রাজনীতিতে শুদ্ধি অভিযান দরকার

0
4

এম হাফিজউদ্দিন খান:

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর নীতি, আদর্শ ও গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। এখানে আওয়ামী লীগই বলি, বিএনপি বা জাতীয় পার্টি—মতাদর্শ বা চরিত্রগত দিক থেকে প্রায় এক। কোনো দলই গণতন্ত্রচর্চার দিক থেকে পরিচ্ছন্ন নয়। বিরোধী দল বলে এখানে তো কিছু নেই এখন। জাতীয় পার্টি বিরোধী দল হিসেবে অনেক দিন ধরেই সংসদে কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু তারা আদৌ কোনো বিরোধী দল নয়। তারা এক হিসেবে সরকারেরই অংশ। তারা যে একটি বড় দল ছিল, একটা বিশেষ প্রভাব ও বৈশিষ্ট্য ছিল, আজ আর সেসবের কিছু নেই বলেই মনে হয়। এরশাদ সাহেব বেঁচে থাকতেও শেষের দিকে দলের জন্য বিশেষ কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। তাঁর প্রয়াণের পর দল প্রায় ভেঙেই যাচ্ছিল। ভেঙে যেতে যেতে আবার টিকে গেছে। কিন্তু তেমন কোনো বড় ভূমিকা তো তাদের নেই।

এখন আওয়ামী লীগই একমাত্র দল, তারাই রাজনীতির মাঠে সক্রিয় এবং প্রভাব নিয়ে আছে। তারাই সরকার পরিচালনায় আছে। তাদের বাইরে আর কোনো রাজনৈতিক দলের চর্চা তো সেভাবে দেখা যায় না। বলতে গেলে তারাই বাংলাদেশের একমাত্র রাজনৈতিক দল। ভালো ও মন্দ—যা-ই করুক তারা দেশের ভালো-মন্দ নির্ধারণে কাজ করে যাচ্ছে।

সরকারি দলের অঙ্গসংগঠনের নানা রকম কর্মকাণ্ডে দেশে তোলপাড় চলছে। সংবিধানে কিন্তু পরিষ্কার বলা আছে—কোনো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন থাকতে পারবে না। এটা কেউ মানছে না। নির্বাচন কমিশন এসব নিয়ে কোনো কথা বলে না। সংবিধানের এই কথাটি সবাই বলতে গেলে ভুলে গেছে। এখন দেশে যেসব বড় ধরনের ঘটনা ঘটছে, তা কারা ঘটাচ্ছে দেশের মানুষ ভালোভাবেই অবগত আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সরকারদলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে, এটাকে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি দিক বলে মনে করি। দুর্নীতি এবং ক্ষমতা ব্যবহার করার মধ্য দিয়ে আমাদের নৈতিক পতন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে, তা আমরা দেখতে পাচ্ছি। ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় শীর্ষ দুই নেতা ইতিমধ্যে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে বিতাড়িত হয়েছেন। তাঁদের জায়গায় নতুন ছাত্রনেতা এসেছেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, সংগঠনের নেতা বদল করলেই কি সব ঠিক হয়ে গেল? এর ভেতরে যে আরো গভীর সমস্যা আছে, সেসবের ডালপালা কিভাবে কোথায় ছড়িয়ে গেছে, তা নিয়ে কোনো কিছু জানা গেল না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক সাহেব এক বক্তৃতায় বলেছেন, শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই নয়, বাংলাদেশের প্রায় সব কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি আছে। আমি মনে করি, আরেফিন সাহেব কোনো ভুল কথা বলেননি। এখন যেটা হয়—যেসব খবর আমাদের সামনে আসে, টেলিভিশন ও পত্রিকায় ফলাও করে প্রচারিত হয়, শুধু সেসবই আমরা জানতে পারি। এর বাইরেও যে কত অনিয়ম ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের ঘটনা ঘটে, কত দুর্নীতি হয় তা আমাদের দৃষ্টির আড়ালে থেকে যায়।

ছাত্রলীগের বাইরে আওয়ামী লীগের আরেক অঙ্গসংগঠন যুবলীগেও দুর্নীতির শেষ নেই। দু-একটি বেরোতে শুরু করেছে। ক্যাসিনো খুলে কী ভয়ানক কারবার চলে এসেছে দিনের পর দিন কেউ টেরও পায়নি? হঠাৎ করে র‌্যাবের অভিযানে এসব গোপন বিষয় এখন প্রকাশ্যে চলে এসেছে। এমন খবরও পাওয়া যাচ্ছে, পুলিশি পাহারায় এসব কাণ্ড সংঘটিত হতো। ভাবা যায়, দেশে দুর্নীতি ও ক্ষমতার দুর্বৃত্তায়ন কোথায় গিয়ে ঠেকেছে? পত্রিকায় বা টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি। এসব যে চলে আসছে, প্রশাসনও জানত। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, কোনো অভিযান পরিচালিত হয়নি। কেন হয়নি? কেউ জানে না। একমাত্র প্রধানমন্ত্রী যদি চান, তাহলেই শুধু অভিযান হয়।

