স্বাতন্ত্র্যবোধের প্রবক্তা আবুল মনসুর আহমদ

0
3

ইমরান মাহফুজ:

সৃজনপথ নির্মাণের ক্ষেত্রে দুটি ধারায় এগোনো যেতে পারে। এক. নতুন ঘরের দরজা খুলে দুই. অতীতের ভৌগোলিক সীমারেখা বুঝে ভিত্তিভ‚মিতে সিঁড়ি তৈরি করে। কিন্তু পাঠাভিজ্ঞতায় দেখা যায়, সাহিত্যে এক অর্থে নতুন সৃষ্টি অসম্ভব। ফলে চিরকালের ভ‚মিতে নতুন সৌধ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যাবুদ্ধি তথা দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে এগিয়ে যেতে হয়। এভাবে দৃঢ় হয় চিরকালের সঙ্গে সমকালের সাঁকো! আর সে পরিপ্রেক্ষিতেই সময় ও ঐতিহ্যসচেতন আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত।

আর আবুল মনসুর আহমদ জীবনে যখন যা করেছেন, তা অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে করেছেন। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও রাজনীতি- তিনটি জায়গায় যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছেন। চল্লিশের দশকে সাংবাদিকতার মধ্যমণি তথা বিভাগপূর্ব বাংলার একজন অভিভাবক হিসেবে ছিলেন। দীর্ঘ ২৫ বছরের বেশি সময় তিনি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় চাকরিসহ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। সমকালীন বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লিখেছিলেন অসংখ্য ইংরেজি নিবন্ধ। ষাটের দশকে আবুল মনসুর আহমদ সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নিলেও একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক হিসেবে দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা বিভিন্ন প্রবন্ধ-নিবন্ধের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন। এর মাঝে আবুল মনসুর আহমদের রচনার যে দুটি গুণ বুদ্ধিজীবী মহলে সমাদৃত হয়েছে তা হলো রাজনীতিসচেতনতা ও স্বাতন্ত্র্যবোধ। তৎকালে দুটি গুণ একই সঙ্গে সচরাচর চোখে পড়ে না। এর একটি কারণ, তিনি জড়িত ছিলেন তৃণমূল থেকে কেন্দ্রের প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে। আবুল মনসুর আহমদ সমকাল, সমাজ, জনগণ ও রাজনীতিসচেতন গল্পকার। সমাজের অতিনিকটে কথকের বসবাস। জীবনের কঠিন বাস্তবতায় পায়ে হেঁটে চলায় নানা অনুঘটনা ভিড় করেছে তাঁর অভিজ্ঞতার ডালিতে। আর খোলা চোখে দেখা ঘটনাপুঞ্জ ও চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটেছে তাঁর সাহিত্যকর্মে, ‘আয়না’ গ্রন্থ উল্লেখযোগ্য। ‘আয়নার ফ্রেম’ নামক ভ‚মিকায় কবি কাজী নজরুল ইসলাম লিখেন- ‘এমনি আয়নায় শুধু মানুষের বাইরের প্রতিচ্ছবিই দেখা যায়। কিন্তু আমার বন্ধু শিল্পী আবুল মনসুর যে আয়না তৈরী করেছেন, তাতে মানুষের অন্তরের রূপ ধরা পড়েছে। যে সমস্ত মানুষ হরেক রকমের মুখোশ পরে আমাদের সমাজে অবাধে বিচরণ করছে আবুল মনসুরের আয়নার ভেতরে তাদের স্বরূপ মূর্তি মন্দিরে, মসজিদে, বক্তৃতার মঞ্চে, পলিটিকসের আখড়ায়, সাহিত্য সমাজে বহুবার দেখেছি বলে মনে হচ্ছে।’

