গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি ও গণশুনানি নাটক

সমকালীন প্রসঙ্গ

0
5

ড. এম শামসুল আলম:

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির আদেশ ১ জুলাই থেকে কার্যকর হলো। আদেশে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরবরাহকৃত গ্যাসের পরিমাণ ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ২৬২ মিলিয়ন ঘনমিটার। রাজস্ব চাহিদা ধরা হয়েছে ৪৩ হাজার ৮৪০ কোটি টাকা (১২.৮৮ টাকা-ঘনমিটার)। ঘাটতি ১৮ হাজার ৬৯০ কোটি টাকা (৫.৫০ টাকা-ঘনমিটার)। ভর্তুকিতে ঘাটতি সমন্বয় করা হয়েছে ১০ হাজার ৯০ কোটি টাকা। ভোক্তা পর্যায়ে গ্যাসের মূল্য আট হাজার ৬০০ কোটি টাকা বৃদ্ধি দ্বারা বাদবাকি ঘাটতি সমন্বয় করা হয়। অর্থাৎ প্রতি ঘনমিটারে মূল্যবৃদ্ধি হয় ৯.৮০ টাকা (৩২.৮ শতাংশ)। এ মূল্যবৃদ্ধির যুক্তিতে বলা হয়েছে, মূল্যবৃদ্ধির বিকল্প ছিল না। সরকারের এত বিপুল পরিমাণ ভর্তুকি দেওয়ার সামর্থ্য নেই। মূল্যবৃদ্ধিতে সরকারের সাড়ে আট হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হয়েছে। ক্যাব বলেছে, আদেশ অন্যায় ও অযৌক্তিক এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাজস্ব ঘাটতি নির্ধারণ ও গ্যাসের সরবরাহ ব্যয় যৌক্তিককরণে গণশুনানিতে পেশকৃত কোনো প্রস্তাব বিবেচনায় না নিয়ে গতানুগতিকভাবে ঘাটতি নির্ধারণ এবং সমন্বয় করা হয়েছে।

২০০৮ সালে বিইআরসি গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাব বিবেচনার মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এই মানদণ্ডে প্রস্তাব কতটুকু ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত, তা প্রস্তাব মূল্যায়নের মুখ্য বিবেচ্য বিষয়। প্রস্তাব তখনই যুক্তিযুক্ত ও বিবেচনাযোগ্য হবে, যখন তা নির্ভরযোগ্য ও স্পষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে বাস্তব, জ্ঞাত, পরিমাপযোগ্য এবং গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হবে। আর মূল্যহার বৃদ্ধি তখনই ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিযুক্ত হবে, যখন তা ভোক্তা ও কোম্পানির উভয়ের ক্ষেত্রে পক্ষপাতহীন হবে। এ মানদণ্ডে গ্যাসের মূল্যহার বৃদ্ধির প্রস্তাবগুলো গত ১১-১৪ মার্চ অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে গ্রহণযোগ্যভাবে উপস্থাপিত হয়নি। ক্যাব গত ২৪ মার্চ গণশুনানি পরবর্তী প্রদত্ত প্রতিবেদনে মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাবগুলো খারিজ করার জন্য প্রস্তাব পেশ করে। উল্লেখ্য, গত ১১ মার্চ পেশকৃত আবেদনে দুদকের ২৯.৯.২০১৪ তারিখের স্মারকাদেশে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন ক্যাব গণশুনানিতে পেশ করে। কিন্তু গণশুনানির নামে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নাটক করে এমন কথাও উঠেছে। গণশুনানিতে পেট্রোবাংলা ও তিতাসের বিরুদ্ধে প্রতিবেদনে বর্ণিত ছয়টি দুর্নীতির অভিযোগের বিরুদ্ধে প্রতিকার চায়; কিন্তু প্রতিকার কী হলো- এ প্রশ্নও উঠেছে। পরবর্তীকালে ২৭.৩.২০১৯, ২৫.৪.২০১৯, ৩.৬.২০১৯ ও ২৪.৬.২০১৯ তারিখের আবেদনগুলোতে ক্যাব কিছু প্রস্তাব বিবেচনায় নেয়। ক্যাব যেসব প্রস্তাব বিইআরসির বিবেচনার জন্য পেশ করে, তার মধ্যে অন্যতম :এলএনজিজনিত ঘাটতি সমন্বয়ে- ১. গ্যাস সরবরাহের সব পর্যায়ের অযৌক্তিক ব্যয় ঘাটতিতে সমন্বয়; ২. এ খাত থেকে সরকারের আহরিত মুনাফা রহিত (যেহেতু এ খাত লোকসানে আছে) ও রাজস্ব আহরণ যৌক্তিক করে ঘাটতি কমানো এবং ৩. সরকারের পলিসিজনিত ঘাটতি ভর্তুকি দ্বারা সমন্বয় করার পর অবশিষ্ট ঘাটতি (যদি থাকে) ভোক্তা পর্যায়ে মূল্যহার বৃদ্ধি দ্বারা সমন্বয় হতে পারে।

