ঘোষণা ছাড়াই অভিযান শেষ, রাসায়নিক বহাল

চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের পর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নেতৃত্বে গঠিত টাস্ক ফোর্সের অভিযান শেষ হলেও পুরান ঢাকা থেকে সরেনি দাহ্য রাসায়নিকের সব গুদাম। অভিযানের মুখে সাময়িকভাবে ওই সব গুদাম ও কারখানার অবস্থান পরিবর্তন করা হলেও পুরান ঢাকায়ই রয়ে গেছে রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ। ওই এলাকার বিভিন্ন বাসাবাড়িতে রাসায়নিক মজুদ রেখেই কৌশলী ব্যবসায়ীরা চালু রেখেছে সব ধরনের কার্যক্রম।

এদিকে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সহযোগিতার অভাবে তেমন কোনো সফলতা ও ঘোষণা ছাড়াই বন্ধ রাখা হয়েছে টাস্ক ফোর্সের অভিযান। আবার কবে অভিযান চালানো হবে সে বিষয়েও ওয়াকিবহাল নন ডিএসসিসির কর্মকর্তারা।

সরেজমিনে ঘুরে এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পুরান ঢাকার লালবাগ, উর্দু রোড, হোসেনি দালান রোড, শহীদনগর, চকবাজার, মৌলভীবাজার, বাবুবাজার, মিটফোর্ড ও আরমানিটোলা এলাকার বিভিন্ন বাড়িতে এখনো মজুদ রাখা হয়েছে রাসায়নিক। রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দিয়ে অতিরিক্ত অর্থ উপার্জনের জন্য ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করছেন অনেক বাড়ির মালিকও। প্রতিটি গুদামের সামনে বসিয়ে রাখা হয়েছে পাহারাদার। এ ছাড়া রাসায়নিকের ব্যবসা অব্যাহত রাখতে দোকানের সামনে রাখা হয়েছে খালি ড্রাম। দিনে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্ডার নিয়ে রাতে গুদাম থেকে সরবরাহ করা হয় দাহ্য রাসায়নিক। এসব রাসায়নিকের মধ্যে টরবিটল, অ্যাসিটন, জাইলিন, ইথাইল অ্যাসিটন, মিথাইলের মতো অতি দাহ্য রাসায়নিকও মিলছে ওই সব দোকানে। আরমানিটোলা মাঠের দক্ষিণ দিকের আনন্দ পারফিউমারি, আরমানিট্রিট রোডের মোল্লা বক্স মার্কেটের শওকত পারফিউমারিসহ বেশ কয়েকটি দোকানের সামনে খালি ড্রাম দেখা গেছে। ওই সব ড্রাম রাখার কারণ জানতে চাইলে কোনো উত্তর না দিয়ে তা সরিয়ে ফেলা হয়েছে।

পুরান ঢাকার এক স্থায়ী বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘সব ধরনের রাসায়নিক এখনো পাওয়া যায়। সন্ধ্যার পর পুরান ঢাকার বিভিন্ন গুদাম থেকে সরবরাহ করা হয় এসব অতি দাহ্য রাসায়নিক।’

পুরান ঢাকায় ডিএসসিসির টাস্ক ফোর্সের অভিযান শুরু হওয়ার পর রাসায়নিকের কিছু গুদাম ও কারখানা কামরাঙ্গীর চর, সাভার ও গাজীপুরে স্থানান্তর করে অনেক ব্যবসায়ী। বিষয়টি স্বীকারও করেছেন রাসায়নিক ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। কামরাঙ্গীর চরের বেড়িবাঁধ ও বালুর মাঠ এলাকায় রাসায়নিক কারখানা ও গুদাম স্থানান্তর করছে অনেক ব্যবসায়ী। কামরাঙ্গীর চরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ওই সব দাহ্য রাসায়নিক কারখানা স্থানান্তরের ফলে এলাকার বাসিন্দারা পুরান ঢাকার মতো অগ্নিঝুঁকিতে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্থানীয় কাউন্সিলর মো. সাইদুল ইসলাম মাদবর। তিনি বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা কামরাঙ্গীর চরে এসেছে। ফলে এই এলাকার বাসিন্দারা রয়েছে অগ্নিঝুঁকিতে। কাউন্সিলর হিসেবে তেমন কিছু করার নেই আমার।’

