পয়লা বৈশাখে থাকুন সচেতন

পয়লা বৈশাখ মানেই বাঙালির প্রাণের উৎসব। তবে এই উৎসব সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে উদ্​যাপন এবং এর পরবর্তী সুস্থ থাকার জন্য কিছু বিষয় খেয়াল রাখা জরুরি। এখন দিনের বেলায় সাধারণত প্রচণ্ড গরম থাকে। আবার এক পশলা বৃষ্টিও হতে পারে, তার জন্যও প্রস্তুতি নিতে হবে। মূলত প্রস্তুতিটা গরম ও রোদকে ঘিরেই নেওয়া দরকার। গরম হলেও ঘোরাঘুরি তো আর থেমে থাকবে না। শরীর যেন পানিশূন্য না হয়ে যায়, সে জন্য বেশি করে পানীয় পান করতে হবে। একটানা না হেঁটে মাঝেমধ্যে একটু বসে নিতে হবে। তাহলে বেশি ক্লান্ত হবেন না।

এদিন যে ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা হতে পারে—
■ শরীরে পানিস্বল্পতা
■ ফুড পয়জনিং (খাদ্যে বিষক্রিয়া)
■ হিট ক্র্যাম্প, হিটস্ট্রোক
■ সূর্যরশ্মিতে চামড়া পুড়ে যাওয়া ইত্যাদি।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র রায় বলেন, পয়লা বৈশাখে সারা দিনই মূলত বাইরে থাকা হয়। এবার অবশ্য গরম যেমন পড়েছে তেমনি হঠাৎ বৃষ্টিও হানা দিচ্ছে। গরমের কারণে সবচেয়ে বেশি যে সমস্যা হয় তা হলো পানিস্বল্পতা। আর বৃষ্টিতে ভিজলে আবার লাগতে পারে ঠান্ডা-সর্দি কাশি। তাই সাবধানে থাকতে হবে। সঙ্গে নিতে হবে ছাতা। ডায়াবেটিসের রোগী ও শিশুদের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। এদিন সাধারণত বাইরের খাবারই খাওয়া হয়। খাবার যেন বেশি তেল-মসলাযুক্ত, ভাজাপোড়া না হয়। এমনকি পনির, ঘি দেওয়া খাবারও এড়িয়ে যাওয়া ভালো। কারণ, এসব খাবার হজমে প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়।

পর্যাপ্ত ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্গে রাখতে হবে
এই গরমে ঘামে শরীর থেকে প্রচুর লবণ-পানি বের হয়ে যায় বলে শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দেয়। সাধারণত এর ফলে শরীরের রক্তচাপ কমে যায়, দুর্বল লাগে, মাথা ঝিমঝিম করে। পানিস্বল্পতা গরমের খুবই সাধারণ সমস্যা হলেও অবহেলা করলে তা মারাত্মক হয়ে যেতে পারে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোকও হতে পারে। এ বিপদ থেকে মুক্ত থাকতে প্রচুর পানি পান করতে হবে। তবে তা যেন বিশুদ্ধ হয়। না হলে এর থেকে পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

কত গ্লাস পানি পান
পানি পান বিষয়টি শরীর থেকে অতিরিক্ত ঘাম বের হয়ে যাওয়ার ওপর নির্ভর করে। সাধারণত এই গরমে পানি খাওয়া বাড়াতে হবে সবার জন্য। সাধারণত দিনে সাত-আট গ্লাস পানি পান করার কথা থাকলেও এ সময় ১০ থেকে ১২ গ্লাস বা প্রয়োজনে বেশি পানি পান করতে হবে। বাচ্চাদের জন্য বিশেষ করে সাত-আট বছরের বাচ্চাদের জন্য পাঁচ-ছয় গ্লাস পানি পানের ব্যবস্থা করতে হবে।

খাবার যেমন হওয়া উচিত
যেহেতু ঘামের সঙ্গে পানি ও লবণ দুই-ই বের হয়ে যায়, সেহেতু লবণযুক্ত পানীয় যেমন খাওয়ার স্যালাইন বা ডাবের পানি বেশি করে পান করা যেতে পারে। নানা রকম ফল এবং লেবুর শরবত শরীরের প্রয়োজনীয় পানি ও লবণের ঘাটতি মেটাবে। ভাজাপোড়া, অধিক তেল, মসলাজাতীয় খাবার একদমই এড়িয়ে যেতে হবে। সাধারণ খাবার যেমন ভাত, সবজি, মাছ ইত্যাদি খাওয়াই ভালো। খাবার যেন টাটকা হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চা ও কফি যথাসম্ভব কম পান করা উচিত।

একটানা পরিশ্রম না করাই ভালো
পয়লা বৈশাখের কয়েক দিন আগে থেকে যাঁরা কেনাকাটা করতে এবং বিভিন্ন অনুষ্ঠান আয়োজনে দিনরাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন, তাঁদের এদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। একটানা ছোটাছুটি করলে পরিশ্রান্ত হবেন তাড়াতাড়ি। এর ফলে অনেকের মাথাব্যথা হতে পারে। পানিশূন্যতার মতো সমস্যা হতে পারে। বাইরের খাবার গ্রহণের ফলে পেটের পীড়া দেখা দিতে পারে। এসব বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।