সত্যি বলতে, বাংলাদেশের রাজনীতি এখন ভীষণভাবে কলুষিত হয়ে পড়েছে। রাজনৈতিক নেতাদের আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা এখন আছে বলে মনে হয় না। এখন তাঁরা যদি দেশ পরিচালনা করেন, তাহলে এসব ঘটনা ঘটবে। কারণ এখানে তো সেই অর্থে নীতি নেই। আদর্শ নেই। ক্ষমতাকে নিজের সুবিধার জন্য যদি ব্যবহার করা হয়, সেখানে ভালো কিছু কিভাবে আমরা আশা করতে পারি।

এখানে নির্বাচনে টাকার খেলা হয়। ক্ষমতার প্রভাব চলে। এখন আর এসব বলেও কিছু হয় না। কারণ দেশে একক ক্ষমতার ভিত্তিতে রাজনীতি ও গণতন্ত্র চলছে। দেশে যে এত অনিয়ম ও দুর্নীতি হচ্ছে, তারা যদি নিজেরাই অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তাহলে তো মুশকিল।

আশার কথা হচ্ছে, দেশে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছে। এটা কত দিন চলতে পারবে সেটাই দেখার বিষয়। আমি মনে করি, এসব দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে যা করা যেতে পারে—ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে হবে, গণতন্ত্রের চর্চার পাশাপাশি নৈতিকতার চর্চাটাও জরুরি, তাহলেই সম্ভব দুর্নীতি বন্ধ করা। আর দরকার রাজনৈতিক সততার।

বিএনপির রাজনীতি এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিয়ে বলার মতো কথা সামান্যই। তারা দিন দিন পিছিয়ে পড়ছে। সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তারা ঝিমিয়ে পড়েছে। আবার দেশের সামাজিক সংকট ও সমস্যা এবং সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো—এসব বিষয়ে তাঁদের কোনো বলিষ্ঠ ভূমিকা নেই। এমনকি তাদের যে চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া—তাঁকেও তারা কারামুক্ত করতে পারেনি। শোনা যাচ্ছে, তিনি খুবই অসুস্থ। আবার তিনি যদি বের হয়ে আসেন, মানে নিয়ম মেনে তিনি যদি মুক্তি পানও, রাজনীতিতে সেই উদ্যম আর থাকবে কি না, তিনি দলের জন্য কিছু করতে পারবেন কি না সেটাও ভাবার বিষয়। বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি তারেক রহমান। তিনি তো নানা ধরনের মামলায় জর্জরিত আছেন। তাঁর দেশে ফেরার সম্ভাবনাও বলতে গেলে কম। আবার দলে যাঁরা সিনিয়র নেতা আছেন, এমনকি কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক নেতা, অনেকেই মামলায় অভিযুক্ত। সব মামলাই যে রাজনৈতিক মামলা, তা তো নয়। এসব কারণে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানো, তাদের সাংগঠিনক কার্যক্রম ও গণতন্ত্রের যাত্রা খুব একটা সুবিধার পর্যায়ে আছে বলে মনে হয় না।

আর জামায়াতে ইসলামীর কথা তো বলার কিছু নেই। শোনা যাচ্ছে, তারা নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করার চেষ্টায় আছে। জামায়াতের সাবেক নেতা মজিবর রহমান মঞ্জু সাহেবের নেতৃত্বে নতুন দল গঠনের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে মার্চের মধ্যে তারা আত্মপ্রকাশ করবে। দলের কী নাম হবে, তারা এখনো বলেনি বা চূড়ান্ত করেনি। এটা গেল একটা দিক। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে, জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিয়ে এ দেশের মানুষের মধ্যে একটা পরিষ্কার নেতিবাচক ধারণা বা অসন্তোষ আছে। সচেতন মানুষ তাদের রাজনীতি পছন্দ করে না, এমনকি তাদের মানতেই চায় না। জামায়াত যে এত বড় একটি সুসংগঠিত সংগঠন, তারা কিন্তু এত বছরেও একটি অবস্থান তৈরি করতে পারেনি। ১৯৭১ সালে তাদের যে ভূমিকা, সেসব নিয়ে তারা সমালোচিত ও অনেক ক্ষেত্রে অগ্রহণযোগ্যও; সেটা পাশ কাটিয়ে এসে নতুন করে আরেকটি দল যদি গঠন করা হয় জামায়াতেরই একজন পুরনো নেতার মাধ্যমে, সেটা কত দূর কী হবে বলা যায় না। ১৯৭১ সালে তারা যে ভুল করেছে, অন্যায় করেছে—এসব তো স্বীকার করে না। ক্ষমা চাওয়ার প্রশ্নও তাই নেই; তাদের মতে। নতুন দল গঠন করতে গেলে তাদের ভাবনা ও চিন্তাটা পরিষ্কার করে মানুষকে জানাতে হবে। একাত্তরের ভূমিকা নিয়ে পরিষ্কার হতে হবে। দোষ স্বীকার করে ক্ষমা চেয়ে ভুল স্বীকার করে নিতে হবে। স্বাধীন দেশের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্য আছে, তা প্রকাশ্যে বলতে হবে। তবু বড় কিছু বা আদৌ কিছু হবে কি না তা বলা যায় না। নতুন দল গঠন করা সম্ভব হলেও দেশে কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারবে কি না সেটা নিয়েও প্রশ্ন তোলার অবকাশ আছে। জামায়াত নতুনভাবে সামনে এসে বড় ধরনের কিছু একটা করে ফেলতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা