সর্বস্তরে রমজানের পবিত্রতা রক্ষিত হোক

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন :

পবিত্র মাহে রমজান সমাগত। আর ক’দিন বাদেই শুরু হবে রমজান মাস। মুমিন মুসলমানগণ এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও সান্নিধ্য তথা পবিত্রতা লাভের জন্য রোজা রাখেন।

ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম একটি হল রোজা। রোজা ফারসি শব্দ, যার আরবি অর্থ হল সাওম বা সিয়াম। আর সিয়াম শব্দের অর্থ বিরত থাকা। ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা পার্থিব জীবনের বিভিন্ন জটিলতা, কুটিলতা, আবিলতা ইত্যাদি থেকে নিজেদের মুক্ত রাখার জন্য ক্ষুধা-পিপাসার কষ্ট ভোগ করে রমজান মাসের ৩০ দিন সিয়াম সাধনা করেন, অর্থাৎ সেহরি থেকে ইফতারি পর্যন্ত অভুক্ত থাকেন।

ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কাতর হলেও তারা পানাহার থেকে বিরত থেকে মহান আল্লাহ্র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন। কারণ মহান আল্লাহ্ দ্বিতীয় হিজরির শাবান মাসের ১০ তারিখে পবিত্র কোরআনে আয়াত নাজিলের মাধ্যমে রোজাকে ফরজ করেছেন।

অবশ্য দ্বিতীয় হিজরির পূর্বেও কিতাবিদের ওপর রোজা রাখার বিধান ছিল। তাছাড়া আমাদের আদি পিতা হজরত আদম এবং আদি মাতা বিবি হাওয়া কাফফারাস্বরূপ ৪০ বছর রোজা রেখেছিলেন। হজরত নূহ (আ.) ১ থেকে ১০ শাওয়াল- এই দশ দিন বাদে সারা বছর রোজা রাখতেন। ইদ্রিস (আ.) বছরজুড়ে প্রতিদিন রোজা রাখতেন। হজরত দাউদ (আ.) একদিন বাদে একদিন রোজা রাখতেন। আবার ইসলামের প্রাথমিক যুগে প্রতি তিন মাসে তিন রোজার বিধান ছিল। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর দেখলেন যে, মদিনার ইহুদিরা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখেন।

তিনি ইহুদিদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারেন, ‘ওই দিন ফেরাউন সদলবলে নীল দরিয়ায় ডুবে মরেছিলেন এবং বনি ইসরাইল সম্প্রদায় শত্রুর কবলমুক্ত হয়েছিলেন বিধায় তারা মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখেন।’ তখন তিনি ইহুদিদের বলেন, ‘আমি তোমাদের অপেক্ষা মূসার (আ.) বেশি হকদার।’ তারপর রাসূলুল্লাহ (সা.) মহররম মাসের ১০ তারিখে রোজা রাখার নির্দেশ দেন। এ ছাড়া মূসা (আ.) তাওরাত নাজিলের আগে ৩০ দিন রোজা রেখেছিলেন এবং তার ওপর ওহি নাজিল হলে আরও ১০ দিনের পর আরও ১০ দিন যোগ করে মোট ৫০ দিন পর্যন্ত রোজা বর্ধিত করেছিলেন।

আবার ইহুদিদের অনুসরণ করে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও মহররমের ১০ তারিখে রোজা রাখা শুরু করে এবং তারা এর আগেপিছে আরও দু’দিন যোগ করে ৩ দিন রোজা রাখা শুরু করেন। এভাবে হজরত আদম (আ.) থেকে রোজা রাখার প্রচলন শুরু হয়ে রাসূলুল্লাহর (সা.) ওপর ওহি নাজিলের মাধ্যমে রোজা ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভে পরিণত হয়েছে এবং সূরা বাকারার ১৮৩ আয়াতে বলা হয়েছে, ‘হে ঈমানদারগণ তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন পূর্ববর্তীদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল।’

জনসংখ্যার দিক থেকে আমাদের দেশটি বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের দেশ বিধায় রমজান মাসের গুরুত্বও এদেশে সমধিক। পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় প্রচুর মসজিদ, মাদ্রাসা, হেফ্জখানা ইত্যাদি স্থানে রমজান মাসের ইসলামী চেতনায় ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ মুখর থাকেন। রমজান মাসে মক্কা-মদিনাকে সারা রাত যেমনটি জাগ্রত অবস্থায় দেখে এসেছি, আমাদের দেশও এ মাসে অনেকটা তেমনভাবেই জাগ্রত থাকে। প্রায় সারা রাত ধরেই মসজিদে মসজিদে মুসল্লিদের ইবাদত-বন্দেগি করতে দেখা যায়।

