প্রতিবন্ধীর পারিবারিক ক্ষমতায়ন

0
5

নাছিমা বেগম:

বর্তমানে নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশ সরকার নিউরো- ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩ প্রণয়ন করে। এই আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে অটিজম, ডাউন সিনড্রোম, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এবং সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরাই নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী। আশার কথা হলো, বর্তমানে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি বেশ কিছু বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন থেরাপিউটিক সেবা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এই জনগোষ্ঠীকে সমাজের মূলধারায় আনার জন্য নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

সম্প্রতি এই বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবারের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ‘সূচনা ফাউন্ডেশন’ ও বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান ‘প্রয়াসে’র যৌথ অংশীদারিত্বে পেরুর একটি বিশেষজ্ঞ দল কর্তৃক প্রয়াসের পেশাজীবী, কেয়ার গিভার, শিক্ষার্থী, তাদের পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের নিবিড় প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। উলেল্গখ্য, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে পরিচালিত প্রয়াস শুরু থেকেই এই বিশেষ শিক্ষার্থীদের সমাজে স্বনির্ভর করার জন্য বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করছে এবং সূচনা ফাউন্ডেশন স্নায়ু বিকাশজনিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে অ্যাডভোকেসি ও গবেষণা ধর্মী কাজ করে। এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারপারসন গেল্গাবাল অটিজম অ্যাম্বাসাডর হিসেবে খ্যাত সায়মা ওয়াজেদ হোসেন একাধারে একজন লাইসেন্সড স্কুল সাইকোলজিস্ট, হুর এক্সপার্ট প্যানেল অন মেন্টাল হেলথ মেম্বার, ডিরেক্টর জেনারেলস এবং চেয়ার, ন্যাশনাল অ্যাডভাইজারি কমিটি অন অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডারস, বাংলাদেশ।

পরিবারের ক্ষমতায়নে পিতা-মাতার করণীয় সূচনা ফাউন্ডেশন ও প্রয়াসের যৌথ অংশীদারিত্বে গত ১৯ ও ২০ জুলাই বিশেষ শিক্ষার্থীদের মা-বাবা এবং অভিভাবকদের জন্য আয়োজিত প্রশিক্ষণে এক হাজারেরও অধিক মা-বাবা ও অভিভাবক অংশ নেন। তাদের মধ্যে আমিও একজন। অত্যন্ত সময়োপযোগী সফল একটি আয়োজন। আমি দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালীন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়ামে অংশ নিয়েছি। শিক্ষা সফরে প্রতিবন্ধীবিষয়ক বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করেছি। বিশেষ করে জাপান, জার্মান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে নানা অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছি। শিক্ষণীয় অনেক কিছুই নিজ দেশে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু এতটা ইন্টারেক্টিভ প্রশিক্ষণ আমি খুব কম দেখেছি।

প্রশিক্ষণ শেষে অভিভাবকদের অনেকের সঙ্গেই আমার কথা হয়েছে। প্রত্যেকেই বলেছেন, প্রশিক্ষণটি অত্যন্ত বাস্তবধর্মী ও কার্যকর। যদি আরও আগে এই প্রশিক্ষণ পেতাম, তাহলে আমাদের সন্তানরা স্বনির্ভর, কর্মক্ষম ও সুখী জীবনযাপনে অনেক এগিয়ে থাকত। এই বিশেষ সন্তানরা একেকজন ভিন্ন ভিন্ন সক্ষমতার মানুষ হলেও তাদের চাহিদাগুলো ঠিক আমাদের মতোই। হাতে-কলমে উদাহরণ দিয়ে এই সত্যগুলো আমাদের সামনে তুলে ধরে সমাধানের পথ দেখালেন। একজন মা হিসেবে এখান থেকে যা শিখলাম এবং আমার মাঝে যে পরিবর্তনগুলো এলো, তা পাঠকদের সঙ্গে শেয়ার করতে এই লেখা। আমাদের মতো হাজারো সন্তানের মা-বাবা এবং অভিভাবকের যদি অল্প কিছু পরিবর্তনও আসে, তাহলে নিজেকে সার্থক মনে করব।

