সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের অঙ্গীকার

0
3
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের অঙ্গীকার

এ কে আব্দুল মোমেন:

সাম্প্রদায়িক সম্প্রতি এ দেশের বহুকালের ঐতিহ্য। আবহমানকাল ধরে এই ভূখণ্ডে নানা জাতি-ধর্মের মানুষ, বিশেষ করে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোক একত্রে আন্তরিকতা আর সৌহার্দ্যের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে মিলেমিশে বসবাস করে আসছে। স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সংবিধানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু ধর্মনিরপেক্ষতার মূলনীতি যুক্ত করে মূলত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ বিনির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে গেছেন। তারই সুযোগ্য কন্যার নেতৃত্বে বাংলাদেশ এখন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বজুড়ে সমাদৃত বিভিন্ন জাতি, গোষ্ঠী, ধর্ম, বর্ণ সবার অনন্য এ সম্প্রীতি। সব ধর্ম-বর্ণের মানুষ নিয়ে একসঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করা এ অঞ্চলের চিরায়ত রীতি। এ দেশের মানুষ নিজ নিজ ধর্মে নিষ্ঠাবান হওয়ায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে তারা অনুকরণীয় আদর্শ বলে বিশ্বাস করে। বাংলাদেশের মানুষ সচেতনভাবে ধর্মীয় বোধসম্পন্ন বলে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের প্রতি সহনশীলতার আদর্শ এ দেশে মূর্তমান। বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এই বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে বদ্ধপরিকর।

‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার’- এই মূলমন্ত্রে প্রাধান্য দিয়ে বর্তমান সরকার প্রত্যেক ধর্মাবলম্বীর মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্প্রীতি বজায় রাখতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে মসজিদ, মন্দির, প্যাগোডা ও গির্জাসহ ধর্মীয় স্থাপনাগুলোর উন্নয়নে নানামুখী উদ্যোগের কারণে সরকার এরই মধ্যে প্রশংসিতও হয়েছে। এ দেশে মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের লোকজন সহাবস্থানে থেকে শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্মকর্ম পালন করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশের সংবিধান জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমান অধিকার প্রদান করেছে।

এ দেশের বাঙালি হিন্দু-মুসলিমের সংস্কৃতিও অনেকাংশেই সাদৃশ্যপূর্ণ। হৃদ্যতাপূর্ণ সামাজিক বন্ধন। মুসলিম-হিন্দুর মিলিত সংস্কৃতিই বাঙালি সংস্কৃতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত আদিকাল থেকে। এখানে যেমন আজানের ধ্বনিতে মানুষের ঘুম ভাঙে, তেমনি সূর্যাস্তের সময় শঙ্খধ্বনিও বেজে ওঠে। আসর বসিয়ে হিন্দু-মুসলিম একসঙ্গে বাউল-কীর্তন, মুর্শিদি-মারফতি গান শোনে। ধর্মীয় কিছু বিধিনিষেধ ছাড়া মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই বাঙালি মুসলিম-হিন্দু সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসে।

তবে দেশবিরোধী একটি গোষ্ঠী আমাদের হাজার বছরের এ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার কূটকৌশল বাস্তবায়নে লিপ্ত হয়েছে বারবার। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ কায়েম করে সম্প্রীতির মর্মমূলে আগুন ঢেলে দেওয়াই যেন তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা এ দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ দেখতে চায় না। হীন চক্রান্তের মাধ্যমে বারবার চেষ্টা করছে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে। অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাংলাদেশ কিছু চক্রান্তকারী, কুচক্রী কূটকৌশলীর কাছে হেরে যেতে পারে না।

ব্রিটিশ আমলে ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির কারণে এবং পরবর্তীকালে পাকিস্তান আমলেও এ দেশে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়ানো হয়েছিল। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময়েও হানাহানি, হাঙ্গামা কম হয়নি। পাকিস্তানি সামরিক শাসকগোষ্ঠী ধর্মীয় সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর নানাবিধ নির্যাতন, নিপীড়ন চালিয়ে তাদের একটা বড় অংশকে দেশত্যাগে বাধ্য করে। অনেকের জীবনাবসান ঘটানো হয়। অবাঙালিরা বাড়িঘর, জমি, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান দখলের জন্য হিন্দুদের ওপর অত্যাচার চালিয়েছিল, যা কলঙ্কিত ইতিহাস। স্বাধীনতার পর অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে বঙ্গবন্ধু ধর্ম ও সম্প্রদায়ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ করেন। ধর্মনিরপেক্ষতা মূলমন্ত্র যে দেশের, সেখানে এই জাতীয় সাম্প্রদায়িক দলের অস্তিত্ব থাকতে পারে না। কিন্তু ‘৭৫-এর কলঙ্কিত অধ্যায়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সাম্প্রদায়িক শক্তিকে সামনে নিয়ে আসে অবৈধ ক্ষমতা দখলকারী সামরিক শাসকরা। ধর্ম ব্যবসায়ী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে রাজনীতিতে পুনর্বহাল করা হয়। জিয়াউর রহমান ও এরশাদের আমলে সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার উচ্ছেদ, মুক্তিযুদ্ধবিরোধীদের ক্ষমতাসীন হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রধর্মের প্রবর্তন সাম্প্রদায়িক শক্তিকেই উৎসাহিত করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় যুদ্ধাপরাধী গণহত্যাকারী সাম্প্রদায়িক শক্তিকে ক্ষমতার অংশীদার করা হয় পরবর্তীকালে। সামরিক শাসকদের তত্ত্বাবধানে দেশে দাঙ্গা-হাঙ্গামা চালানো হয় ১৯৯০ সালে। ২০০১ সালের পর বিএনপি-জামায়াত জোট হিন্দু জমি দখলের জন্য হিন্দু সস্প্রদায়ের ওপর এমন নিপীড়ন চালায় যে, তাদের অনেকেই দেশত্যাগে বাধ্য হয়। কিন্তু সেই অবস্থা আজ আর নেই। সাম্প্রদায়িক স্থিরতার ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে বর্তমান সরকারের সময়ে।

শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়েই ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ঐতিহাসিক পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষর করার মাধ্যমে দীর্ঘ ২২ বছর ধরে চলা পাহাড়ি জনপদের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের অবসান ঘটায়। এ চুক্তির ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে নেমে আসে শান্তির সুবাতাস। ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতা গ্রহণের পর চুক্তির শর্তগুলো বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখায়নি। একেবারে স্তিমিত হয়ে পড়া শান্তিচুক্তি আবার পুনরুজ্জীবন লাভ করে ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর। শান্তিচুক্তির অবাস্তবায়িত ধারাগুলো বাস্তবায়ন ও পার্বত্য এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসহ সর্বস্তরের জনগণের উন্নয়নে নানামুখী উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার যথাযথভাবে পার্বত্যবাসী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগণকে সাংবিধানিক স্বীকৃতিও প্রদান করে। এ চুক্তি পাহাড়ি-বাঙালিদের সম্প্রীতি অটুট রাখতে বিরাট একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হয়।

বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার এ দেশের জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এরই মধ্যে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ অনেকটা নির্মূল করতে সক্ষম হয়েছে। দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি সমুন্নত রাখতে সরকার সবসময়ই বদ্ধপরিকর। বর্তমান সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে এ দেশে প্রতিটি সম্প্রদায়ের ব্যক্তিরা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে নিজ নিজ ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনসহ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পুলিশ ও অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পারস্পরিক সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো গোষ্ঠী বা দল যাতে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়েছে। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, বিভ্রান্তিমূলক বা উস্কানিমূলক পোস্ট, ভিডিও প্রচারকারীকে শনাক্ত করার মাধ্যমে আইনের আওতায় আনার জন্য সাইবার ক্রাইম মনিটরিং সেল গঠনসহ প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করা হচ্ছে এবং হয়েছে।

এ দেশের মানুষ ধর্মীয়প্রবণ হলেও উগ্রপন্থি নয়। বিচ্ছিন্নভাবে যেসব অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে ইতিপূর্বে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, এক সম্প্রদায়ের লোক আক্রান্ত হলে তার পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ। হিন্দুর বিপদে এগিয়ে আসছে মুসলিম, মুসলিমের বিপদে সামনে গিয়ে দাঁড়াচ্ছে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান। এটিই এ দেশের স্বাভাবিক রীতি। পিতৃপুরুষের আমল থেকে পাশাপাশি বসবাস করতে গিয়ে একে অন্যের প্রতি অনুভব করে গভীর মমত্ববোধ। এ মমত্ববোধের কাছে কূটকৌশলীদের চক্রান্ত পরাস্ত হতে বাধ্য। চক্রান্তকারীরা সংখ্যায় অতিনগণ্য। সরকার কঠিন হস্তে তাদের দমন করে যাচ্ছে। সর্বস্তরের জনগণের ভেতর গণসচেতনতা তৈরি করে ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করতে পারলে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদ, ভিন্নধর্মীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন একেবারে সমূলে উৎপাটন করা সম্ভব। সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ, সবার ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা ও আন্তরিকতার মাধ্যমে চলমান এ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ধারা আরও বিস্তৃত হবে বহুলাংশে। বিশ্ববাসী অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য বাংলাদেশ।

মন্ত্রী, পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়