মূল্যহার বৃদ্ধি না করার প্রসঙ্গে বলা হয় :ক. যেহেতু ২০১৫ সালে আবাসিক গ্রাহককে প্রি-পেইড এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক গ্রাহককে ইভিসি মিটার সংযোগ দেওয়া সংক্রান্ত বিইআরসির আদেশ প্রতিপালন না করে তিতাসের জন্য বিশেষভাবে গ্যাস চুরি-আত্মসাতের সুযোগ রাখা হয়। প্রি-পেইড ও ইভিসি মিটারবিহীন ওইসব গ্রাহককে মিটার সংযোগ না দেওয়া অবধি গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তাদের আপত্তি রয়েছে; খ. প্রি-পেইড ও ইভিসি মিটার সংযোগ দেওয়া সংক্রান্ত বিইআরসির আদেশ প্রতিপালন না করার দায়ে তিতাসকে কস্ট প্লাসের পরিবর্তে শুধু কস্টভিত্তিক সঞ্চালন ও বিতরণ চার্জ প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে; গ. যেহেতু সিএনজির বিদ্যমান মূল্য এলএনজির মূল্য অপেক্ষা অধিক, যেহেতু সিএনজির মূল্যবৃদ্ধি করা হলে সমতা রক্ষার অজুহাতে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি করা হবে এবং পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি হবে, সেহেতু সিএনজির মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তাদের আপত্তি রয়েছে; ঘ. গ্যাস সংযোগ স্থগিত থাকা সত্ত্বেও সংযোগ দেওয়া, ডিমান্ড নোটিশ ইস্যুৎ করা, অর্থ জমা নেওয়া, সংযোগ না দিয়ে সংযোগের নামে নেওয়া অর্থ বছরের পর বছর আটকে রাখা সংক্রান্ত ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অংশীজন প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি সভায় বসা এবং এ অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি তিতাসের বিতরণ চার্জ স্থগিত রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে এবং ঙ. গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থ ব্যয়ের ব্যাপারে পেট্রোবাংলার বিরুদ্ধে আনীত ভোক্তা অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য অংশীজন প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি সভায় বসা এবং এ অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া অবধি পেট্রোবাংলার সার্ভিস চার্জ স্থগিত রাখারও প্রস্তাব করা হয়েছে। তাছাড়া উল্লিখিত প্রস্তাবগুলো এ খাতের দুর্নীতি প্রতিরোধে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল বিইআরসি আইন ও বিইআরসির আদেশ উপেক্ষা করে জ্বালানি বিভাগ নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। এসব তহবিল গঠনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বাইরে ব্যবহার হচ্ছে। আইওসি গ্যাস এসডি ভ্যাটমুক্ত। অথচ ভোক্তার কাছ থেকে তা আদায় হয়েছে। এসব অসঙ্গতি গ্যাস সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির কারণ।

