অধিক আনুগত্য নিয়ে ইতিহাসের নির্মম পাঠ

মহসীন হাবিব

ভারত বিভাজনের পর ১৯৪৮ সালে আইয়ুব খান ছিলেন পূর্ব পাকিস্তানে ১৪ ডিভিশনের জিওসি। ১৯৪৯ সালে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলি খান তাকে হিলাল-ই-জুরাত (পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ খেতাব) দিয়ে সেনা সদর দপ্তরে অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে পদায়ন করেন। ১৯৫১ সালে ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী এবং লিয়াকত আলি খান প্রধানমন্ত্রী। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শেষ ব্রিটিশ কমান্ডার-ইন-চিফ জেনারেল স্যার ডগলাস গ্রেসি ১৬ জানুয়ারি অবসরে যান। তখন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে জ্যৈষ্ঠতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে কমান্ডার ইন চিফ হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য চার জনের নাম প্রস্তাব করা হয়। তারা হলেন মেজর জেনারেল আকবর খান, মেজর জেনারেল ইফতিখার খান, মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদ এবং মেজর জেনারেল এন এ এম রেজা। সেই প্রস্তাবে আইয়ুব খানের নাম ছিল না। সবচেয়ে সিনিয়র ছিলেন মেজর জেনারেল আকবর খান এবং দ্বিতীয় ছিলেন ইশফাকুল মজিদ, যারা কমিশন পেয়েছিলেন যথাক্রমে ১৯২০ এবং ১৯২৪ সালে। তাদের ডিঙিয়ে সেনাপ্রধান হিসেবে প্রথমে নিয়োগের জন্য জেনারেল ইফতিখার খানকে বেছে নেওয়া হয়, যিনি কমিশন লাভ করেছিলেন ১৯২৯ সালে। কিন্তু ইফতিখার খান দায়িত্ব গ্রহণের আগেই একটি প্লেন দুর্ঘটনায় নিহত হন। এরপর ইস্কান্দার মির্জা জেদ ধরেন আইয়ুব খানকে কমান্ডার-ইন-চিফ করার জন্য। মির্জার আইয়ুব খানের প্রতি ছিল দুর্বলতা। তিনি ভাবতেন, আইয়ুব খুবই অনুগত একজন অফিসার! ইস্কান্দার মির্জার চাপে লিয়াকত আলি খান আইয়ুব খানকেই কমান্ডার-ইন-চিফ পদে নিয়োগ দেন। ওই বছরই ঠিক ৯ মাস পর লিয়াকত আততায়ীর গুলিতে নিহত হন। রাওয়ালপিন্ডির কোম্পানিবাগে (পরবর্তীকালে লিয়াকতবাগ নাম রাখা হয়, যেখানে বেনজির ভুট্টোকেও হত্যা করা হয়) এক লাখ লোকের সমাবেশে ভাষণ দিতে ওঠেন। ঠিক সামনের সারিতে বসা ছিলেন একজন আফগান, যার নাম সাইদ আকবর। এই সাইদ আকবরকে আফগানিস্তান থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং তাকে প্রথমে ব্রিটিশ সরকার এবং পরে পাকিস্তান সরকার রিফিউজি হিসেবে ভাতা প্রদান করত। সামনের সারিতে যে জায়গাটিতে আকবরকে বসানো হয়েছিল সেখানে সিআইডির কর্মকর্তা ছাড়া আর কারো বসার অধিকার ছিল না। সাইদ একটি বুলেট খরচ করে লিয়াকত আলিকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্যরত পাকিস্তান পুলিশ তাকে পালটা গুলি করে হত্যা করে। সুতরাং লিয়াকতের প্রকৃত ঘাতক কে, তা আর জানা গেল না।

১৯৫৬ সালে ইস্কান্দার মির্জা পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে আইয়ুব খানের প্ররোচনায় মির্জা ১৯৫৮ সালে মার্শাল ল’ জারি করেন এবং ৮ অক্টোবর আইয়ুব খানকে সশস্ত্র বাহিনীর সুপ্রিম কমান্ডার এবং চিফ মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর ঘোষণা করেন। ওই মাসেই মির্জাকে সেনাবাহিনীর একটি ইউনিট পাঠিয়ে জোরপূর্বক প্লেনে তুলে লন্ডন পাঠিয়ে দেন আইয়ুব। বাংলার ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, সেনাপতি মীর জাফরের বংশধর ইস্কান্দার মির্জা ভীষণ অর্থকষ্টে লন্ডনে বসবাস করতে থাকেন। সেখানে ছোটো একটি পাকিস্তানি খাবারের রেস্টুরেন্ট চালু করেন। কিন্তু অর্থকষ্ট যায় না। তখন তাকে আর্থিক সাহায্য করতে থাকেন লন্ডনে নিযুক্ত ইরানের রাষ্ট্রদূত আরদেশির জায়েদি, ইরানের শাহ এবং লন্ডনের ধনাঢ্য রাজনীতিক কেনেথ জেমস উইলিয়াম মেকে। মির্জা তার স্ত্রীকে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, নাহিদ, আমরা চিকিত্সা খরচ চালাতে পারব না। সুতরাং আমাকে সহসাই মরতে দিও। মৃত্যুর আগে তিনি তার অতীতের বহু সিদ্ধান্তের জন্য আক্ষেপ করতেন। যা হোক, ১৯৬৯ সালে মির্জা লন্ডনে মৃত্যুবরণ করলে ইয়াহিয়া খান তার লাশ পাকিস্তানে আনতে দেননি। তাকে ইরানে সমাহিত করা হয়। এমনকি পাকিস্তান থেকে তার আত্মীয়স্বজনকেও দাফন অনুষ্ঠানে যেতে দেওয়া হয়নি। দেশ ভাগের পর ইস্কান্দার মির্জা তার সম্পত্তি ঢাকায় স্থানান্তর করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার সে সম্পদ জব্দ করেছিল। এভাবেই মির্জা বিশেষ প্রীতির প্রতিদান পেয়েছিলেন।

১৯৭৫ সালে পাকিস্তানের মুলতানে দ্বিতীয় স্ট্রাইক কর্পসের কমান্ডার থাকতে জিয়াউল হক প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলি ভুট্টোকে আমন্ত্রণ জানান স্টেশন পরিদর্শনে। ভুট্টো সেখানে গেলে জিয়াউল হক জমকালো আপ্যায়ন করেন এবং ভুট্টোর প্রতি আনুগত্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটান তার জুতা নিজে পালিশ করে দিয়ে! ভুট্টো রাজধানীতে ফিরেই জিয়াউল হককে লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর নিয়ম অনুসারে প্রধানমন্ত্রীকে সম্বোধন করা হতো মি. প্রাইম মিনিস্টার। কিন্তু জিয়া কখনো ভুট্টোকে মি. প্রাইম মিনিস্টার বলতেন না। সম্বোধন করতেন ‘স্যার’। জেনারেল টিক্কা খান অবসরে গেলে এই ‘এত অনুগত’ মানুষটিকে ১৯৭৬ সালে ভুট্টো সাত জন সিনিয়র জেনারেলকে অতিক্রম করে চিফ অব আর্মি স্টাফ পদে নিয়োগ দেন। পাকিস্তানের রাজনৈতিক অস্থিরতায় ১৯৭৭ সালের এপ্রিল মাসে ভুট্টো করাচি, লাহোর, হায়দারাবাদের মতো শহরগুলোতে মার্শাল ল’ জারি করেন। এবার চূড়ান্ত সুযোগ আসে জিয়াউল হকের! জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহেই জিয়া একদল মিলিটারি পুলিশ পাঠিয়ে ভুট্টো এবং তার কয়েকজন মন্ত্রীকে গ্রেফতার করেন। তখনো ভুট্টোর মতো চতুর লোক বুঝতে পারেননি যে জিয়াউল হক কী জিনিস। তিনি টেলিফোন করেন জিয়াউল হককে। কিন্তু হায়, টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন! অবশেষে ১৯৭৪ সালের একটি হত্যা মামলার আসামি হিসেবে বিচারের পর ৪ এপ্রিল রাওয়ালপিন্ডির কেন্দ্রীয় কারাগারে জিয়াউল হক সেই ভুট্টোকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলান, যার পায়ের জুতা মাত্র চার বছর আগে নিজে পরিষ্কার করে দিয়েছিলেন। বিশ্বের বহু নেতা ভুট্টোর প্রাণভিক্ষা চান। কিন্তু জিয়াউল হক কারো কথায় কান দেননি। কর্নেল রফিউদ্দিন ছিলেন রাওয়ালপিন্ডি কারাগারের দায়িত্বে। তিনি একটি বই লিখেছেন ‘ভুট্টোর শেষ ৩২৩ দিন’ নামে। তিনি উল্লেখ করেছেন, জিয়া মনে মনে ভুট্টোকে এত ঘৃণা করতেন যে ভুট্টোর ফাঁসির পর কারাগারে ফটোগ্রাফার পাঠিয়ে তার উলঙ্গ ছবি তুলিয়েছিলেন। জিয়া ধারণা করতেন যে ভুট্টো একজন হিন্দু এবং তাকে খত্না করানো হয়নি। কারণ ভুট্টার মা খুরশিদ বেগম লাখি বাই ছিলেন ধর্মান্তরিত মুসলিম।

১৯৯৮ সালেও পাকিস্তানে একই রকম ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছিল। চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল কারামতের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নেওয়াজ শরিফের মতানৈক্য দেখা দিলে তিনি কারামতকে ডিসমিস করেন। এরপর নেওয়াজ পাঞ্জাবের রাজনীতিবিদ নিসার আলি এবং ছোটো ভাই শাহবাজ শরিফের পরামর্শে তিন জন সিনিয়রকে উপেক্ষা করে সৈয়দ পারভেজ মোশাররফকে চার তারকা জেনারেলে উন্নীত করে কারামাতের স্থলাভিষিক্ত করেন। পরে নেওয়াজ শরিফকে হটিয়ে পারভেজ মোশাররফ পাকিস্তানের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী হন। বহু কষ্টে নেওয়াজ শরিফকে ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করেন সৌদি আরবের বাদশা ফাহদ এবং তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন। মোশাররফ তার গ্রন্থ ইন দ্য লাইন অব ফায়ারে লিখেছেন, বাদশা ফাহদ হস্তক্ষেপ না করলে নেওয়াজকে ফাঁসিতে ঝুলতে হতো।

একটু দূরের অতীতে যাই। শুভাকাঙ্ক্ষীদের চিনতে না পারার, তাদের পরামর্শকে গুরুত্ব না দেওয়ার এবং অপাত্রে বিশ্বাস স্থাপনের এক লোমহর্ষক কাহিনি বলার লোভ সামলাতে পারছি না। মালিক জালাল উদ্দিন খলজি ছিলেন শক্তিশালী সুলতান। তার সময়ে দুর্ধর্ষ মোঙ্গল বাহিনী আক্রমণ করলে তিনি তাদের বাধ্য করেছিলেন সন্ধি করতে এবং বহু মোঙ্গল সেনা ইসলামে দীক্ষা নিয়ে ভারতে থেকে যান। এই জালাল উদ্দিন পরবর্তী জীবনে সরল ও ক্ষমাশীল হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তার ভাতিজা আলাউদ্দিন খলজিকে বর্তমান উত্তর প্রদেশের শাসনকর্তা করে পাঠান। আলাউদ্দিন সেখানে বসে দিল্লির মসনদ দখলের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হন। তিনি জানতেন দিল্লি দখল করতে হলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। তাই অর্থ জোগাড় করতে তিনি দেবগিরিতে ঝটিকা আক্রমণ করেন এবং রাজা রামচন্দ্রের বিশাল রত্নভান্ডার লুট করে নিয়ে কারায় (উত্তর প্রদেশ) ফিরে যান। এটি ১২৯৬ সালের ঘটনা। জালাল উদ্দিনের সভার কয়েকজন বিষয়টি জানতে পারেন এবং সুলতানকে সতর্ক করেন। সুলতান উলটো তাদের তিরস্কার করেন। এর মধ্যে আলাউদ্দিন একটি চিঠি পাঠিয়ে সুলতানের বিনা অনুমতিতে দেবগিরি আক্রমণের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং লুণ্ঠিত সব রত্ন সুলতানের কোষাগারে জমা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। এদিকে আলাউদ্দিনের ভাই আলমাস বেগ সুলতানকে জানান, সুলতান রাগ করেছেন জেনে আলাউদ্দিন ভেঙে পড়েছেন। এখন আলাউদ্দিন সব ছেড়ে হয় বাংলার দিকে চলে যাবেন অথবা আত্মহত্যা করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জালাল উদ্দিন এ কথা শুনে সন্তানসম আলাউদ্দিনকে বোঝাতে একটি ছোটো সেনাদল নিয়ে উত্তর প্রদেশের উদ্দেশে যান। গঙ্গার এক প্রান্ত থেকে দেখা যায় আলাউদ্দিনের বাহিনী সমরসজ্জায় প্রস্তুত হয়ে আছে। জালাল উদ্দিনের পরামর্শকরা তাকে কোনোক্রমেই গঙ্গা পার না হতে অনুরোধ করেন। কিন্তু আলমাস বেগ বলেন, যুদ্ধ সজ্জা নয়, আপনাকে অভ্যর্থনা জানাতে ওরা প্রস্তুত হয়ে আছে। জালাল উদ্দিন কয়েকজন সেনা নিয়ে গঙ্গা পার হন। আলাউদ্দিন কাছে এসে তাকে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করেন। জালাল উদ্দিন তাকে বুকে টেনে নিয়ে চোখে চুমু খান, গালে চুমু খান। বলেন, ‘ওরা কী বলে, তোমাকে আমি শিশুকাল থেকে সন্তানের আদর দিয়ে বড়ো করেছি না? আমার সন্তান কি আমার সঙ্গে বেইমানি করতে পারে!’ এরপর আবার তিনি আলাউদ্দিনের মাথায়, মুখে চুমা খেতে থাকেন। ঠিক তখনই আলাউদ্দিন একজন সেনাকে ইশারা দেন। সেনাটি দ্রুত এসে বৃদ্ধ সুলতানকে আঘাত করে। সুলতান মাটিতে পড়ে গিয়ে বলেন, এ কী করলি বাবা! এরপর দ্বিতীয় আঘাতে সুলতানের দেহ থেকে মাথা আলাদা করে ফেলে। তার মুকুট নিয়ে আলাউদ্দিনের মাথায় পরানো হয়। তখনো সুলতানের বিচ্ছিন্ন মাথা থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। মাথাটি বর্শার আগায় বিদ্ধ করে সমস্ত এলাকায় ঘুরিয়ে জানিয়ে দেওয়া হয়, এখন সুলতান হবেন আলাউদ্দিন!

মানুষ মানুষকে নিশ্চয়ই বিশ্বাস করবে। কিন্তু ইতিহাস বলে, সে বিশ্বাসে যেন অন্ধত্ব না থাকে, সে বিশ্বাস যেন অন্যায়কে প্রশ্রয়ে সহায়ক না হয়ে ওঠে। যারা কাউকে ওপরে তোলার কিংবা নিচে নামানোর ক্ষমতা রাখেন, ইতিহাসের কাছ থেকে তাদের এ শিক্ষা গ্রহণ করা সমীচীন হবে যে, অধিক আনুগত্য সর্বদা বিশ্বস্ততার প্রমাণ নয়।

লেখক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here