রাসায়নিক ব্যবসায়ীদের দাবি, অভিযানের পর পুরান ঢাকা থেকে অতি দাহ্য রাসায়নিক সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের লাইসেন্স ও পরামর্শ নিয়ে কামরাঙ্গীর চর, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও গাজীপুরে স্থানান্তর করা হয়েছে দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম।

গত ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ আগুনের পর ২৮ মার্চ থেকে রাসায়নিকের গুদাম ও কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হয়েছিল। কিন্তু ২৮ মার্চের পর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম স্থাপনের আবেদন জমা পড়েনি বলে জানিয়েছেন প্রধান বিস্ফোরক পরিদর্শক মো. সামসুল আলম।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আরিফ হোসেন মাসুদ অবশ্য দাবি করেন, অতি দাহ্য রাসায়নিক পুরান ঢাকায় এখন আর নেই। তিনি বলেন, ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় তা স্থানান্তর করা হয়েছে বিস্ফোরক পরিদপ্তর থেকে লাইসেন্স নিয়ে। রাতে দাহ্য রাসায়নিক বেচাকেনার বিষয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এই বিষয়টি আমার জানা নেই। এখানে রাতে ব্যবসা করার সুযোগ নেই।’

দাহ্য রাসায়নিকের গুদাম সরাতে ডিএসসিসির নেতৃত্বে গঠিত টাস্কফোর্সের অভিযানের সফলতা নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এক মাসের বেশি সময় ধরে পরিচালিত অভিযানের পরও দাহ্য রাসায়নিকমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি পুরান ঢাকাকে। মাসজুড়ে পরিচালিত অভিযানে দাহ্য রাসায়নিক রাখার অভিযোগে ডিএসসিসির পাঁচটি দল মাত্র ১৯৪টি বাড়ির পরিষেবা সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে। তবে রাসায়নিক দ্রব্য সরিয়ে ফেলার পর বেশির ভাগ বাড়ির পরিষেবা সংযোগ আবারও চালু করা হয়েছে। ওই সব বাড়িতে থাকা দাহ্য রাসায়নিক কোথায় স্থানান্তর করা হয়েছে সেই হিসাব নেই ডিএসসিসির কাছে। ডিএসসিসির কর্মকর্তাদের দাবি, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে প্রথম দুই সপ্তাহ টাস্কফোর্সের অভিযানের পর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠানো নিয়ে সৃষ্টি হয় জটিলতা। সংশ্লিষ্ট এলাকার থানা পুলিশের সহায়তায় দুই সপ্তাহ অভিযান চললেও রাজারবাগ পুলিশ লাইনস থেকে পুলিশ সদস্য নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। পুলিশ সদস্য নেওয়ার জন্য সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে গাড়ির ব্যবস্থা করার জন্য বলা হয় ডিএসসিসিকে। ওই সব কারণেই ১ মার্চের পর অব্যাহত রাখা যায়নি টাস্কফোর্সের অভিযান।

ডিএসসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট এবং পুলিশ ফোর্স পাঠানো নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হওয়ার পর অভিযান ঠিকমতো অব্যাহত রাখা যায়নি। আবার কবে অভিযান চালু হবে তা এখনো জানি না আমরা।’

ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, পুরান ঢাকাকে এখনো রাসায়নিকমুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। অভিযান অব্যাহত রাখা হবে কি না সে বিষয়ে পরবর্তী সময়ে সভায় আলোচনা হবে।

LEAVE A REPLY