গডফাদারদের আত্মসমর্পণে কি মাদক বন্ধ হবে?

0
12

এ কে এম শহীদুল হকঃ

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি টেকনাফে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ১০২ জন মাদক ব্যবসায়ী (যাদেরকে ইয়াবা গডফাদারও বলা হয়) অস্ত্র ও মাদকদ্রব্যসহ আত্মসমর্পণ করে। এটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির আওতায় চলমান মাদকবিরোধী অভিযানেরই ফলাফল। মে ২০১৮ থেকে পুলিশ ও র্যাব মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সাঁড়াশি অভিযান চালাচ্ছে। এ অভিযানে পুলিশ ও র্যাবের সঙ্গে এনকাউন্টারে প্রায় ৪০০ মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে বলে জানা যায়। পুলিশী অভিযানে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে এসব মাদক সম্রাট পুলিশের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে আত্মসমপর্ণ করে। এ ধরনের আত্মসমর্পণ সমাজে একটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা যায়। অন্যরাও অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার জন্য উদ্বুদ্ধ হবে। মাদক চোরাচালানও হ্রাস পাবে।

আত্মসমর্পণকে কেন্দ্র করে টেকনাফ এলাকায় জনগণের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ জনগণ আত্মসমর্পণকে স্বাগত জানিয়েছেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন, এতে তেমন কোনো ফল দিবে না। তাদের কথা আত্মসমর্পণকারীদের মাদক ব্যবসার নেটওয়ার্ক এলাকায় বিরাজ করছে। তারা বিচিত্র উপায়ে এবং নতুন নতুন এজেন্ট নিয়োগ করে মাদক তথা ইয়াবা চোরাচালান অব্যাহত রাখবে। তাদের এ কথার কিছুটা বাস্তবতাও দেখা যায়। আত্মসমপর্েণর দিন এবং তার পরবর্তী সময়েও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিপুলসংখ্যক ইয়াবা উদ্ধার করেছে। এত কিছু করেও মাদক ব্যবসায়ীদের বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দাবি, অভিযান ও আত্মসমর্পণের পর টেকনাফ দিয়ে ইয়াবার সরবরাহ প্রায় ৬০/৭০% কমে গেছে। কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। পৃথিবীর কোথাও মাদককে শতভাগ নির্মূল করা সম্ভব হয়নি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানের জন্য প্রতি বছর হাজার হাজার ডলার ব্যয় করে। তবুও প্রতিবেশী দেশ মেক্সিকো ও কলাম্বিয়া থেকে মাদক আসা বন্ধ করতে পারেনি। তবে অনেক দেশই মাদকের ভয়াবহ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে নাগরিকদের মধ্যে স্বস্তি আনতে পেরেছে। এক্ষেত্রে ইউরোপের দেশগুলো এবং এশিয়ার সিঙ্গাপুরকে দৃষ্টান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা যায়। আমাদেরও সে লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হবে। মাদকের লাগাম ধরে মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে হবে। বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে রক্ষা করতে হবে। সরকার সে লক্ষ্য নিয়েই কাজ করছে। কিন্তু কাজটি বড়ই কঠিন।

মাদক ব্যবসা যারা করে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম, বিবেক, বিচার-বুদ্ধি ও মানবিকতা লোপ পায়। তারা অমানুষ হয়ে যায়। টাকা রোজগারের নেশায় তারা তরুণ-কিশোর ও যুবকদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। জাতিকে পঙ্গু বানিয়ে দিচ্ছে। একজন মাদক ব্যবসায়ী কি একবারও চিন্তা করে না যে, তার নিজের ছেলে অথবা মেয়েটি যদি মাদকাসক্ত হয়, তখন তার ও তার সংসারের পরিণতি কী হবে। মাদকাসক্ত ছেলে বা মেয়ের শেষ পরিণতি মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়া। সংসারের সকল সুখ-শান্তি বিনষ্ট হয়ে সংসার ধ্বংসের মুখে পতিত হয়। টাকা রোজগারের জন্য কোনো লোকেরই দেশ ও জাতির জন্য এত বড় ক্ষতি করা উচিত নয়। যারা করে তারা দেশদ্রোহী, সমাজ ও মানবতা বিরোধী। তাদেরকে সমাজচ্যুত করা উচিত এবং আইনের আওতায় এনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা অপরিহার্য।

কক্সবাজারের টেকনাফ বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশের প্রধান রুট। এ কারণে টেকনাফে অসংখ্য লোক ইয়াবা ব্যবসার সাথে জড়িত। ইয়াবা তৈরি হয় মিয়ানমারে। মিয়ানমারের মাদক ব্যবসায়ীরা সে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীর সহায়তায় বাংলাদেশে ইয়াবা সরবরাহ করে। গ্রেপ্তারকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানা যায়, ইয়াবা ক্রয়ের জন্য কোনো অগ্রিম বা নগদ টাকা দিতে হয় না। ইয়াবার চালান কক্সবাজার জেলার সীমানা পার হলে হুণ্ডি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে মূল্য পরিশোধ করতে হয়। ভারত, দুবাই, থাইল্যান্ড ইত্যাদি দেশে বসবাসরত হুণ্ডি ব্যবসায়ীদেরকে পেমেন্ট দেওয়া হয়। তারা মিয়ানমারের ব্যবসায়ীদেরকে ইয়াবার মূল্য পরিশোধ করে। এ ধরনের অনেক হুণ্ডি ব্যবসায়ী আছে যারা মাদক ব্যবসায় অর্থ লেনদেন করে।

কেবলমাত্র মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করা হলে ও আত্মসমর্পণ করলে কিংবা এনকাউন্টারে তারা নিহত হলেই মাদক বন্ধ হয়ে যাবে— এটা ভাবার সুযোগ নেই। যদি দেশের ভেতরে মাদকের চাহিদা থাকে তবে যেকোনো উপায়েই হোক মাদকাসক্তদের কাছে মাদক পৌঁছে যাবে। এক জরিপে দেখা গেছে যে যুক্তরাষ্ট্র মাদক নিয়ন্ত্রণের জন্য হাজার হাজার ডলার ব্যয় করেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ১০% মাদক জব্দ করতে পারে। বাকি মাদকদ্রব্য গোপনে ও কৌশলে মাদকসেবীদের কাছে পৌঁছে যায়। এক ব্যবসায়ী ব্যবসা ছাড়লে অন্য ব্যবসায়ী সৃষ্টি হবে। পুরাতন রুটের পরিবর্তে নতুন নতুন রুটের সৃষ্টি হবে। নতুন নতুন পাচার কৌশলও সৃষ্টি হবে। কারণ, মাদক ব্যবসা খুবই লাভজনক একটি ব্যবসা। একজন মাদক ব্যবসায়ী এক লক্ষ ইয়াবা তার নির্ধারিত স্থান পার করে দিলে কমপক্ষে দুই লক্ষ টাকা মুনাফা পায়। কাজেই অধিক টাকা রোজগারের নেশায় ব্যবসায়ী কিংবা পরিবহনকারীরা জীবনের ঝুঁকি নিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। অপরাধীরা সব সময় মনে করে— তারা গোপনে অপরাধ করে পার পেয়ে যাবে। কেউ বুঝতে বা জানতে পারবে না। তাই তারা অপরাধ সংঘটন করতে সাহস পায় ও ঝুঁকি নিয়ে থাকে। এ কারণেই সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল হয় না। তবে কার্যকর উদ্যোগ নিলে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে ব্যাপকভাবে অভিযান করে হয়ত মাদক সরবরাহ হ্রাস করা যাবে। কিন্তু তা কতদিন বজায় থাকবে বলা মুশকিল। ভেতরে চাহিদা থাকলে কোনো না কোনো পন্থায় সরবরাহ আসবেই। এ জন্য সরবরাহ বন্ধে যে অভিযান চলমান তার পাশাপাশি চাহিদা হ্রাসের পরিকল্পনা ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে। চাহিদা হ্রাসের জন্য যারা মাদকাসক্ত আছে তাদেরকে আধুনিক চিকিত্সার মাধ্যমে সুস্থ করে তুলতে হবে। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে আধুনিক ও বিশেষায়িত মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা অপরিহার্য। মাদকসেবীরা চিকিত্সার মাধ্যমে সুস্থ হলে তারা আর মাদক চাইবে না। মাদকের চাহিদা কমে যাবে। সুস্থ মাদকসেবীদের পুনর্বাসন ও ফলোআপ-এর ব্যবস্থাও থাকতে হবে। আর নতুন করে যেন মাদকাসক্ত সৃষ্টি না হয়, তার জন্য ব্যাপক গণসচেতনতা ও শিক্ষামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। মাদকের কুফল ও ভয়ানক পরিণতির কথা তরুণ-কিশোর ও যুবকদের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করে মাদকের বিরুদ্ধে তাদের মাইন্ডসেট তৈরি করে মাদকের প্রতি ভীতি জন্মাতে হবে। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া, এনজিও, রাজনৈতিক নেতা-কর্মী, ধর্মীয় ব্যক্তি তথা আলেম-ওলেমা সমাজ, সুশীল সমাজ, সর্বোপরি প্রতিটি পরিবার এবং সব শ্রেণি-পেশার লোকদেরকে মাদকবিরোধী প্রচারণায় ও গণ-সচেতনতামূলক কার্যক্রমে কার্যকরভাবে সমপৃক্ত করে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিতে হবে। ব্যাপক জনগোষ্ঠীর সমপৃক্ততায় মাদকের ব্যাপকতা হ্রাস করা সম্ভব। সচেতনতামূলক কার্যক্রম সর্বদা চলমান রাখতে হবে। পাঠ্যপুস্তকের সিলেবাসে মাদক ও জঙ্গির কুফল সম্বন্ধে বিষয়বস্তু অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। শিক্ষার্থীদেরকে ভালোভাবে এ বিষয়ে জ্ঞান দিতে হবে। কেবলমাত্র আইন-আদালত ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী দ্বারা এ সমস্যার কার্যকর সমাধান সম্ভব নহে। এটা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে।

