শুধু অভিযোগ দিয়েই দুর্নীতি বন্ধ করা যায় না

0
39

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরীঃ

ঘুষ নেয়া হচ্ছে, হয়রানি হচ্ছে- এমন অভিযোগ দিলেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। দুদক যখন দুর্নীতির সুনির্র্দিষ্ট অভিযোগ পায়, অনুসন্ধান চালিয়ে অকাট্য প্রমাণ পায়, তখন দুর্নীতিবাজদের ধরার চেষ্টা করে। কখনও সফল হয়, কখনও হয় না।

কিন্তু দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত ও পরবর্তীকালে আদালতে বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে ঘুষের শিকার ভুক্তভোগীরা সাহসভরে এগিয়ে আসতে চায় না। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠগুলো নীরব হয়ে যায়। দুদকের প্রাণান্তকর প্রয়াসেও সাক্ষী পাওয়া যায় না।

ঘুষের বিরুদ্ধে উচ্চ কণ্ঠের ব্যক্তিরা নিজেদের আড়াল করে ফেলে। তাদের ধারণা, যাদের সঙ্গে এতদিন লেনদেনের সখ্য ছিল এবং স্বার্থের আদান-প্রদানে বোঝাপড়া ছিল, তার ছন্দপতন ঘটবে। ফলে ভবিষ্যতে ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং ও মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানির মতো অনেক অনৈতিক সুবিধার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে।

এভাবে একশ্রেণীর ব্যবসায়ী ও নাগরিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে পারস্পরিক সমঝোতামূলক পরিস্থিতি (win win situation) তৈরি করে রেখেছে। তারাই সরকারি অফিসে ঘুষের প্রস্তাব দিয়ে কর্মকর্তাদের প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে অনৈতিক সুবিধা নিচ্ছেন।

দেশের অর্থনীতি বা জনস্বার্থের কী ক্ষতি হল, তা তাদের বিবেচ্য নয়। কিন্তু একটু স্বার্থহানি হলে বা ভাগবাটোয়ারায় তারতম্য ঘটলে তারাই মুহূর্তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে যান। দুদকের দুর্নীতিবিরোধী সাম্প্রতিক একটি অভিযানের ঘটনা আমার এ ক্ষোভমিশ্রিত লেখনীর উৎস।

গত ১০ জানুয়ারি, ২০১৯ চট্টগ্রাম কাস্টম হাউজে দুদকের আকস্মিক অভিযানে ধরা পড়ে এক কর্মকর্তা। তার হেফাজতে রক্ষিত ৬ লাখ টাকা এবং অতিপ্রাসঙ্গিক কিছু আলামতও জব্দ করে দুদক। সরকারি অফিসে হাতেনাতে বেআইনি অর্থসহ কাউকে আটক করা ওই অফিসে বজ্রপাতের মতো ঝাঁকুনি সৃষ্টি করে। দুদক অভিযোগ কেন্দ্রে শিপিং সেক্টর সংশ্লিষ্ট এক ভুক্তভোগী সুনির্র্র্র্দিষ্ট তথ্যসংবলিত অভিযোগ জানালে দুদক তাৎক্ষণিক অভিযান পরিচালনা করে।

সাধারণত, এ ধরনের অভিযোগ কেউ দিতে চায় না। গ্রেফতারকৃত কর্মকর্তার হাত থেকে এমন কিছু ডকুমেন্ট পাওয়া যায়, যাতে কোন্ শিপিং এজেন্ট থেকে কত অর্থ নেয়া হয়েছে, তার প্রামাণ্য তথ্য ছিল। আসামিকে এ যাবৎ দু’দফা রিমান্ডে এনেছে দুদক।

এ প্রক্রিয়ায় দুদককে যথেষ্ট দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে মামলার তদন্ত সম্পন্ন করতে হয়। এখানে সময়সীমা নির্র্র্র্র্দিষ্ট করা আছে। তারপর আদালতে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। কিন্তু দুর্নীতির ঘটনা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণের জন্য দুদকের নির্ভরযোগ্য এবং শক্তিশালী সাক্ষী প্রয়োজন।

দণ্ডবিধির ১৬৫ (খ) ধারায় ঘুষ প্রদানকারী হিসেবে সাক্ষীরা আদালতে নির্ভয়ে বলতে পারেন, ‘তিনি প্রকৃতপক্ষেই চাপে পড়ে, প্রভাবিত হয়ে বা প্ররোচিত হয়ে ঘুষ দিতে বাধ্য হয়েছেন’। এ আইনে সাক্ষীকে সুরক্ষা দেয়া হয়েছে। দৃষ্টান্তস্বরূপ, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের এক কর্মকর্তা দুদকের অভিযানে ঘুষ গ্রহণের ঘটনায় গ্রেফতার হওয়ার পরে তার বিরুদ্ধে সাক্ষীরা আদালতে সাক্ষ্য প্রদান করেন।

