‘নিষিদ্ধ’ প্রযুক্তি সিলেটে

0
17

অপরাধী শনাক্ত করতে গিয়ে আটকে দিচ্ছে নিরীহদের। সময় নষ্ট হচ্ছে পুলিশের, সাধারণ জনগণের হয়রানি! এ কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো, অকল্যান্ডসহ চারটি শহরের ‘ফেস রিকগনিশন ক্যামেরা’ ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন দেশটির আদালত।

আসামি ও অপরাধী শনাক্তে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সিলেট নগরীতে বসেছে ১১০টি ক্যামেরা। এর মধ্যে ১০টি কাজ করবে অপরাধী শনাক্তে। এ সংক্রান্ত ক্যামেরা, ট্র্যাকিং সিস্টেম ও আনুষঙ্গিক ডিভাইসগুলো সরবরাহ করেছে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ে। বিভিন্ন দেশে নাগরিকদের হয়রানি করা ক্যামেরাটির কার্যকারিতা নিয়ে অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। পরীক্ষামূলক প্রস্তুতির সময় ফলস পজিটিভ (ভুল ব্যক্তি শনাক্ত) ফলাফল দিয়েছিল হুয়াওয়ের এ ক্যামেরা।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ জানায়, যেকোনো আসামি, অপরাধে জড়িত কোনো ব্যক্তি অথবা কালো তালিকাভুক্ত যানবাহনের নম্বর যদি আইপি ক্যামেরার আওতাভুক্ত কোনো এলাকায় ধরা পড়ে, তবে নিয়ন্ত্রণ কক্ষে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অ্যালার্ম বেজে উঠবে। কন্ট্রোল রুম থেকে দেখে শনাক্ত ব্যক্তি বা গাড়িটি ধরতে সরাসরি ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হবে।

এ প্রযুক্তি সম্পর্কে তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফেসিয়াল রিকগনিশন হচ্ছে একটি বায়োমেট্রিক পদ্ধতি। চেহারার মাধ্যমে মানুষকে শনাক্ত করতে মূলত এটি কাজ করে। তবে অনেক সময় নিম্নমানের লেন্স ও সেন্সর হওয়ায় এটি ভুল আসামি শনাক্ত করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কৃষ্ণাঙ্গ ও মেয়েদের চেহারা শনাক্তে ব্যর্থ হওয়ায় এবং ভুল আসামি ধরায় এটি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

‘ডিজিটাল সিলেট সিটি’ নামে ৩০ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয় ‘ইজি অটোমেশন লিমিটেড’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ১১০টি ক্যামেরা, ফুটেজ যাচাই-বাছাই-সংক্রান্ত সফটওয়্যারসহ আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি মিলে প্রায় তিন কোটি ৮০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। প্রতিটি সিসিটিভি ক্যামেরার সেটআপসহ দাম দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা।

ডিজিটাল সিলেট সিটি প্রকল্পের পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুর রহমান খান বলেন, এ প্রযুক্তির ভেতরে এলগোরিদম (নির্দেশাবলি) ব্যবহার করা হয়। আমাদের ক্যামেরাগুলোর সঙ্গে অপরাধীর চেহারা যদি ৮০ শতাংশ মিলে যায় তাহলে তাকে অপরাধী হিসেবে শনাক্ত করে কন্ট্রোল রুমে অ্যালার্ম দেবে। আমরা এগুলো স্থাপনের আগে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখেছি।

পরীক্ষা-নিরীক্ষার সময় হুয়াওয়ের এ ক্যামেরাগুলোতে কিছু ফলস পজিটিভ (ভুল ব্যক্তি শনাক্ত) এসেছে বলেও জানান তিনি।

প্রকল্প পরিচালক বলেন, সব ধরনের শর্ত মেনে ‘ইজি অটোমেশন লিমিটেড’-কে কাজটি দেয়া হয়েছে। ক্যামেরার ব্র্যান্ড নির্ধারণের চয়েজটাও তাদের ছিল। তবে তারা আমাদের সব শর্ত মেনেই কাজ পেয়েছে এবং সম্পন্ন করেছে।