আত্মসর্মপণকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার চিন্তা-ভাবনা করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার কথাও বলেছেন। এ বিষয়ে সরকারকে সুচিন্তিতভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। যারা মাদক ব্যবসা করে বিপুল পরিমাণ ধন-দৌলতের মালিক হয়েছে, তাদের আর্থিকভাবে পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয়তা আছে বলে মনে হয় না। জীবনের ভয়ে তারা আত্মসমর্পণ করেছে। তারা শুভবুদ্ধির উদয়ের মাধ্যমে আত্মসমর্পণ করেনি। মাদকের নেটওয়ার্ক তাদের জানা। মাদক ব্যবসা করে কাঁচা টাকা রোজগারের যে নেশা তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে তারা সহজে মুক্ত হতে পারবে— এটা সহজে বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদেরকে সূচনাতেই বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। সুযোগ পেলেই তারা পুনরায় মাদক ব্যবসা শুরু করতে পারে। হয়তো নতুন কৌশলে অতি সতর্কতা ও সংগোপনে এ কাজ করবে। তাই তাদেরকে সামাজিক ও প্রশাসনিক চাপে রাখতে হবে। গোয়েন্দা সংস্থার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে যদি মামলা থাকে তা প্রশাসনিক আদেশে প্রত্যাহার করা সমীচিন হবে না। বিচারের মাধ্যমেই তা নিষ্পত্তি করতে হবে। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে যে সম্পদ তারা করেছে সে ব্যাপারে সরকার ছাড় দিবে কিনা তা ভেবে দেখতে পারে। হুন্ডি ব্যবসায়ীদের সনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। গ্রেপ্তারকৃত এবং আত্মসমর্পণকৃত মাদক ব্যবসায়ীরাই হুন্ডি ব্যবসায়ীদের তথ্য দিতে পারবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরকে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে শতভাগ সততা নিয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বা অন্য কোনো সংস্থার কোনো সদস্যের নৈতিকতার স্খলন হলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও ফৌজদারী ব্যবস্থা নিতে কুণ্ঠাবোধ করা যাবে না।

আত্মসমর্পণকৃত মাদক ব্যবসায়ী যারা দরিদ্র তাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করা যায়। রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশ এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছিল। তত্কালীন পুলিশ কমিশনার শফিকুল ইসলাম বেশ কয়েকজন দরিদ্র মাদক ব্যবসায়ীকে পুনর্বাসন করতে পেরেছিলেন। পরে তা আর ফলোআপ করা হয়েছে কিনা তা জানা নেই। পুনর্বাসনকৃত ব্যক্তিদের নিয়মিত ফলোআপ করতে হয় যাতে তারা পুনরায় মাদক ব্যবসায় ফিরে না যায়। একইভাবে মাদকাসক্তদের চিকিত্সা, পুনর্বাসন ও ফলোআপের ব্যবস্থা থাকতে হবে যাতে পুনরায় তারা মাদকাসক্ত না হয়।

মাদকের সরবরাহ বন্ধ, মাদকসেবীদের চিকিত্সা ও পুনর্বাসন, দরিদ্র মাদক ব্যবসায়ী ও পরিবহনকারীদের পুনর্বাসন এবং সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণে ব্যাপক গণসচেতনতা কার্যক্রমের মাধ্যমে মাদক নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ও জনসাধারণের এদিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

লেখক: সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ
(সংগৃহীত)

Facebook Comments

LEAVE A REPLY