ইফতারের পর তারাবির নামাজ পড়তে তারা মসজিদে ভিড় জমান। তারাবির নামাজ, এশার নামাজ ছাড়াও অনেকে রাতভর সুন্নত-নফল ইবাদত-বন্দেগি করেন এবং শেষ রাতে সেহরি খেয়ে ঘুমাতে যান। এ দৃষ্টিকোণ থেকে ধর্ম পালনে আমাদের দেশের মুসলমানগণ পিছিয়ে নেই।

কিন্তু প্রশ্ন দেখা দিয়েছে অন্য একশ্রেণীর ভণ্ড বা বক ধার্মিকদের নিয়ে! ধর্মীয় অনুশাসন পালনকারী একটি বৃহৎ জাতি ও গোষ্ঠী হিসেবে আমাদের পরিচিতি থাকলেও অন্য একশ্রেণীর মুসলমানের মধ্যেই আবার নীতি-নৈতিকতার চরম স্খলনও লক্ষ করা যায়! এই শ্রেণীর মানুষকে প্রতিনিয়ত মিথ্যাচার এবং অন্যায়-অনাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে দেখা যায়।

আর আশ্চর্যজনক ঘটনা হল, একইসঙ্গে তারা নামাজ, রোজা, ইবাদত-বন্দেগিও করে থাকেন। তাদের কেউ কেউ আবার দশ-বিশবার পর্যন্ত হজ-ওমরাহ পালন করে থাকেন। অথচ তারা অনেকেই কথায় কথায় মিথ্যা বলেন, অপরের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ পোষণ করেন এবং জাল-জোচ্চুরির মাধ্যমে সম্পদ আহরণ করেন। নামাজ, রোজা, ইবাদত-বন্দেগির পাশাপাশি এসব লোকজন বিভিন্ন ধরনের পাপাচারে লিপ্ত থেকে কী সুখ বা শান্তি পান, তা বলা সম্ভব না হলেও আমাদের দেশে কিন্তু এই শ্রেণীর মানুষের অভাব নেই। আবার রাজনীতিকদের মধ্যে তো এই শ্রেণীর ভণ্ড ভূরি ভূরি। আমি অন্তত এমন একজন পরিপূর্ণ ইসলামী লেবাসধারীকে জানি বা চিনি, যিনি প্রতিদিন অসংখ্য মিথ্যা কথা বলেন এবং যার সম্বন্ধে অনেকেই বলেন, ওই ব্যক্তি দশ-বারো কিসিমের হাসি হাসতে পারেন।

অর্থাৎ মানুষকে ধোঁকা দিতে সম্পূর্ণভাবে তিনি ইসলামী লেবাসে সজ্জিত হয়ে নামাজ, রোজা, হজ-ওমরাহ পালনের পাশাপাশি বিভিন্ন অপকর্মে নিজেকে কলুষিত করার মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের লেবাস ও আনুষ্ঠানিকতাকেও বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে চলেছেন। অথচ তিনি একজন সফল রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধি হিসেবে বেশ কয়েকবার নির্বাচিত হয়েছেন! এই শ্রেণীর মানুষের রাজনৈতিক ও পার্থিব সাফল্য দেখে দেশ ও সমাজ কী মনে করে জানি না বা ওইসব ঘটনা থেকে দেশের মানুষ কী শিক্ষা গ্রহণ করেন তাও বলতে পারব না, তবে এই শ্রেণীর মানুষ যে ইসলামকে কলুষিত করছেন, ইসলামী লেবাস, ইসলামী আনুষ্ঠানিকতা থেকে ফায়দা লুটে চলেছেন, সে কথা বোধহয় সবাই বুঝতে পারেন।

যদিও আরও একশ্রেণীর রাজনীতিক আছেন, যারা ধর্ম নিয়ে সরাসরি রাজনীতি করেন এবং জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় ভীতি সৃষ্টি করে ফায়দা লোটেন; কিন্তু তবুও তারা বোধহয় পূর্বোক্ত শ্রেণীর মতো এক্ষেত্রে এতটা খারাপ নয়। অর্থাৎ কথায় কথায় মিথ্যা বলা, অনাচার, পাপাচারে লিপ্ত হওয়া, অন্যায়-অবৈধ পথে অর্থ উপার্জনে লিপ্ত হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে পূর্বোক্ত শ্রেণীর মতো তারা এতটা খারাপ নয়। এ অবস্থায় ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনকারী ভণ্ড, প্রতারক, ঠকবাজ শ্রেণীর রাজনৈতিক ব্যক্তিরা যে রাজনীতির পাশাপাশি ধর্মকেও কলুষিত করে চলেছেন সে কথাও বোধহয় অস্বীকার করার উপায় নেই।

