সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে গুম

0
21

এ কে এম শহীদুল হক:

৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ১৯৯২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ৪৭/১৩৩ নম্বর রেজল্যুশনের মাধ্যমে

Declaration on the Protection of All Persons from Enforced Disappearance গ্রহণ করে। পরবর্তী সময়ে ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর উল্লিখিত Declaration-এর ভিত্তিতে The International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance গৃহীত হয়। ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ৬৫/২০৯ নম্বর রেজল্যুশনের মাধ্যমে বিশ্বে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলে গুমের ঘটনা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ায় এবং গুম ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে অসদাচরণ, তাদের হয়রানি ও ভয়ভীতির মধ্যে রাখার অভিযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করে। একই সঙ্গে The International Convention for the Protection of All Persons from Enforced Disappearance-কে স্বাগত জানায়। আরো সিদ্ধান্ত নেয় যে ২০১১ সাল থেকে ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম দিবস বা International Day of the Victims of Enforced Disappearance পালন করা হবে। তখন থেকেই গুম দিবস পালিত হচ্ছে।

১৯৭৩ সালে চিলিতে সামরিক অভ্যুত্থানের পর সেখানকার সামরিক সরকার বিরোধী ও বিভিন্ন মতাদর্শী লোকদের গুম করে রাখত এবং ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজনকে আটকের কোনো তথ্য দিত না। ১৯৭৪ সাল থেকে Inter American Commission on Human Rights and the United Nations Commission on Human Rights চিলি থেকে সামরিক স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে অবৈধ আটক, গুম ও নির্যাতনের অভিযোগ পেতে থাকে। তদন্তের জন্য একটি ওয়ার্কিং গ্রুপ তৈরি করা হয়। ওয়ার্কিং গ্রুপ ১৯৭৬ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি United Nations Commission on Human Rights বরাবর রিপোর্ট পেশ করে। ১৯৮০ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি ২৩ নম্বর রেজল্যুশনের মাধ্যমে Commission on Human Rights আরেকটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠন করে। এরপর প্রায় ২৫ বছর পেরিয়ে যায়। বহুবার সভা, আলোচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ হয়। সমস্যাটি কোনো নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক দেশের বিরুদ্ধেই নাগরিকদের গুম করার অভিযোগ জাতিসংঘের কাছে আসতে থাকে। সর্বশেষ ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর গুমের ওপর আন্তর্জাতিক Convention গৃহীত হয়।

Convention-এর Article 2 মোতাবেক গুমের সংজ্ঞা নিম্নরূপ দেওয়া যায়—

সরকারের কোনো সংস্থা বা প্রতিনিধি বা বেসরকারি গ্রুপের সদস্য বা কোনো ব্যক্তি বা কোনো অপরাধচক্র কোনো নাগরিককে যদি তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা সম্মতি ব্যতিরেকে অপহরণ করে অজ্ঞাত স্থানে আটক রাখে এবং সেই আটকের বিষয় স্বীকার না করে তার আত্মীয়-স্বজনকে কোনো তথ্য না দেয় এবং ভিকটিমকে আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে, তবে এমন ঘটনাকেই গুম বা

Enforced or Involuntary Disappearance হিসেবে গণ্য করা হয়। Convention অনুযায়ী সাধারণত সরকারি সংস্থার গুপ্ত আটককেই গুম হিসেবে ধরা হয়।

অভিযোগ আছে, গুম করার পর ভিকটিমকে সাধারণত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়। তাকে তার সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে আইনের আশ্রয় নিতে দেওয়া হয় না। আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের কাছে তার আটকের বিষয় স্বীকার করা হয় না। ভিকটিম নিজেও বুঝতে পারে, তাকে কেউ সাহায্য করার সুযোগ পাচ্ছে না। ভিকটিমের আত্মীয়-স্বজন চরম উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও মানসিক পীড়ার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করে। অপহৃত ব্যক্তিকে অপরাধীরা হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখলে আত্মীয়-স্বজন মরদেহ নিয়ে সৎকার করতে পারে। কিন্তু গুমের ক্ষেত্রে তাদের প্রতিক্ষণ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের মধ্যে কাটাতে হয়। এ কষ্ট ভুক্তভোগী ছাড়া কেউ উপলব্ধি করতে পারে না। গুম শুধু জাতিসংঘ কর্তৃক গৃহীত সর্বজনীন মানবাধিকারের (Universal Declaration of Human Rights) লঙ্ঘনই নয়, তা মানবতার চরম লঙ্ঘন এবং গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ।

গুমের মতো অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘন এখন পৃথিবীর কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন একটি বৈশ্বিক সমস্যা। যুদ্ধরত দেশগুলোতে গুমের ঘটনা বেশি ঘটে। সাধারণত মিলিটারি স্বৈরশাসকরা গুম সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটায়। এখন যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়াও অভ্যন্তরীণ সংঘাত, বিচ্ছিন্নতাবাদী ও জঙ্গি-সন্ত্রাসী দমন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি, বিবদমান গ্রুপের প্রতিপক্ষ সদস্যদের নির্যাতন করে আধিপত্য বিস্তার এবং অপরাধীচক্রের অপরাধ সংঘটন করার লক্ষ্যে গুমের ঘটনা ঘটে থাকে। গণতান্ত্রিক দেশেও গুমের ঘটনা ঘটে।

২০০৯ সালে জাতিসংঘ ৮২টি দেশের অপহৃত ব্যক্তিদের ওপর একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকে ১৬ হাজার ৫৪৪ জন, শ্রীলঙ্কায় ১২ হাজার ২২৬, আর্জেন্টিনায় তিন হাজার ৪৪৯, চিলিতে ৯০৭, চীনে ১১৬, ফিলিপাইনে ৭৮০, ইন্দোনেশিয়ায় ১৬৫, ইরানে ৫৩২, লেবাননে ৩২০, মেক্সিকোয় ৩৯২, রাশিয়ায় ৪৭৮, সুদানে ১৫৫ ও পূর্ব তিমুরে ৫০৪ জন লোক গুমের শিকার হয়।

Amnesty InternationalI তাদের বার্ষিক রিপোর্টে এসব গুমের তথ্য প্রকাশ করে থাকে।

বসনিয়া যুদ্ধে প্রায় এক হাজার ৮০০ এবং কলম্বোয় অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ২০০৯ সালে প্রায় ২৮ হাজার লোক গুম হয়েছিল। সাদ্দাম শাসনামলে অপারেশন আনফালে

(Anfal) ইরাকে কয়েক হাজার নাগরিক গুম হয়। ১৯৯৯ সালে ইরানে ছাত্র দাঙ্গায় ৭০ জন ছাত্র গুম হয়। আলজেরিয়ার গৃহযুদ্ধে সরকারি হিসাব মতে ছয় হাজার লোক গুম হয়। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ১৭ হাজার।

Defence of Human Rights Pakistan নামক মানবাধিকার সংগঠনের চেয়ারপারসন আমিনা মাসুদ জানজুয়ার দাবি করেন, ২০১১ সালের পর পাকিস্তানে প্রায় পাঁচ হাজার লোক গুম হয়। বেলুচিস্তানের গুম এ সংখ্যার মধ্যে নেই। ২০০০ সালের পর বেলুচিস্তানে ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার লোক গুমের শিকার হয়।

রাশিয়ার মানবাধিকারকর্মীরা দাবি করেন, রাশিয়ার চেচনিয়ায় ১৯৯৯ সালের পর প্রায় পাঁচ হাজার লোক গুম হয়েছে।

১৯৯৯ সালে জাতিসংঘের হিসাব মতে, শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধে ১৯৮০ সাল থেকে ১২ হাজার লোক গুম হয়, ৫০ হাজার লোক নিহত হয়।

Amnesty International-এর মতে, মার্চ ২০১১ থেকে আগস্ট ২০১৫ পর্যন্ত ৬৫ হাজারের বেশি লোক সিরিয়ায় গুম হয়। একই সংস্থার দাবি, থাইল্যান্ডে ১৯৯৮ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত ৫৯ জন মানবাধিকারকর্মী গুম হয়।

ভারতের পাঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর ও মণিপুর তথা উত্তর-পূর্ব রাজ্যগুলোতে ব্যাপক গুমের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে International Commission of Jurists (ICJ) এক প্রতিবেদনে জানায়, ১৯৮৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত কাশ্মীরে আট হাজার লোক গুম হয়।

আমেরিকাও গুমের অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। Amnesty International জানায়, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (War on Terror) কর্মসূচিতে আমেরিকা গুমের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্র ২০০২ সালের ১১ জানুয়ারি থেকে কিউবার গুয়ানতানামো উপকূলে গোপন বন্দিশালা চালু করে। ওই বন্দিশালায় শত শত লোককে বন্দি করে তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানোর অভিযোগ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের জেলা জজ জেড রাকফের (Jed Rakoff) কোর্ট আদেশের জবাব দিতে গিয়ে মার্কিন সরকার ২০ এপ্রিল ২০০৬ সালে সরকারিভাবে স্বীকার করে গুয়ানতানামো বন্দিশালায় ৫৫৮ জন বন্দি আটক আছে। ২০০৬ সালের ২০ মে আরেক প্রতিবেদনে জানানো হয়, একই গোপন বন্দিশালায় ৭৫৯ জনকে আটক করে রাখা হয়েছে। এসব বন্দি মৌলিক মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত। তাদের আইনের আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় না। আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাতের সুযোগও নেই। আত্মীয়-স্বজনের কেউ তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত নয়।

বাংলাদেশেও গুমের অভিযোগ আছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, কিছু মানবাধিকারকর্মী ও এনজিও সরকারের বিরুদ্ধে গুম ও অপহরণের অভিযোগ অহরহ করে থাকে। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন পাকিস্তান সেনাদের দ্বারা হাজার হাজার লোক গুম ও অপহরণ হয়েছে। ৩০ লাখ লোক শহীদ হয়েছে।

অপহরণ বাংলাদেশ দণ্ডবিধিতে একটি ফৌজদারি অপরাধ। প্রাচীন আমল থেকেই এ অপরাধ সংঘটিত হয়ে আসছে। আত্মীয়-স্বজনের অভিযোগ ও অভিযোগের ধরন অনুযায়ী কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিয়মিত মামলা হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে জিডি এন্ট্রি করে তদন্ত করা হয়। তদন্তকালে কিছু অপহৃত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। কেউ কেউ আপনা-আপনি ফেরত আসে। শত চেষ্টা করেও কিছু ভিকটিমের সন্ধান পাওয়া যায় না। যেমন—বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী অপহরণ। তাঁকে উদ্ধারের জন্য পুলিশ অনেক চেষ্টা করেছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের জন্য নির্দেশ দেন। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার পর তিনি আবেগপ্রবণও হয়েছিলেন। কিন্তু আন্তরিক চেষ্টা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করতে সক্ষম হয়নি। এ রকম অনেক ঘটনাই রহস্যাবৃত ও অলক্ষিত থেকে যায়। এটি প্রায় সব দেশেই দেখা যায়। যুক্তরাজ্যে প্রতিবছর দুই লক্ষাধিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় দুই লাখ লোক নিখোঁজ হয়। কেউ কেউ উদ্ধার হয়, কেউ ফিরে আসে, কারো কারো মৃতদেহ পাওয়া যায় এবং কারো কোনো হদিস কখনো পাওয়া যায় না।

বিভিন্ন সূত্রের পরিসংখ্যান নিয়ে হয়তো প্রশ্ন আছে। পরিসংখ্যান পুরোপুরি যথার্থ না হলেও দেশে দেশে যে কমবেশি গুম হচ্ছে তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। প্রচলিত আইনে বিপজ্জনক কোনো ব্যক্তিকে বেশিদিন আটকে রাখা যাবে না বা তার শাস্তি নিশ্চিত হবে না ভেবেই গুমের আশ্রয় নেওয়া হয় বলে কেউ কেউ বলে থাকে। কিন্তু এটি যে মানবতা ও মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ও গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ, তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে উপলব্ধি করতে হবে। না হলে একবিংশ শতাব্দীতেও নাগরিকদের মানবাধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার ও মানব সভ্যতা চরম হুমকির মধ্যে পতিত হবে। প্রাচীন আমলের হিংস্রতা, বর্বরতা, নিরাপত্তাহীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার পুনঃঅভ্যুদয় হবে, যা মানবজাতির জন্য কলঙ্কের অধ্যায় সৃষ্টি করবে।

এটা সত্য যে গুম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। গণতান্ত্রিক দেশেও গুম হয়ে থাকে। এ জন্যই জাতিসংঘ ২০১১ সাল থেকে আন্তর্জাতিক গুম দিবস

(International Day of Enforced or Involuntary Disappearance) পালন করছে। মানুষকে সচেতন করা, এ অপরাধ থেকে রাষ্ট্র, সরকার, ব্যক্তি ও গোষ্ঠী মহলকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো, গুম হওয়া ব্যক্তির আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা, তার আত্মীয়-স্বজনকে সঠিক তথ্য দিয়ে সহায়তা করা এবং গুমের বিরুদ্ধে সব দেশের সরকারকে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করতেই এ দিবস পালনের প্রধান লক্ষ্য।

গুম শুধু ভিকটিম বা তার আত্মীয়-স্বজনকেই চরম সংকট, মনঃকষ্ট, উদ্বেগ ও ভীতির মধ্যে ফেলে না, এটি সমাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সমাজের লোক ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। তারা ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে সাহস পায় না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতেও ভয় পায়। সমাজে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয় না। মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার থেকে নাগরিকরা বঞ্চিত হয়। কাজেই গুমের অপসংস্কৃতি থেকে প্রতিটি দেশ ও সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে এবং সচেতন জনগণকে এ জঘন্য অপরাধের জন্য প্রতিবাদী হতে হবে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে দেশের প্রচলিত আইনেই ব্যবস্থা নিতে হবে।

লেখক : সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