জাতিগত আদর্শ, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও ঐতিহ্যের প্রেরণা যে কোনো সৃজনকর্মকে সহজ করে। বস্তুতপক্ষে আবুল মনসুর আহমদের মানসপট চিরকাল ছিল এমন। তাঁর জীবন ও কর্ম বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভাষা ও সাহিত্য-সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, রাজনীতি তথা দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে অধিকারসচেতন করে তুলতে অসামান্য ভ‚মিকা রেখেছেন। ব্রিটিশ-ভারতে, পাকিস্তানে ও স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর সেই ভ‚মিকার কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। স্বদেশ ও সমাজের মানুষকে পিছিয়ে পড়তে কিংবা অধিকারচ্যুত হতে দেখলে তিনি উৎকণ্ঠিত হয়েছেন, খুঁজেছেন অন্তর্নিহিত কারণ এবং সেই সঙ্গে জীবনশিল্পের চোখে তুলে ধরেছেন। কখনো গল্পে, কখনো প্রবন্ধে, কথাশিল্পে ও সংবাদপত্রে অনন্য সৃষ্টি করেছেন। যার ফলে দেখা যায় বাংলাদেশের মূলধারার জাতীয়তাবাদী ধারাবিবরণীতে বা ইতিহাসের মূলধারায় আবুল মনসুর আহমদ এক অপরিহার্য ব্যক্তি। সাহিত্যের একটি ধারায় তাঁর সিদ্ধি প্রশ্নাতীত এবং সম্ভবত বাংলাদেশে অদ্যাবধি অতুলনীয়। তাঁর আত্মজীবনীমূলক রচনাদি দৈশিক-আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ-অধ্যয়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ টেক্সট হিসেবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এবং তিনি সব সময় স্বাতন্ত্র্যবোধ নিয়ে ভাবতেন।
ভাবনা ও কাজের মাঝে ঝামেলাও কম পোহাতে হয়নি। ত্রিকালদর্শী জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে যশ ও খ্যাতি যেমন ছিল, তেমন জুটেছিল সামরিক শাসনের কারাযন্ত্রণা। কর্মজীবনে মহাত্মা গান্ধী, কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, পন্ডিত জওহরলাল নেহরু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হকসহ একাধিক রাজনীতিবিদের সঙ্গে ছিল তাঁর ব্যক্তিগত পরিচয়। তাঁর স্মৃতিকথা পড়ে জানা যায়, তাঁর জন্ম বাংলা ও বাঙালির ইতিহাসের কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে। কিন্তু অত্যন্ত প্রজ্ঞা ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন সাম্প্রদায়িকতার ইতিহাস। তথ্য ও তত্ত্ব তালাশে হদিস পাই, আবুল মনসুর আহমদ রাজনীতিসচেতনতা ও সাংবাদিকতাসূত্রেই সাহিত্যচর্চায় উদ্বুদ্ধ হন। হাস্যরসাত্মক অথচ শানিত বিদ্রুপাত্মক লেখার জন্যই বাংলা সাহিত্যেও একটি অনন্যসাধারণ অবস্থান অর্জন করেন। তবে রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে অসংগতি ও অনাচারের বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের তীব্র কশাঘাত হানাই ছিল তাঁর সাহিত্যকর্মের প্রধান উপজীব্য। যে অঙ্গনেই তিনি কাজ করেছেন, সেখানেই শীর্ষে অবস্থান নিয়েছেন। ব্যঙ্গসাহিত্যে বলতে গেলে অখন্ড বাংলায় তিনি ছিলেন অদ্বিতীয়। তাঁর প্রতিটি স্যাটায়ারই কালোত্তীর্ণ। সমাজপতি, ধর্মগুরু, রাষ্ট্রপতি, রাজনীতিবিদ, পেশাজীবী যেখানেই দুর্নীতি, সেখানেই তার বিরুদ্ধে লেখনীর মাধ্যমে কশাঘাত করেছেন। তাঁর রসাঘাত কশাঘাতে পরিণত হয়ে সমাজকে পরিশোধিত করত।

আবুল মনসুর আহমদ এ যুগের এক গভীর চিন্তাবিদ হিসেবে ব্যঙ্গসাহিত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন সব অনাচারের বিরুদ্ধে হাতিয়াররূপে। পশ্চাদ্মুখী জীবনবিমুখ দৃষ্টিকোণ দেখে তিনি প্রতিবাদ করেছেন লেখায়। বহুমুখী এই প্রতিভার কারণে নানান জায়গার নানা মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। দেখেছিলেন জীবনকে খুব কাছ থেকে। অন্তঃসারশূন্য মুসলমান সমাজের পশ্চাদ্মুখী দৃষ্টিকোণ, জনসেবার নামে দেশবাসীকে বঞ্চনার প্রচেষ্টা তিনি অতিগভীর ও নিবিড়ভাবে দেখতে ও বুঝতে পেরেছিলেন বলেই ব্যঙ্গসাহিত্যকে তাঁর দেশসেবার আদর্শ বাহন হিসেবে নিয়েছেন। রচনাগুলো আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা হাসির সৃষ্টি করলেও লেখকের মর্মভেদী কান্না কখনো স্পষ্ট, কখনো প্রচ্ছন্ন থেকে পাঠকের হৃদয় স্পর্শ করেছিল। তিনি হেসেছেন, হাসিয়েছেন, কিন্তু হৃদয় নিংড়ানো কান্নাও কেঁদেছেন প্রচুর। রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার চরণের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর অনুভ‚তির কিছুটা মিল তাঁর রচনায় দেখা যায়। ‘বাইরে যবে হাসির ছটা, ভিতরে থাকে আঁখির জল’। সৃষ্টিশীলদের কলম বা তুলিতে সব সময় সময়ের করুণ চিত্র ফুটে ওঠে। শিল্পী জয়নুল আবেদিন তাঁর অমর স্কেচে এঁকেছেন দুর্ভিক্ষের চিত্র, কবি ফররুখ আহমদ তাঁর বিখ্যাত ‘লাশ’ কবিতায়, আবুল মনসুর আহমদ ব্যঙ্গ গল্পে গল্পে। তাঁর প্রায় লেখায় দুর্ভিক্ষের চিত্রের সঙ্গে দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ীদের চিত্র, মৃত মানবতা ও চেতনার চিত্র যথাযথ তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। তিনি কথা বলেছেন স্বদেশ-চেতনায় সাহসী কণ্ঠে। বাংলা সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমদের আসন স্থায়ী। আমরা তাঁকে স্মরণ করতে ভুলে গেলেও তাঁর স্থান অবিচলিত থাকবে। জন্মদিনে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা।

লেখক : কবি।