অতএব আদেশ যৌক্তিক ও পক্ষপাতহীন হলে গ্যাস উন্নয়ন তহবিল ও জ্বালানি নিরাপত্তা তহবিল বিলুপ্ত, ইউটিলিটির বাড়তি চার্জ রদ, ভোক্তার চুরি হওয়া গ্যাসের সমপরিমাণ গ্যাসের মূল্য ঘাটতিতে সমন্বয় এবং তিতাসের ২ শতাংশ সিস্টেম লস ও পেইডআপ ক্যাপিটালের ওপর ১৮ শতাংশের পরিবর্তে অন্যদের মতো মুনাফা ১২ শতাংশ ধরা হতো। ফলে ঘাটতি সমন্বয় হতো প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা। সেই সঙ্গে ইউটিলিটির মুনাফা সমন্বয় হলে আরও প্রায় ৪.৫ হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় হতো। ফলে চুরি প্রতিরোধ হতো এবং মূল্যবৃদ্ধি বা কোনো ভর্তুকি দরকার হতো না। অথচ মূল্যবৃদ্ধির আদেশে ক্যাবের কোনো প্রস্তাবই বিবেচনা করা হয়নি। বরং ভোক্তাদের আপত্তি সত্ত্বেও ১০ পয়সা হারে ডিমান্ড চার্জ আরোপ করে ঘাটতি ৩০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। ফলে আদেশ ন্যায্য, যৌক্তিক ও পক্ষপাতহীন হয়নি।

আদেশে সিএনজির মূল্যহার বেড়েছে। ফলে রাজস্ব একদিকে বাড়বে ৪২৩ কোটি টাকা; অন্যদিকে সিএনজি বিক্রি হ্রাসে সরকারের রাজস্ব হ্রাস পাবে অনেক বেশি। ভোক্তার পরিবহন ব্যয় বাড়বে আরও অনেক বেশি। আদেশে প্রি-পেইড মিটার ও ইভিসি মিটার সংযোগের আদেশ প্রতিপালন না করার দায়ে কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় গ্যাস চুরি অব্যাহত রইল। তিতাসের বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি একদিকে আমলে না নেওয়া, অন্যদিকে ২ শতাংশ সিস্টেম লস সুবিধা ও পেইড অব ক্যাপিটালের ওপর প্রদত্ত ১৮ শতাংশ মুনাফা বহাল রাখায় দুর্নীতি আশ্রয় ও প্রশ্রয় পেল। ইউটিলিটিকে চার্জের সঙ্গে বাড়তি অর্থ অবৈধভাবে প্রদান করে পক্ষপাতিত্বসহ দুর্নীতির উদাহরণ সৃষ্টি করা হলো।

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধিতে সারের মূল্যবৃদ্ধি পাবে। ফলে কৃষিতে ভর্তুকি আরও বৃদ্ধি পাবে অথবা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। এমনিতেই কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় সংকটে আছে। সে সংকট আরও ঘনীভূত হবে। ফলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা হুমকির মুখে পড়বে। জিডিপিতে কৃষির অবদান চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। শিল্প বিনিয়োগ সংকটে আছে। গ্যাস সংকটও মোকাবেলা করতে হবে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজার প্রতিযোগিতা টিকে থাকা এমনিতেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আবার গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সে চ্যালেঞ্জ আরও কঠিন হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অনিশ্চয়তা বাড়বে আবার বিদ্যুতের মূল্যও বাড়বে। ফলে ওইসব চ্যালেঞ্জ আরও প্রকট হবে।

সর্বোপরি পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি, নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবা ও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে ভোক্তার ভোগ ব্যয় কমবে। ফলে বাজেটে ভ্যাট আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে। সর্বোপরি ৩.৫ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হবে, যা জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাধা হবে। এসব চ্যালেঞ্জের বিপরীতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি দ্বারা সরকারের আট হাজার কোটি টাকা সাশ্রয় কোনোভাবেই যৌক্তিক হতে পারে না। তাছাড়া ওই আদেশে গ্যাস খাতের সব ধরনের দুর্নীতি প্রশ্রয় পেয়েছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ
(সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY