প্রিয়জন যখন স্মৃতি

0
5

মুহম্মদ জাফর ইকবাল:

অ্যাডভোকেট সুপ্রিয় চক্রবর্তী কিংবা আমাদের রঞ্জুদা নিয়ে এরকম একটি লেখা লিখতে বসব, কখনও ভাবিনি। বেশ কিছুদিন থেকে আমি দেশের বাইরে, রঞ্জুদা দেশে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে আছেন খবরটি ভালো লাগেনি।

মানুষজন অসুস্থ হবে এবং মাঝে মাঝে হাসপাতালে যাবে, চিকিৎসা করে সুস্থ হয়ে আবার ফিরে আসবে- এটা খুবই স্বাভাবিক একটা ব্যাপার হওয়ার কথা। কিন্তু এদেশে থাকার কারণে হাসপাতাল শুনলেই বুকটা ধক করে ওঠে।

সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছেন সেরকম একটা খবরের জন্য অপেক্ষা করছি, তখন হঠাৎ করে খবর পেলাম রঞ্জুদা আর নেই। সেই থেকে মনটা বিষণ্ণ হয়ে আছে। দেশে থাকলে আপনজনদের সঙ্গে কথা বলে মনটা একটুখানি হলেও হালকা করা যেত। এখান থেকে তার উপায় নেই, ল্যাপটপে খবরগুলো পড়ে মনটা আরও ভার হয়ে থাকে।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী এবং তার স্ত্রী সুলতানা কামালের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছে চুরানব্বই সালের দিকে, যখন আমরা দেশে ফিরে এসে সিলেটে থিতু হওয়ার চেষ্টা করছি। ছেলেমেয়েরা ছোট তাদের জন্য একটা স্কুল খুঁজে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ জানতে পারলাম আনন্দ নিকেতন নামে একটা নতুন স্কুল তৈরি হয়েছে।

সেখানে গিয়ে সুলতানা কামাল আর সুপ্রিয় চক্রবর্তীর সঙ্গে পরিচয় হল। তাদেরও আমার ছেলের সমান একটি মেয়ে রয়েছে এবং সেই স্কুলে পড়ছে। আমাদের ছেলেমেয়েকেও সেই স্কুলে ভর্তি করানো হল। সুলতানা কামাল অনেক বড় মানবাধিকার কর্মী; কিন্তু তিনি সেই স্কুলটিকে দাঁড় করানোর জন্য সেখানে পড়ান।

আমার স্ত্রীও সেখানে পড়ানো শুরু করল। সুপ্রিয় চক্রবর্তী সুযোগ পেলেই তার গাড়ি করে আমার স্ত্রীকে স্কুলে পৌঁছে দিতেন, স্কুল থেকে বাসায় নামিয়ে দিতেন। তাদের মেয়ের সঙ্গে আমাদের ছেলেমেয়ের বন্ধুত্ব হল, পরিবারের সঙ্গে আমাদের পরিবারের ঘনিষ্ঠতা হল।

দীর্ঘদিন দেশের বাইরে থেকে দেশে এসে আমাদের থিতু হওয়ার ব্যাপারে এই দম্পতির একটা অনেক বড় ভূমিকা আছে। তারা সবসময় আমাদের পাশে থেকেছেন।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী সিলেটের মানুষ, তিনি আমাকে সিলেটের সংস্কৃতি জগতের সঙ্গে পরিচিত করে তুললেন। যে কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে আমাদের নিয়ে যেতেন। দেশে তখন জামায়াত-শিবিরের এক ধরনের নৈরাজ্য চলছে।

আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের হলের নাম শহীদ জননী জাহানারা ইমাম হল দেয়ার চেষ্টা করার কারণে একটা তুলকালামকাণ্ড শুরু হয়ে গেল। আমাদের বাসায় বোমা পড়ল, সুপ্রিয় চক্রবর্তী এবং সুলতানা কামালের বাসায় বোমা পড়া একটা নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা হয়ে গেল। আমি মোটামুটি বিস্ময় নিয়ে আবিষ্কার করলাম এসব ব্যাপারকে তারা থোড়াই কেয়ার করেন! মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে যুদ্ধাপরাধীদের বিপক্ষে দীর্ঘদিন থেকে সংগ্রাম করে আসছেন তাদের জন্য এটি নতুন কিছু নয়। দু’জনে মিলে তারা আপাদমস্তক একটা মুক্তিযোদ্ধা দম্পতি।

সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে আমি এ সময় নতুন করে আবিষ্কার করলাম। আমাদের সবারই পরিচিত লোকজন আছে, তাদের সঙ্গে কমবেশি ঘনিষ্ঠতা আছে। কারও কারও সঙ্গে সম্পর্কটা ভদ্রতার, কারও কারও সঙ্গে সম্পর্কটায় আন্তরিকতা আছে যেটা খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এত সহজ-সরলভাবে কথা বলেন, কথাবার্তায় এমন এক ধরনের সারল্য ও বুদ্ধিমত্তা আর রসবোধ আছে যে এই মানুষটিকে দেখলেই মন ভালো হয়ে যায়। দেখলেই মন ভালো হয়ে যায় এরকম মানুষ পৃথিবীতে খুব কম আছে।

দেশ থেকে বহুদূরে বসে আমি যখন এই লেখাটি লিখছি আমার শুধু মনে হচ্ছে কেন আমি তার সঙ্গে বেশি সময় কাটালাম না, আরও বেশি কথা বললাম না, আড্ডা দিলাম না। একজন মানুষের জীবন তো আর অর্থ-বিত্ত-সাফল্য নয়, একজন মানুষের জীবন হচ্ছে তার সঙ্গে অন্য মানুষের সম্পর্ক, অন্য মানুষের স্নেহ-মমতা-ভালোবাসা।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী, যাকে আমরা সবাই রঞ্জুদা বলে ডেকে এসেছি, আমার মতো কত মানুষের জীবনের মাঝে আনন্দের ছটা ছড়িয়ে তার জীবনকে অর্থপূর্ণ করেছেন, কে তার হিসাব রেখেছে?

সুপ্রিয় চক্রবর্তীর চরিত্রের বর্ণনা দেয়ার জন্য তার সম্পর্কে ছোট একটা ঘটনা বলতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে থাকার সময় বেতনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ইনকাম ট্যাক্স হিসাবে কেটে নিত, আমার নিজের বিশেষ কিছু করার ছিল না।

দেশে এসে আবিষ্কার করেছি আমার ইনকাম ট্যাক্সটি আমার নিজের দায়িত্ব। এসব ব্যাপারে আমি নেহায়েত আনাড়ি, তাই একজন ইনকাম ট্যাক্স লয়ারের খোঁজ করতে থাকি। তখন প্রায় হঠাৎ করে জানতে পারলাম সুপ্রিয় চক্রবর্তী একজন ইনকাম ট্যাক্স লয়ার।

পরিচিত আপনজনকে এরকম একটা কাজ দেয়া যায় কিনা সেটা নিয়ে এক ধরনের সংকোচ ছিল; কিন্তু তিনি জানতে পেরে সানন্দে আমার কাজ করে দেয়ার দায়িত্ব নিলেন।

এর কিছুদিন পর আমি আমার ছেলেমেয়ে, পরিবার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছি, ফিরে এসে সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কাছে আমার ইনকাম ট্যাক্স নিয়ে খোঁজখবর নিতে গিয়ে আবিষ্কার করলাম তিনি যে শুধু আমার কত টাকা ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে বের করেছেন তা নয়, নিজের পকেট থেকে সেই ইনকাম ট্যাক্সটুকু দিয়েও দিয়েছেন।

এখানেই শেষ নয়, কত টাকা দিয়েছেন জানার চেষ্টা করার পরও তিনি হাত নেড়ে পুরো ব্যাপারটি উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে থাকলেন, তুচ্ছ টাকা নিয়ে কথাবার্তায় তিনি সময় দিতে চান না।

আমি নিশ্চিত সারা পৃথিবীতে সুপ্রিয় চক্রবর্তী একমাত্র ইনকাম ট্যাক্স লয়ার, যিনি হিসাবপত্র করে ট্যাক্সের পরিমাণ বের করে নিজের পকেট থেকে সেটা দিয়ে দেন! (অনেক কষ্ট করে সেই পরিমাণটা বের করে আমি তাকে সেটা ফেরত দিতে পেরেছিলাম)।

কেউ যেন মনে না করে, যে মানুষটা রবীন্দ্রসঙ্গীতের জন্য পাগল, সংস্কৃতি চর্চা এবং ক্রিকেট ছাড়া আর কিছু বোঝে না, সেই মানুষটা বুঝি প্রফেশনাল জীবনে মোটামুটি দায়সারা। মোটেও তা নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অ্যারেস্ট করে জেলে ঢোকানো শুরু হল, তখন আমরা তার তীব্র প্রতিবাদ করেছিলাম, পত্রপত্রিকায় তার ছবিও ছাপা হয়েছিল।

বিষয়টি নিশ্চয়ই সামরিক বাহিনীর লোকজনের পছন্দ হয়নি, কারণ ইনকাম ট্যাক্স অফিসের কর্মকর্তারা আমাকে বলেছে, তখন সামরিক বাহিনীর গোয়েন্দারা এসে আমার সব কাগজপত্র খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেছে কোনো একটা ফাঁক-ফোকর খুঁজে বের করতে পারে কিনা।

কিন্তু সুপ্রিয় চক্রবর্তীর নিখুঁত কাজে কখনও কিছু খুঁজে পায়নি। শুধু সুপ্রিয় চক্রবর্তী নন, সেই সময়টিতে সুলতানা কামালও আমার খোঁজখবর নিয়েছেন। তার মা বেগম সুফিয়া কামাল তখন মৃত্যুশয্যায়।

তার ভেতর তিনি আমাকে ফোন করে জানিয়ে রেখেছিলেন আমাকে অ্যারেস্ট করতে চলে এলে কী করতে হবে। শেষ পর্যন্ত কেউ আমাকে অ্যারেস্ট করতে আসেনি, আমারও জেলখানার ভাত খেতে হয়নি।

সুপ্রিয় চক্রবর্তীর কথা বলতে হলে তার কোন কথাটা আগে বলব, কোন কথাটা পরে, বুঝতে পারি না। তিনি যে ছিলেন একজন সংস্কৃতিকর্মী এবং একজন ক্রীড়া সংগঠক সেটি সবাই জানে। আমরা যারা একটা অনুষ্ঠান উপভোগ করতে যাই, তারা শুধু কিছু অপূর্ব গান শুনে মুগ্ধ হয়ে বাসায় ফিরে আসি। আমরা কখনও চিন্তাও করতে পারি না এর পেছনে আয়োজকদের কত শ্রম গিয়েছে। ভলান্টিয়ারদের কত বিনিদ্র রজনী, শিল্পীদের কত মান-অভিমান, আমলাদের কতরকম হম্বি তম্বি শেষে একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা হয়, কত বিলের টাকা নিজের পকেট থেকে দিতে হয়- সেসব শুধু আয়োজকরাই জানে।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী হাসিমুখে সেগুলো করে এসেছেন। সাধারণ মানুষের জন্য তার ভেতরে এক ধরনের গভীর ভালোবাসা ছিল। তাদের বাসা ছিল আমার দেখা একমাত্র বাসা, যেখানে কোন্ মেয়েটি গান শিখতে এসেছে এবং কোন্ মেয়েটি বাসার গৃহকর্মী আলাদা করা যেত না, কারণ দু’জনই সমান উৎসাহে রিহার্সেল করত।

লেখাপড়া নিয়েও সুপ্রিয় চক্রবর্তীর আগ্রহ ছিল। সিলেটের একটা প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনেক কাজ করেছেন, আমি নিজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্রিয়ায় ছিলাম বলে মাঝে মাঝেই কোনো একটা বিষয় নিয়ে আমার সঙ্গে কথা বলে যেতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নিয়েছেন।

সদা হাস্যোজ্জ্বল, কৌতুকপ্রিয় এই মানুষটি নিশ্চয়ই ক্লাসে ছাত্রছাত্রীদের মুগ্ধ করে রাখতেন। সংস্কৃতি অন্তপ্রাণ এই মানুষটি ছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক, তাই তার দেহটি বিজ্ঞান গবেষণার জন্য কুমুদিনী হাসপাতালে দান করে গিয়েছেন। তাকে কীভাবে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় আমি জানি না, এক কথায় বলা যায়- তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন বাঙালি।

সুপ্রিয় চক্রবর্তী ছিলেন সিলেটের মানুষ; কিন্তু শেষের দিকে তিনি সিলেটে বেশি থাকতেন না। আমার স্ত্রী সেটা নিয়ে তাকে ঠাট্টা করত, দেখা হলে বলত, ‘আমরা বাইরের মানুষ এসে এখানে থেকে গেলাম আর আপনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।’

সুপ্রিয় চক্রবর্তী একটুখানি অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে শিশুর মতো হাসতেন। মাঝে মাঝে তার সঙ্গে এয়ারপোর্টে দেখা হতো- এক প্লেনে যাচ্ছি কিংবা আসছি। কত কিছু নিয়ে গল্প হতো, এখন সব শুধু স্মৃতি। রক্ত-মাংসের মানুষ হঠাৎ করে একদিন শুধু স্মৃতি হয়ে যায়, কী আশ্চর্য একটি ব্যাপার!

সুপ্রিয় চক্রবর্তী চলে যাওয়ার পর সংবাদমাধ্যমে একটা খবর পড়ে মনে কষ্ট পেয়েছি। সুলতানা কামাল নাকি সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে কলকাতায় নিয়ে চিকিৎসা করাতে চেয়েছিলেন। সুলতানা কামালকে ভারতীয় ভিসা দেয়া হয় না বলে তারা যেতে পারেননি।

সুলতানা কামালকে ভারতীয় ভিসা দেয়া হয় না সুন্দরবন রক্ষার জন্য রামপালের কয়লা দিয়ে চালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বিরোধিতা করার জন্য। আমার দেশের একটা ঐতিহ্যকে রক্ষা করার জন্য আমি তো আন্দোলন-সংগ্রাম করতেই পারি, সেজন্য ভিন্ন একটা দেশ আমার ওপর বাধানিষেধ দেবে, সেটি কোন ধরনের যুক্তি?

পৃথিবীর অন্যসব দেশের হাইকমিশন-অ্যাম্বাসি এক ধরনের হলেও ভারতীয় হাইকমিশন একটু অন্যরকম হওয়ার কথা। পশ্চিম বাংলার সঙ্গে আমাদের এক ধরনের সাংস্কৃতিক বন্ধন আছে। তারা কি এদেশের সুলতানা কামালদের কথা জানে না?

সুপ্রিয় চক্রবর্তীকে কলকাতা নিয়ে চিকিৎসা করাতে পারলে তিনি সত্যি সত্যি সুস্থ হয়ে যেতেন কিনা আমরা জানি না। সেটি নিয়ে বুকের ভেতর একটুখানি ক্ষোভ থেকে যাবে। তবে তিনি এর সবকিছুর ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। আমাদের বুকে এখন একটি স্মৃতি হয়ে থেকে যাবেন।

সেই স্মৃতিটা অসম্ভব মধুর একটি স্মৃতি- সেই কথাটি তাকে আর বলতে পারব না।

মুহম্মদ জাফর ইকবাল : লেখক ও অধ্যাপক

Leave a Reply