নিউ ইয়র্ক টাইমস বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের অকল্যান্ডে সম্প্রতি ফেসিয়াল রিকগনিশনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে একটি আইন পাস হয়েছে। আইনটিতে বলা হয়েছে, ‘নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য নয়, এমন ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারে গোটা শহরের মানদণ্ডে প্রভাব পড়ছে।’ এ আইনকে সমর্থন জানিয়ে শহরের কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট রেবেকা কাপলান এক খোলা চিঠিতে বলেন, ‘অকল্যান্ডের বাসিন্দাদের জন্য এ ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার মোটেও নিরাপদ নয়। এটি ভুল তথ্য দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বাধা এবং বিচারকাজে বিভ্রান্ত তৈরি করতে পারে।’

চলতি বছরের এপ্রিলে অ্যাপেল স্টোরি চুরির ঘটনায় ফেস রিকগনিশন ক্যামেরায় ধরা পড়া ওসমান বাহ নামের ১৮ বছর বয়সী এক তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ। গ্রেফতারের সময় পুলিশের হাতে ছিল ক্যামেরার ছবিটি। যার সঙ্গে ওই তরুণের চেহারার কোনো মিল ছিল না। পরে ওই তরুণ অ্যাপেলের বিরুদ্ধে ক্ষতিপূরণ মামলাও করেন।

যুক্তরাজ্যের স্কাই নিউজ জানিয়েছে, হয়রানির কথা বিবেচনা করে এ ক্যামেরা খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যুক্তরাজ্য। ২০১৭ সালের কার্ডিফে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ফাইনাল খেলায় স্টেডিয়ামে আগত দর্শকদের মধ্যে ২ হাজার জনকে অপরাধী ও মামলার আসামি বলে শনাক্ত করেছিল এ ক্যামেরা। পরে তাদের একজনকেও অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেনি পুলিশ।

ক্যামেরাটি ব্যবহারের বিষয়ে তথ্য ও প্রযুক্তিবিদ তানভীর হাসান জোহা বলেন, এ ধরনের প্রযুক্তিকে আমরা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বলি। বাংলাদেশের জন্য এটি অবশ্যই একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। এখানে অনেক ডাটা সংরক্ষিত থাকে। এগুলো রক্ষা ও নজরদারি করা অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং কাজ। এ প্রযুক্তিতে লেন্স ও সেন্সরের মাধ্যমে মানুষের চেহারা শনাক্ত করা হয়। যদি কোনো যন্ত্রের লেন্স ও সেন্সর নিম্নমানের থাকে তাহলে এটা ভুল ডিটেক্ট করবে। বাইরের দেশে এমনটিই ঘটেছে।

‘তথ্যের অভাব ও সমন্বয়হীনতার কারণে এ প্রযুক্তি ব্যবহারে হয়রানির ঘটনা বাড়তে পারে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু আসামি শনাক্তের ক্ষেত্রে এ ক্যামেরা ব্যবহার করলে চলবে না। আসামি-সংক্রান্ত প্রতিটি সেক্টরে ডাটাবেজ আপডেট থাকতে হবে। যেমন- একজন আসামি যদি আদালত থেকে জামিন নিয়ে বের হন, এর পরপরই যদি ক্যামেরা তাকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করে তাহলে এ প্রযুক্তির সুফল আমরা পাব না। আসামি জামিন পাওয়া, জেলখানায় থাকা ইত্যাদি তথ্য আপডেট করলেই প্রযুক্তি কাজে আসবে।

‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাউকে গ্রেফতার করলে যথেষ্ট যাচাই-বাছাই করা উচিত। এ প্রযুক্তি যদি বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয় তাহলে আরও বেশি মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।’

সিলেটে ইনস্টল করা ক্যামেরা কতটুকু যথার্থ (অ্যাকুরেট) ও কার্যকর তথ্য দেবে- জানতে চাইলে গত বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) হুয়াওয়ের পাবলিক রিলেশন্স বিভাগে যোগাযোগ করা হয়। সেখানকার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা হোয়াটসঅ্যাপ প্রশ্ন পাঠাতে বলেন। প্রশ্ন পাঠানোর চারদিন পরও তিনি কোনো উত্তর দেননি। উল্টো পাবলিক রিলেশন ম্যানেজার তানভীর আহমেদ নামে আরেক কর্মকর্তাকে বক্তব্য দেয়ার জন্য অ্যাসাইন করেন। বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেননি। হুয়াওয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একাধিক ই-মেইল এলেও কোনোটিতে ক্যামেরার মানের বিষয়ে তাদের অবস্থান সুস্পষ্ট করে কোনো বক্তব্য দেয়া হয়নি।

এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারির জন্য ফাঁদপাতার বিষয়টি আইনবহির্ভূত বলে মন্তব্য করেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি বলেন, এটা একটা সার্ভিলেন্সের (নজরদারি) অংশ। কিন্তু এর মাধ্যমে সোসাইটিকে ক্রিমিনাল মনে করা হচ্ছে। আইনের চোখে কেউ গোটা সোসাইটিকে ক্রিমিনাল মনে করতে পারেন না। দেশে এখন এমন কোনো পরিস্থিতি হয়নি বা যুদ্ধাবস্থা হয়নি যে ক্যামেরা দিয়ে আসামি শনাক্ত করতে হবে। যেকোনো সিদ্ধান্তের পেছনে একটা আইনি ভিত্তি থাকা দরকার।

তিনি বলেন, ‘জনগণের নিরাপত্তার জন্য এটা অত্যন্ত ভালো উদ্যোগ। তবে আইনের ভাষায়, একজন আসামিকে ধরতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা গোয়েন্দা বাহিনী কখনোই এত বড় জাল ফেলতে পারে না। আসামি ধরার জন্য স্পেসিফিক আইন আছে। এ প্রযুক্তি মানুষের প্রাইভেসিতে বড় ধরনের হুমকি তৈরি করবে।’

‘সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যাই করুক তারা মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করতে পারে না। যে যত কথা বলুক, সংবিধানে স্পষ্ট বলা আছে যে, কোনো আইন যদি মানুষের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় তবে সেটা কার্যকরের দিন থেকেই বাতিল হয়ে যায়। বহির্বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে যেহেতু এ প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে, বাংলাদেশে এটা কাজ করবে তা কখনোই বিশ্বাসযোগ্য নয়। এগুলো পাইলট হিসেবে শুরু করার আগে সব পক্ষের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল।’

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, অপরাধ ও আসামি শনাক্তে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার ইতিবাচক। তবে কেউ যদি এ ক্যামেরার মাধ্যমে ভুল শনাক্ত হয়ে কাস্টডিতে যায়, হয়রানির শিকার হয়; তাহলে তিনি অবশ্যই পুলিশের বিরুদ্ধে আদালতে যেতে পারবেন। এ পথ তো খোলাই আছে।

নতুন এ প্রযুক্তি সম্পর্কে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (গণমাধ্যম) জেদান আল মুসা বলেন, ‘সিলেটে আইপি ক্যামেরা স্থাপনের কাজ এখনও চলমান। পুরো মহানগরে ১১০টি আইপি ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। এখন পর্যন্ত ৫৫ শতাংশ কাজ হয়েছে। বাকি ক্যামেরা স্থাপন ও কারিগরি কাজগুলো দ্রুতগতিতে চলছে। পাশাপাশি এগুলো পরিচালনার জন্য পুলিশ সদস্যরা প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। পুরোদমে এর কার্যক্রম শুরু হলে আইপি ক্যামেরা প্রযুক্তি অপরাধ দমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’

তথ্যপ্রযুক্তিবিদ মেহেদী হাসান বলেন, সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে এক ব্যক্তি যখন ঘুমিয়ে ছিল, অপর এক ব্যক্তি ওই ব্যক্তির মোবাইল নিয়ে তার মুখের সামনে ধরে মোবাইলের লক ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সিকিউরিটি লক খুলে তার টাকা হাতিয়ে নেয়। একটি প্রযুক্তির ইতিবাচক-নেতিবাচক দুই দিকই আছে। ফেস রিকগনিশন ক্যামেরায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বায়োমেট্রিক থাকবে, অনেক তথ্য থাকবে। এগুলো যাতে বেহাত না হয়, সে ব্যাপারে যথাযথ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।

চলতি বছরের ২৭ জুলাই ‘ডিজিটাল সিলেট সিটি’ প্রকল্পের অধীনে ক্যামেরাগুলো নগরীর জিন্দাবাজার পয়েন্ট, সুরমা মার্কেট পয়েন্ট, লামা বাজার পয়েন্ট, আম্বরখানা পয়েন্ট, মাজারগেট, জেলখানা পয়েন্ট, সুবিদ বাজার পয়েন্ট, শাহী ঈদগাহ এলাকাসহ নগরীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে বসানো হয়। এসব আইপি ক্যামেরা নিয়ন্ত্রণের জন্য সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায় মনিটরিং রুম স্থাপন করা হয়েছে। এ সিস্টেম নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে থাকবে সিলেট মহানগর পুলিশ।