বোমা বিস্ফোরণ-টার্গেট পুলিশ

0
2

এ কে এম শহীদুল হক :

সম্প্রতি ঢাকা মহানগরীতে তিনটি স্থানে বোমা বিস্ফোরণ ও দুটি স্থানে পুলিশ বক্সের সন্নিকট হতে বোমা উদ্ধার ঘটনায় জনমনে নানা প্রশ্ন ও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২৯ এপ্রিল গুলিস্তানে পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা, ২৬ মে মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে বোমা বিস্ফোরণ এবং ৩১ আগস্ট সায়েন্স ল্যাবরেটরি পুলিশ বক্সের সন্নিকটে বোমা বিস্ফোরণ হয়। প্রত্যেকটি ঘটনায় পুলিশ সদস্য আহত হয়। ২৩ জুলাই তেজগাঁও খামারবাড়ি ও পল্টন পুলিশ বক্সের কাছ থেকে বোমা উদ্ধার করা হয়। ধারণা করা হয়, পুলিশকে হতাহত করার লক্ষ্য নিয়েই বোমাগুলো রাখা হয়েছিল। ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সাইট ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে জানা যায়, আইএসআই এসব ঘটনার দায় স্বীকার করেছে।

বোমা বিস্ফোরণ ও বোমা উদ্ধারের ঘটনায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, কারা ও কী উদ্দেশ্য এসব নাশকতামূলক কাজ করছে। বোমাগুলো একই প্রকৃতির। বিস্ফোরণও প্রায় একই প্রক্রিয়ায়। ধারণা হয়, এগুলো দূরনিয়ন্ত্রিত (Remote Control) ছিল। পুলিশকেই-বা কেন টার্গেট করা হচ্ছে? জঙ্গিরা কি আবার সংগঠিত হচ্ছে? তারা কি বড়ো ধরনের কোনো নাশকতার ঘটনা ঘটানোর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, ইত্যাদি অনেক প্রশ্নই সচেতন মহলে ঘুরপাক খাচ্ছে। ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়াও এসব ঘটনাকে হাইলাইট করে প্রতিবেদন উপস্থাপন করছে। টক শো হচ্ছে। বিশিষ্টজন, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা নানা মতামত ব্যক্ত করছেন।

ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ ও আইএসআইয়ের দায় স্বীকারের পরিপ্রেক্ষিতে ধারণা হয়, ঘটনাগুলো জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরাই পরিকল্পিতভাবে ঘটাচ্ছে। বোমা বা IED (Improvised Explosive Device)-গুলো তত শক্তি মাত্রার না হলেও কোনো ব্যক্তির ওপর সরাসরি নিক্ষেপ করলে ঐগুলো দ্বারা আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটানো এবং জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা সম্ভব।

যে প্রশ্নটি ঘুরেফিরে সবাই করে, তা হলো পুলিশ কেন টার্গেট। এর উত্তরও সহজ। পুলিশের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করা। মনোবল দুর্বল করা। দেশে-বিদেশে বিভিন্ন নামে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন আছে। জঙ্গি সংগঠনগুলো একটি ‘ধর্মীয়’ বা ‘দর্শনে’ বিশ্বাস করে অপতত্পরতা চালায়। তারা গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকেও তাগুদি সরকার বলে। দেশের আইনকে বলে তাগুদি আইন এবং পুলিশসহ সরকারের অন্যান্য বাহিনীর শক্তিকে বলে তাগুদি শক্তি। তাগুদি শব্দের অর্থ হলো ইসলামবিরোধী বা শয়তান দ্বারা তৈরি। তারা শয়তানি শক্তি ও শয়তানি আইনের অবসান করে খেলাফত প্রতিষ্ঠা করত আল্লাহর আইন বলবত্ করতে চায়। জঙ্গিরা মনে করে, পুলিশের ওপর হামলা করে তাদের মনে ভীতি সঞ্চার করে মনোবল ভেঙে দিলে তাদের ভাষায় তাগুদি শক্তি দুর্বল হবে এবং তারা তাদের ধ্বংসাত্মক ও অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড নির্বিঘ্নে চালিয়ে যেতে পারবে।

জঙ্গিরা শুধু পুলিশকেই তাগুদি শক্তি বলে না, তারা সরকারের অন্যান্য শক্তিকেও তাগুদি শক্তি মনে করে। প্রশ্ন হলো তারা সেনাবাহিনী, বিজেপি বা অন্যদেরকেও টার্গেট করছে না কেন? তার কারণ পুলিশই জঙ্গি, সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। অভিযান চালায়, গ্রেফতার করে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই গুলশানের হলি আর্টিজন বেকারি এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় জঙ্গিদের হামলার পর পুলিশ জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান পরিচালনা করে বাংলাদেশে জঙ্গিদের শক্তি ধ্বংস করে দিয়েছে। তাই পুলিশই এসব হামলার টার্গেট হচ্ছে।

সম্প্রতি সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণগুলো মারাত্মক না হলেও এ হামলাকে ছোটো করে দেখার সুযোগ নেই। এ ঘটনার মাধ্যমে জঙ্গিরা মেসেজ দিতে চাইছে যে, তারা নিচিহ্ন হয়ে যায়নি। তারা আছে এবং সক্রিয় আছে।