সুধী পাঠক, শুরুতেই বলেছি, পবিত্র রমজান মাস সমাগত। আর রমজানের পবিত্রতার কথা বলতে গিয়েই আমাকে কিছু উদাহরণ টানতে হল। কারণ একশ্রেণীর ধর্মীয় লেবাসধারী, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনকারী মানুষের অপকর্মের সঙ্গেও রমজান মাসের পবিত্রতার বিষয়টি সম্পর্কিত। কারণ রমজান মাসকেও তারা নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন।

ওই শ্রেণীর মানুষের মধ্যে যারা ব্যবসায়ী আছেন, তারা খাদ্যে ভেজাল মেশানো, খাদ্যদ্রব্যের কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ইত্যাদি অপকর্মে জড়িত, ঠিকাদারসহ অন্য একশ্রেণীর ব্যবসায়ী রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণ কাজে ফাঁকি দিয়ে বিলের অর্থ বাগিয়ে নেয়ার মতো অপকর্মে ব্যস্ত এবং একশ্রেণীর সরকারি চাকরিজীবী এই পবিত্র মাসে অফিস-আদালতে বসে ঘুষের অর্থ পকেটে ঢোকানোর মতো অপকর্মে ব্যস্ত থাকায় তাদের কৃতকর্ম দ্বারা রমজানের পবিত্রতা বিনষ্ট হয়। আর তাদের এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দেশের সাধারণ ও নিরীহ জনগণকে যেসব ভোগান্তিতে বা দুঃখকষ্টে পড়তে হয়, সেসব কারণেও রমজানের ধর্মীয় উদ্দেশ্য ব্যাহত হয়।

এ অবস্থায় তাই দেশের সরকারের প্রতি আবেদন ও আহ্বান জানাব- সরকারি দলে একটি শুদ্ধি অভিযান চালিয়ে সেখান থেকে ভণ্ড-প্রতারক রাজনীতিকদের বিতাড়িত করে, সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে ঘুষখোর, স্বার্থান্বেষী, ধান্দাবাজ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে, যেসব ব্যবসায়ী, ঠিকাদার ইত্যাদি অসৎ পথে অর্থ উপার্জন করে দেশ ও জনগণের ক্ষতি করে চলেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করে রমজানের পবিত্রতা রক্ষা করা হোক।

সেই সঙ্গে সরকারের প্রতি আরও উদাত্ত আহ্বান জানাব- দেশে আইন-আদালত, কোর্ট-কাচারিসহ প্রশাসনের সব স্তরে সুশাসন নিশ্চিত করে, দেশের কোনো নিরীহ মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হন বা একজন নির্দোষ মানুষও যাতে কারাগারে না থাকেন, পবিত্র এ রমজান মাসে সে বিষয়টিও নিশ্চিত করা হোক। কারণ এসব বিষয়ও রমজান মাসের পবিত্রতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট।

একজন নিরীহ-নির্দোষ মানুষ রমজান মাসে বিনা কারণে, বিনাদোষে কারাগারে থাকবেন এবং তার পরিবার-পরিজন রোজার মাসে রোজা রেখে আইন-আদালতের পেছনে দৌড়াবেন, একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের জন্য এ বিষয়টিও বোধহয় সুখকর হওয়া উচিত নয়। সুতরাং আইন-আদালত এবং প্রশাসনে যারা কাজ করছেন, রমজানের পবিত্রতা রক্ষার্থে তাদেরও কিছু করণীয় আছে বলেই মনে হয়।

পরিশেষে আবারও বলতে চাই, আমরা আমাদের জীবনের সর্বস্তরে ইসলামের আদর্শ ও অনুশাসন সঠিক এবং সম্যকভাবে পালন করতে পারলে কেবল তখনই দেশ ও সমাজে রমজানের পবিত্রতা রক্ষিত হবে।

মুহাম্মদ ইসমাইল হোসেন : কবি, প্রাবন্ধিক, কলামিস্ট

LEAVE A REPLY