। অর্থাৎ মেধা তালিকার ক্রম অনুযায়ী কর্মকর্তাদের পররাষ্ট্র, প্রশাসন, কাস্টম, অথবা পুলিশ ক্যাডার দেয়া হয় না। উদাহরণ স্বরূপ মেধা তালিকায় সর্বশেষ ব্যক্তিও প্রশাসন ক্যাডার পেয়েছে। আবার মেধা তালিকায় প্রথম দিকে অবস্থান নেয়া অনেক কর্মকর্তা সমবায়, পরিবার পরিকল্পনা বা তথ্য ক্যাডারে চাকুরি পেয়েছেন। সম্মিলিত মেধা তালিকা পর্যলোচনায় অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্বপূর্ণ ক্যাডার যথা ডাক, সমবায়, পরিবার পরিকল্পনা এর সর্ব কনিষ্ঠ ক্যাডার কর্মকর্তা প্রশাসন ক্যাডারে চাকুরি পেয়েছেন। এ থেকে বোঝা যায়, প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারাই মেধাক্রমে সেরা নয়।
কিন্তু চাকুরি পাওয়ার পর প্রেক্ষাপট যায় পুরোপুরি বদলে। শুধু মাত্র প্রশাসন ক্যাডারে চাকুরি হওয়ার সুবাধে একজন কর্মকর্তা ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি পান। তাদের অনেকের সিনিয়র একই ব্যাচের অন্য ক্যাডার কর্মকর্তারা হয়ত তখন উপ-সচিব পদে আবেদন করা তো দূরের কথা, একটি প্রমোশনও পাননি। বর্তমানে উপ-সচিব পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রাধিকারভ‚ক্ত অর্থাৎ তারা গাড়ি ক্রয়ের জন্য প্রত্যেক কর্মকর্তা ৩০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনা সুদে লোন পান এবং প্রতিমাসে মেইনটেইনেন্সের জন্য ৫০ হাজার টাকা খরচ পান। অন্যদিকে প্রশাসন ছাড়া অন্য ক্যাডার কর্মকর্তারা ৩য়, ২য় ও ১ম গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়া সত্তে¡ও এ সুযোগ পাচ্ছেন না। অর্থাৎ সচিব পদমর্যাদার অন্য ক্যাডারের কোন কর্মকর্তা এ সুবিধা পাচ্ছেন না।
আর একটি দুঃখজনক বিষয় হলো, প্রশাসন ক্যাডারে সদ্য যোগদান করা কোন কর্মকর্তা অন্য ক্যাডারের সিনিয়র কর্মকর্তা/ সরকারি কলেজের প্রিন্সিপ্যাল/অন্য ক্যাডারের ৩য় গ্রেডের কর্মকর্তাকেও স্যার বলে সম্বোধন করে না। অথচ অন্য ক্যাডারের জুনিয়র কর্মকর্তারা প্রশাসন ক্যাডারের এক ব্যাচ সিনিয়র কর্মকর্তাকে ‘ভাই’ সম্বোধন করলে ভয়ানকভাবে ক্ষেপে যান। যুক্তি হিসেবে তারা নিজেদেরকে ‘বিচারক’ দাবি করেন। কিন্তু প্রত্যেক ক্যাডার কর্মকর্তারই স্ব স্ব বিভাগীয় বিচারিক ক্ষমতা সাংবিধানিকভাবেই দেয়া আছে। ক্যাডারের মধ্যে ব্রাহ্মণ ও নমসূদ্র তৈরির এ ধারা চলমান রয়েছে যুগ যুগ ধরে। আমরা বিশ্বাস করি বর্তমান জনবান্ধব সরকার এ বৈষম্য দূর করণে কাজ করতে আগ্রহী।
উল্লেখ্য , উপ সচিব বা তদূর্ধ্ব এ পদগুলো কোন ক্যাডারের নয়, সিনিয়র সার্ভিস পুলের। কিন্তু দেখা যায়, সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ড (এসএসবি) অর্থাৎ পদোন্নতি কমিটিতে রয়েছেনঃ- ০১. কেবিনেট সচিব ০২. প্রধান মন্ত্রীর মূখ্য সচিব ০৩. জন প্রশাসন সচিব ০৪. অর্থ সচিব ০৫. স্বরাষ্ট্র সচিব ০৬. আইন সচিব এবং ০৭. কম্পোট্রোলার অডিটর জেনারেল।
এ কমিটিতে একজন ব্যতীত বাকী সবাই প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ফলে পদোন্নতির নীতিমালা হয়েছে এভাবে উপ সচিব পদে প্রশাসন ক্যাডার ৭৫%, যুগ্ম সচিব বা তদূর্ধ্ব পদে বর্তমানে কোন কোটা রাখা হয়নি। ফলে প্রশাসন ক্যাডার পদোন্নতি নেয় প্রায় ৮৫% পদে। অন্যান্য সকল ক্যাডারকে দেয় ১৫%। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রশাসন ক্যাডারের ১৮ ব্যাচের কর্মকর্তাদের সাথে অন্যান্য ক্যাডারের ৮ম / ৯ম ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদোন্নতি পাবেন।
অপর দিকে প্রশাসন ক্যাডারের ১১ ব্যাচের কর্মকর্তারা অতিরিক্ত সচিব হবেন। আর অন্য ক্যাডারের ৮ম ব্যাচের কর্মকর্তারাও উপ সচিব হিসাবে চাকুরী করছেন।
বৈষম্য দূর করা সম্ভব যেভাবে
০১. ক্যাডার থাকবে ০২টি। ০১টি সাধারণ ক্যাডার এবং পিএসসির মেধাক্রম অনুযায়ী কর্মকর্তারা বিভিন্ন বিভাগে পদোন্নতি ও পদায়ন পাবেন (প্রশাসন, ট্যাক্স, কাস্টমস ইত্যাদি বিলুপ্ত হবে)। টেকনিক্যাল ক্যাডার( ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, কৃষিবিদ ও শিক্ষক সমন্বয়ে)।
০২. উপ সচিব পদে ৭০% পদ থাকবে সাধারণ ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য এবং ৩০% পদ থাকবে টেকনিক্যাল ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য। তাদের স্ব স্ব মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা তারাই হবেন।
০৩. জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়, প্রধান মন্ত্রীর দপ্তর, রাষ্ট্রপতির দপ্তরে অনুপাতিক হারে সাধারণ ও টেকনিক্যাল ক্যাডারের কর্মকর্তারা পদায়িত হবেন।
০৪. পদোন্নতি কমিটি (এসএসবি) হবে সাধারণ ও টেকনিক্যাল ক্যাডারের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে।
০৫. পদোন্নতি হবে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মেধাক্রম অনুযায়ী।
এসব প্রস্তাব বিবেচনা করে আমলে নিলে ভ্রাহ্মণ ও নমসূদ্র ক্যাডার বৈষম্য থেকে জাতি মুক্ত হবে ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা পাবে। যৌক্তিক ও মানবিক করণের মাধ্যমে সমস্ত ক্যাডার কর্মকর্তাদের অন্তর্নিহিত শক্তিকে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহারের যুগান্তকারী সুযোগ সৃষ্টির প্রয়াস নেয়ার এখনই সময়।

Leave a Reply