বাংলাদেশে জঙ্গিদের উত্থানে রাজনৈতিক শক্তির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তাও ছিল। বিশেষ করে, ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসার পর জামায়াতে ইসলামের সমর্থন ও সহযোগিতায় হুজি ও জেএমবি অপ্রতিরোধ্য হয়। জেএমবির শীর্ষ নেতা তথা সুরা সদস্যদের অনেকেই জামাতে ইসলামীর রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। শায়েখ আব্দুর রহমান জামায়াতের সাবেক নেতা ছিলেন। তারপর জেএমবির দায়িত্ব নেন মাওলানা সাইদুর রহমান। তিনিও হবিগঞ্জ জেলার জামায়াতে ইসলামীর আমির ছিলেন। জোট সরকারের আমলে ২০০২ সালে ৩০ মে দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর থানায় আটজন জেএমবি সদস্য বোমা, প্রচারপত্র ও জঙ্গিসংক্রান্ত প্রকাশনাসহ গ্রেফতার হয় । কিন্তু সহজেই তারা আদালত থেকে জামিন পেয়ে পলাতক হয়। তাদের বিরুদ্ধে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এর পেছনেও তত্কালীন সরকারের প্রভাবশালী মহলের হাত ছিল বলে অভিযোগ আছে। ২০০৪ সালে জঙ্গিদের ভাড়া করে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে শক্তিশালী গ্রেনেড হামলা করে আওয়ামী লীগের ২৪ জন নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছিল। তিন শতাধিক আহত হয়। লক্ষ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যা করা এবং আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বশূন্য করে দেওয়া। তত্কালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারের আমলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার সুষ্ঠু তদন্তও হয়নি। জজ মিয়া নাটক সাজিয়ে তদন্তের গতি ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে জঙ্গিদের আরো সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। যার ফলে ২০০৫ সালে ১৭ আগস্ট ৬৩ জেলার ৫০০ স্থানে এক মিনিটের ব্যবধানে শত শত বোমা বিস্ফোরিত হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি অর্থাত্ জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে। জঙ্গিরা সব সময়ই শেখ হাসিনাকে শত্রু মনে করে। তারা মনে করে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ তাদের কর্মকাণ্ডের প্রধান বাধা। তাই শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য জঙ্গিরা কয়েকবার চেষ্টা চালিয়েছে। দেশ ও জনগণের নিরাপত্তার জন্য জঙ্গি দমনের এ সাফল্যকে ধরে রাখা একান্ত প্রয়োজন। অস্তিত্ব সংকটে থাকা জঙ্গিরা পুনঃসংগঠিত হতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের সমর্থক ও অনুসারীদের চাঙ্গা করে হয়তো নতুনভাবে তত্পর হওয়ার চেষ্টা চলাচ্ছে। পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে অত্যন্ত তত্পর থাকতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে জঙ্গিদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের ব্যবস্থা নিতে হবে। ঢাকা মহানগরীতে যে চারটি ঘটনা ঘটেছে সবগুলোই একই পদ্ধতিতে ও একই রকম IED ব্যবহার করা হয়েছে। এতে বোঝা যায় একই ব্যক্তি বা গ্রুপ এ কাজগুলো করেছে। যে কোনো প্রকারেই হোক, এসব হামলার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে শনাক্ত করে গ্রেফতার করতে হবে। ওদেরকে গ্রেফতার করতে না পারলে ওদের সাহস বেড়ে যাবে এবং আরো ঘটনা ঘটাবে। বড়ো নাশকতামূলক ঘটনা ঘটিয়ে দিতে পারে। মনে রাখতে হবে, যে রাজনৈতিক শক্তির ছত্রছায়ায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় দেশে জঙ্গিবাদের উত্থান হয়েছিল সেই অপশক্তি এখনো দেশে আছে। তারা সংশোধিত হয় নাই। তারা নিজেদের ভুল ও অপকর্মের জন্য জাতির কাছে ক্ষমাও চায়নি। পক্ষান্তরে গোপনে তারা শান্তি ও প্রগতির বিরুদ্ধে নানা রকম ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু জনসমর্থন ব্যতীত চোরাগোপ্তা মানুষ মেরে, দেশের মধ্যে অশান্তি ও অরাজকতা সৃষ্টি করে কোনো শক্তিই কখনো রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। অতি সম্প্রতি আইএসআইয়ের শোচনীয় পতনও তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এত অর্থবিত্ত, সমরাস্ত্র ও ভিন্ন দেশের পরোক্ষ সমর্থন ও সহযোগিতা পেয়েও তাদের শোচনীয় পরাজয় হয়েছে। তাদের সর্বশেষ ঘাঁটির পতনের পর তারা ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে আর অনলাইনে নানা রকম আজগুবি প্রচারণা চালাচ্ছে। আইএসের মধ্যে নানা রকম অনৈসলামিক কাজ হতো, তাও মিডিয়ার মাধ্যমে বিশ্ববাসী জানতে পেরেছে। তথাকথিত জেহাদ করে জান্নাতে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে মানুষকে শুধু ভুল ও ধ্বংসের পথেই নিয়ে যাচ্ছে না, ইসলামেরও প্রভূত ক্ষতি করছে। তাই যারা ভুল করেছে, জঙ্গিতে নাম লিখিয়েছে, এখনো তাদের সুযোগ আছে ঐ পথ থেকে সরে আসার। আল্লাহ তাদের হেদায়েত করুন।

পুুলিশি কার্যক্রমের পাশাপাশি জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন অব্যাহত রাখতে হবে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র পর্যন্ত সবাইকে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আলেম, ওলেমা, শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, পেশাজীবী সংগঠন, রাজনীতিবিদ সকলকেই জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। নতুন করে যাতে জঙ্গি সৃষ্টি না হয়, তার জন্য counter narrative-এর মাধ্যমে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মাদ্রাসা তথা সমাজের সর্বস্তরে সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে কাজ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগে De-radicalization ও Rehabilitation কর্মসূচি চালু করা অপরিহার্য। এই উদ্যোগকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এভাবে দেশ ও জনকল্যাণে Holistic way-তে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গোটা জাতিকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

লেখক : সাবেক আইজি, বাংলাদেশ পুলিশ