ঘুরতে বের হয়ে একটানা না হেঁটে কিছুক্ষণ বসে জিরিয়ে নিন। সকালের কাজ শেষে দুপুরে বাড়ি গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে বিকেলের দিকে আবার ঘুরতে বের হতে পারেন। এতে ক্লান্ত হবেন না, চাঙা লাগবে।

ছাতা রাখুন সঙ্গে
নববর্ষে সাধারণত কাঠফাটা রোদ থাকে। এই রোদে ঘোরাঘুরি করলে হতে পারে মাথাব্যথা; অতিরিক্ত ঘাম থেকে দেখা দিতে পারে পানিস্বল্পতা। শুধু কি তাই? ত্বক পুড়ে কালো হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তাই বাইরে বের হলে অবশ্যই সঙ্গে ছাতা রাখুন।

ডায়াবেটিসে আক্রান্তদের সচেতনতা
নববর্ষে ঘুরতে বের হলে বেশ পরিশ্রম হয়। বেশি পরিশ্রম করলে দেখা দিতে পারে হাইপোগ্লাইসেমিয়া। রক্তে শর্করার মাত্রা কমলে এটা হতে পারে। হাইপোগ্লাইসেমিয়ায় আক্রান্ত হলে মাথা ঘোরে, মাথা ঝিমঝিম করে, অস্থির লাগে, চোখে অন্ধকার দেখে, মেজাজ খিটমিটে হয়, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হয়। এ লক্ষণ দেখা দিলে আক্রান্ত ব্যক্তির মুখে মিষ্টিজাতীয় খাবার পুড়ে দিন। কিছুটা শক্তি ফিরে পাবেন তিনি।

হতে পারে হিটস্ট্রোক
গরমে দেখা দিতে পারে হিটস্ট্রোক। হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তির লক্ষণগুলো হলো, দেহের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়া, ঘাম হওয়া বন্ধ হয়ে শরীর লালচে হয়ে যাওয়া, দ্রুত হৃৎস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট, আচার-আচরণে পরিবর্তন, যেমন হঠাৎ রাগান্বিত হওয়া, অস্থিরতায় ভোগা, পারিপার্শ্বিক অবস্থা সম্পর্কে কোনো ধারণা না থাকা, খিঁচুনি থেকে অনেকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। হিটস্ট্রোকের প্রথম ও প্রধান চিকিৎসা হলো আক্রান্ত ব্যক্তির দেহের তাপমাত্রা কমাতে হবে। এ জন্য কোনো ধরনের উপসর্গ দেখা দেওয়ামাত্রই আক্রান্ত ব্যক্তিকে রোদ থেকে সরিয়ে ঠান্ডা জায়গায় নিতে হবে। শরীরের কাপড় যতটুকু সম্ভব খুলে ফেলে শরীরে ঠান্ডা পানি ঢালতে হবে, তবে বরফ-শীতল পানি ঢালা যাবে না। কারণ, এতে করে রক্তনালিগুলো সংকোচনের ফলে দেহের তাপমাত্রা কমার পরিবর্তে আরও বাড়বে, রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হবে। রোগীকে বাতাস করতে হবে। কুঁচকি ও বগলের নিচে আইস প্যাক রাখলে তাপমাত্রা দ্রুত কমে আসবে।

এদিন চা-কফিকে না বলুন
চা-কফি ও কৃত্রিম সসকে না বলতে হবে গরমের এই দিনে। কারণ, শরীরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য চা ও কফিই যথেষ্ট। এসব পানীয়তে ব্যবহৃত চিনি শরীরের পানি কমিয়ে দেয়।

ছোটরা থাকুক নিরাপদে
বিশেষ করে বাচ্চাদের যতটা সম্ভব কড়া রোদ থেকে নিরাপদে রাখতে হবে। বাড়ি থেকে ছোট বোতলে পানি নিতে হবে। শিশুদের অল্প ঘামেই পানিস্বল্পতা হতে পারে। তাই একটু পরপর পানি খাওয়াতে হবে। ডাবের পানিও খাওয়াতে পারেন। ছয় মাস বয়সের আগ পর্যন্ত নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। বেশিক্ষণ রোদের মধ্যে নবজাতককে না নেওয়া ভালো।

বাসায় ফিরে কী করবেন
সারা দিন রোদে ঘুরে বাসায় এসেই ঠান্ডা পানি খাবেন না। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর খাবেন, তাহলে সর্দি বা ঠান্ডা লাগার ভয় থাকবে না।

বাইরে থেকে এসে বিভিন্ন ফলের জুস বা লেবুর শরবত খেতে পারেন। এতে শরীর থেকে ঘামের সঙ্গে বের হয়ে যাওয়া পানির ঘাটতি পূরণ হবে।

সারা দিনই ঘোরাফেরার ফলে শরীরে ব্যথা অনুভব হবে। তাই ফিরে গরম পানি দিয়ে গোসল করলে ব্যথা ও ক্লান্তি অনেকাংশে দূর হয়ে যাবে।

LEAVE A REPLY