বাবা-মা হিসেবে মনে রাখতে হবে যে, আমাদের এই বিশেষ সন্তানরা আর দশটা মানুষের মতোই একজন মানুষ। তাকে সমাজে চলার উপযোগী করে তোলার জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরির তাগিদ সবসময় নিজেদের মধ্যে জাগ্রত রাখা। তাদের জীবনব্যাপী স্বনির্ভর, কর্মক্ষম ও সুখী করার জন্য নিজেদের প্রস্তুত করা। তাদের না বলা কথাগুলো অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করে তাদের জন্য কী করণীয়, সে উপায় নির্ধারণ করা। তাদের প্রতিবন্ধিতার ভিন্নতাকে লক্ষ্য রেখে যার যার সামর্থ্য ও পছন্দ অনুযায়ী একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। এ কথা সত্য, অনেক সময় আমাদের এই বিশেষ সন্তানের সক্ষমতা সম্পর্কে সঠিক ধারণাও থাকে না। কার্যত আমরা যা ভাবি, তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু করার সামর্থ্য তারা রাখে। যেমন আমার ছেলেকে প্রয়াসে ভর্তি করার কিছুদিন পর তার কেয়ার গিভার এসে আমাকে জানাল, ‘ভাইয়া আজকে ক্লাসে ডান্স করেছে।’ আমি তাকে প্রশ্ন করেছি, ‘তুমি দেখেছ?’ সে জানাল, ‘খুব ভালো করেছে।’ আমি আসলে বিশ্বাস করিনি। পরের সপ্তাহে সে ভিডিও করে নিয়ে আসে। আমি অবাক বিস্ময়ে দেখি। আনন্দে চোখে পানি এসে যায়। এরপর সে স্টেজে পারফর্ম করে। আত্মীয়-স্বজনকে জানালে সবাই অবাক হয়। কারণ দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছর সে বাসায় শুয়ে-বসে কাটিয়েছে।

আমরা অনেকেই জানি, আমাদের এই বিশেষ সন্তানদের আচরণে ভিন্নতা রয়েছে। বিশেষ করে যাদের অটিজম রয়েছে, তাদের কমন কিছু বৈশিষ্ট্য থাকলেও আচরণগতভাবে প্রত্যেকেরই ভিন্নতা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের আচরণ পরিবর্তনের লক্ষ্যে মা-বাবা হিসেবে আমাদের নিজেদের আচরণের মধ্যেও বেশ কিছু পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। যেমন- অনেক সময় আমরা তাদের বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যাই। কিন্তু তাদের বলি না, কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? কেন নিয়ে যাচ্ছি? তারা না বুঝলেও আমাদের উচিত তাদের কথাগুলো বলা। পরিবারে তাদের গুরুত্ব ও মর্যাদা আছে, তা তাদের বুঝতে দেওয়া।

তাদের বোঝাতে হবে যে, তারা যতটুকুই করতে পারে, মা-বাবা হিসেবে তাতেই আমাদের গর্ব হয়। সে অল্পই হোক, তাদের তা শিখতে দিতে হবে। কোনো কাজ ঠিকমতো করতে না পারলেও তাকে উৎসাহ দিতে হবে। সেদিন আমার ছেলে নাসিফসহ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত আমার এক সহকর্মীকে দেখতে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে গেলাম। আমি গাড়ি থেকে নামার সময় জুসের বোতলের প্যাকেটটি নাসিফের হাতে দিয়ে বললাম, এটা আঙ্কেলকে দেবে। সে প্যাকেটটি হাতে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে পুরো করিডোর, লিফট আবার করিডোর পেরিয়ে কেবিনে গিয়ে আমার সহকর্মীর হাতে দিল। তার এই সক্ষমতায় আশার আলো দেখি। তাকে অনেক উৎসাহ দিলাম।

তাদের কোনো কাজ দিয়ে দ্বিধায় থাকা যাবে না। তাদের মধ্যে কোনো কনফিউশন তৈরি করা যাবে না। কনফিউশন তৈরি হলে ভবিষ্যতে অনেক বড় সমস্যা হতে পারে। তাদের লক্ষ্য অর্জনের প্রতিটি ধাপে ধাপে উৎসাহ দিতে হবে। কোনো কাজে তারা সফল হলে মা-বাবা এবং শিক্ষকদের প্রশংসা পেলে তারা খুশি হয়। তাদের উৎসাহ দিলে কাজটি তারা আরও এগিয়ে নিতে পারবে।

যখন তাদের কারও সঙ্গে পরিচয়ের সুযোগ আসে, তখন তাদের নাম বলে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। অন্যদের সঙ্গে কথা বলা, চলাফেরা, সবার সঙ্গে মেশার সামাজিকতাগুলো আস্তে আস্তে তাদের শেখাতে হবে। তাদের কিছু শেখাতে গেলে একটু লেগে থাকতে হবে। হয়তো অন্যদের তুলনায় তারা একটু ধীরে করবে। কিন্তু তারা পারবে, এই বিশ্বাসটা নিজেদের ওপরও রাখতে হবে। তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়ার ক্ষেত্রে তা সুস্পষ্ট এবং পরিস্কার উচ্চারণে দিতে হবে, যাতে তারা সহজেই বুঝতে পারে তাদের কী করতে বলা হচ্ছে। নির্দেশনা অনুসরণের জন্য কোনো তাড়াহুড়া করা যাবে না। তাদের কাজটি করার জন্য একটু সময় দিতে হবে।

আমরা অনেক সময় ভাবি, তাদের দিয়ে ভালো কিছু হবে না। কিন্তু এটা না ভেবে, তাকে ভালো কিছু করার পথ দেখিয়ে দিতে হবে। তাদের যে কাজগুলো আমাদের ভালো লাগে, সেই কাজগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে শিখিয়ে দিলে তারা আরও বেশি বেশি করে করতে পারবে। আমাদের যে কোনো ধরনের ইতিবাচক ও নেতিবাচক কথা তাদের কাজ করার মানসিকতার ওপর প্রভাব রাখে। তারা কী পারে না বা কোথায় ভুল করে, এ বিষয়গুলো তাদের সামনে অন্যদের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত নয়। এগুলো তাদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং আত্মনির্ভরশীল হতে বাধাগ্রস্ত করে। অনেক সময় আমরা মনে করি, সে কথা বলতে পারে না, তার সঙ্গে কথা বলার দরকারটা কী? কিন্তু সে কথা বলতে না পারলেও তার সঙ্গে কথা বললে যে অনেক ভালো লাগে, তা আমাদের বুঝতে হবে। তা না হলে সে একাকিত্বে ভুগবে। অনেক সময় আমরা শুধু তাদের নির্দেশ দিই এটা করো, ওটা করো। তাদের সঙ্গে মন খুলে কথা বলি না বা সারাদিনের বিষয়গুলো নিয়ে আলাপ করি না। তার সঙ্গে অন্য যে কারও মতোই গল্প করা উচিত। আমরা যা ভাবি, তারা তার চেয়ে অনেক বেশি কিছুই তারা বুঝতে পারে।

হয়তো কখনও কখনও তারা পরিবারের বেশি মনোযোগ পাওয়ার জন্য কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত কাজ করে বসে। কিন্তু তারা অপ্রিয় কিছু করলে তাতে প্রশ্রয় না দিয়ে ওই কাজটি না করার জন্য তাদের বোঝাতে হবে। অন্য শিশুদের যেভাবে সবাই ভালোবাসে এবং আগলে রাখে, তাদেরও সেভাবে ভালোবাসার মধ্যে নিরাপদে রাখতে হবে। কিন্তু নিরাপত্তার কথা ভেবে সবসময় চোখে চোখে রাখলে বা বেশি বেশি করে আগলে রাখলে তাদের আত্মনির্ভরশীল হওয়ার পথ থেমে যেতে পারে। পারবে না ভেবে তাদের কোথাও একা যেতে দিই না। ধীরে ধীরে তাদের পথচলা, দোকানে যাওয়া, বাড়ি ফেরা শেখাতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের বাইরে কীভাবে নিরাপদে থাকা যায়, তাও শেখাতে হবে। মনে রাখতে হবে, তাদের স্বনির্ভর কর্মক্ষম ও সুখী জীবনের পথচলায় আমাদের উৎসাহ ও আচরণগত পরিবর্তন আনতে পারলে তারা অনেক কিছুই করতে পারবে।

চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ; সাবেক সিনিয়র সচিব