আদালত তাকে ৩ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ ২ লাখ টাকা জরিমানা করে। এ ধরনের সাক্ষী দুর্নীতিবাজদের শাস্তি নিশ্চিত করে, যা লাগামহীন দুর্নীতির বিরুদ্ধে আঘাত। অন্যদিকে নোয়াখালী জেলার একটি দুর্নীতি মামলায় সাক্ষী নীরব থাকায় অর্থাৎ সাক্ষ্য দুর্বল হওয়ায় এক সরকারি কর্মকর্তাকে আদালত বেকসুর খালাস প্রদান করে।

এভাবে সাক্ষীর নীরবতা দুর্নীতির মামলা থেকে দুর্নীতিবাজদের মুক্ত হওয়ার পথ প্রশস্ত করে। দুর্নীতির মামলায় পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণসহকারে অভিযোগ প্রমাণ করা দুদকের জন্য নিরবচ্ছিন্ন এক মরণপণ লড়াই। কিন্তু চট্টগ্রাম কাস্টমসের ঘটনায় যারা দুর্নীতির অভিযোগ দিয়ে দুদকের কান ঝালাপালা করেছিলেন, তারা দুদকের অভিযানের পর কেন নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন? অভিযোগকারীরা কিন্তু প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের পদস্থ কর্মকর্তা, যারা পোর্ট শিপিং ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

তারা উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘আমরা দুর্নীতির অত্যাচারে অতিষ্ঠ, দুর্নীতিবাজদের কাছে নির্যাতিত’। কিন্তু অভিযুক্ত যখন দুদকের জালে ধরা পড়ল, তখন তারা নিজেদের গুটিয়ে ফেলল। অথচ তাদের হাতেই প্রমাণ আছে, ‘কবে, কখন, কোথায় কত টাকা ঘুষ দিয়েছে’।

তাদের জলজ্যান্ত সাক্ষ্য দুর্র্নীতির মামলা প্রমাণে আদালতের জন্য অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য, বিচারের জন্য অতি তাৎপর্যপূর্ণ। কিন্তু তাদের দ্বিচারী ভূমিকা প্রমাণ করে, অন্যায় ও দুর্নীতি প্রতিরোধে তাদের দুর্নীতিবিরোধী চেতনা খুব দুর্বল এবং ভঙ্গুর।

সুতরাং দুর্নীতি দমনের প্রশ্নে আবেগতাড়িত হয়ে কিছু অর্জন করা যায় না। দুর্নীতির দায়ে দুদক কাউকে গ্রেফতার করলে ওই মামলা প্রমাণের জন্য উপযুক্ত সাক্ষী আদালতে উপস্থাপন করতে হয়, যা অপরাধ প্রমাণের জন্য অনিবার্য, অপরিহার্য। কারণ সাক্ষীর অভাবে বিচার বিলম্বিত হচ্ছে।

বিচার বিলম্বিত হওয়া মানে পরিস্থিতি অপরাধীর অনুকূলে যাওয়া। উপযুক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ না পেলে আদালতে অভিযুক্তের অনুকূলে ফাঁকফোকর তৈরি হয়ে যায়, যুক্তির জাল তৈরি করে অভিযুক্তের আইনজীবীরা।

রাস্তাঘাটে, অফিস-আদালতে, মিডিয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে উচ্চকণ্ঠ মানেই সততা বা দেশপ্রেম নয়। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে মহান স্রষ্টা অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেকের শক্তি দিয়েছেন, সেটি আমরা চর্চা করি না। বিবেক অবরুদ্ধ করে রাখি ভয়ে কিংবা বিক্রি করে দেই বৈষয়িক লোভে।

এর বিপরীতে গিয়ে বিবেকের শক্তি দিয়ে দুর্নীতিবাজদের চিহ্নিত করে ধরিয়ে দিতে হবে। ঘুষ চাইলে প্রতিবাদ জানাতে হবে, দুদকে তাৎক্ষণিক অভিযোগ দিতে হবে, দুদকের কাছে প্রমাণ দিতে হবে। অন্যায়-দুর্নীতি প্রতিরোধে সাহসী হতে হবে, বাস্তববাদী হতে হবে। দুর্নীতি দমন একটা বহুমাত্রিক লড়াই।

এ লড়াই অফিসে, মাঠে, আদালতে এবং সর্বত্র। শুধু দুদকের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নিয়ে এককভাবে কিংবা বিচ্ছিন্ন কোনো প্রচেষ্টায় দুর্নীতি নির্মূল কখনও সম্ভব নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড় বড় বুলি উচ্চারণ করায় কোনো গৌরব নেই। দুদক একা লড়াই করে দুর্নীতি দমন করবে, এ প্রত্যাশা করাও দুঃস্বপ্ন।

চট্টগ্রামে কাস্টমস অফিসার গ্রেফতার হওয়ার পর নির্ভয়ে এবং নির্মোহে এগিয়ে আসা উচিত, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরোয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্ট এবং বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীবৃন্দের, যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাহস ভরে এগিয়ে আসা নাগরিক হিসেবে সবারই সম্মিলিত দায়িত্ব। এ লড়াইয়ে ঔদাসীন্য বা নীরবতার সংস্কৃতি দুর্নীতিকে প্রশ্রয় প্রদানের শামিল।

মোহাম্মাদ মুনীর চৌধুরী : মহাপরিচালক, দুর্নীতি দমন কমিশন
(সংগৃহীত)

LEAVE A REPLY