কক্সবাজার জেলা কারাগারে টাকায় সব মেলে!

0
192

কক্সবাজার ব্যুরো:

কক্সবাজার জেলা কারাগারে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতি। একের পর এক অভিযোগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্তের পরও অবস্থার কোন পরিবর্তন হয়নি। বরং মাত্রা বেড়েছে। কারাবন্দিদের নির্যাতন, সাক্ষাৎ, সিট, খাবার, চিকিৎসা ও জামিন দেওয়ার বিষয়ে অর্থ কারা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে অর্থ আদায় করছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, কারাগারে প্রথম বন্দিদের যেখানে রাখা হয় তাকে ‘আমদানি’ কক্ষ বলা হয়। পরে বন্দিদের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ‘বিক্রি’ করা হয়। ওয়ার্ড নিয়ন্ত্রণ করে পুরোনো বন্দি ও কারারক্ষীরা। ওয়ার্ড থেকে হাসপাতালে চিকিৎসার নামে বিক্রি হয় সিট। হাসপাতালে থাকতে প্রতি মাসে দশ-বিশ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়। এ ছাড়া অন্যান্য ওয়ার্ডে থাকতে দিতে হয় পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। পুরোনো কারাবন্দিরাও থাকেন দাপটে। পুরোনো বন্দিরা কারা কর্মকর্তাদের অর্থ দিয়ে ওয়ার্ডগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বাণিজ্য করে থাকে। নতুনরা টাকা না দিলে হয়রানি করা হয়। জেল সুপারের বিশ্বস্ত ম্যাটরা বর্তমানে আমদানি কক্ষসহ পুরো কারাগার নিয়ন্ত্রণ করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের অজুহাতে আমদানি কক্ষে আটকে রাখা হয় বন্দিদের। আবার আট-দশ হাজার টাকা দিলেই অন্য ওয়ার্ডে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। বন্দিরা অর্থ দিতে ব্যর্থ হলে তাকে আমদানি কক্ষেই রেখে দেওয়া হয়।

এদিকে কারাগারে দুটি ক্যান্টিন রয়েছে। একটি কারাগারের ভেতরে, অন্যটি বাইরে। বাইরের ক্যান্টিনে কোনো মূল্য তালিকা নেই। ভেতরের ক্যান্টিনের পরিবেশ নাজুক। দুই ক্যান্টিনেই সিগারেট, কলা, বিস্কুট, কেক, আপেলসহ সব পণ্যের দাম বেশি নেওয়া হচ্ছে। বন্দিদের পিসিতে (প্রিজনার ক্যাশ) এক হাজার পাঠালে ২০ টাকা অতিরিক্ত দিতে হয়। অথচ রসিদে লেখা হয় এক হাজার টাকা।

জামিনে বেরিয়ে আসা একাধিক ব্যক্তি জানান, কারাগারের প্রতিটি ওয়ার্ড ইজারা দেওয়া হয়। ম্যাট, সিও ম্যাট, পাহারাদার ও ওয়ার্ড রাইটার এসব ওয়ার্ড বরাদ্দ নিয়ে থাকে। নির্দিষ্ট ইজারামূল্য কারাগারের সুপার নেসার আলমকে পরিশোধ করতে বাধ্য করে তারা।

জানা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় কারাবন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎ বন্ধ রয়েছে স্বজনদের। তবে প্রতিদিনই টাকা নিয়ে স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ করে দিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। অফিস কল এবং সাক্ষাৎকালে টাকা আদায়ের সঙ্গে কারারক্ষী, প্রধান কারারক্ষী ও ডেপুটি জেলার মনির হোসেন, কারাগারের ভেতরের সুবেদার হেলাল ও তার অনুসারী কারারক্ষীরা জড়িত। পরে এই টাকা জেল সুপার এবং ডেপুটি জেলারের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা হয়।

সরেজমিন প্রতিদিন সন্ধ্যায় কারাগারের সামনে জামিনপ্রাপ্ত আসামির স্বজনদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে দেখা যায়। তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৌশলে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কারা কর্তৃপক্ষ। বন্দিরা আদালত থেকে জামিনলাভ করলেও টাকা না দিলে জামিননামা আটকে রেখে মুক্তি বিলম্বিত করা হয়। এর জন্য সর্বনিম্ন তিন-চার হাজার টাকা দিতে হয়। অভিযোগ আছে, বন্দিদের খাবার, স্বজনের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কারাগারে ভালো স্থানে থাকার ব্যবস্থা- এসব কিছু চলে টাকার বিনিময়ে।
আদালতের এক আইনজীবী জানান, আদালত থেকে আসামির জামিনাদেশ পাওয়ার পরও কারা কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে কালক্ষেপণ করে। বিভিন্ন সময় দাঁড়ি-কমার ভুল দেখিয়ে নানা অজুহাতে আসামি প্রতি তিন-চার হাজার টাকা দাবি করে। ঘুষের টাকা না দিলে মুক্তি দিতে টালবাহানা করে।

কারাগারে আসামীরা মুঠোফোনের কথা বলার সুযোগ থাকলেও সবার ভাগ্যে সে সুযোগ হয় না। যারা টাকা দিতে পারবে তারা প্রতিদিন ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলতে পারবে। বর্তমান জেল সুপার আসার পর থেকে কক্সবাজার জেলা কারাগারের সবকিছুই অনিয়মে পরিণত হয়েছে। এ ব্যাপারে তার বক্তব্য নেওয়ার জন্য মুঠোফোনে ফোন করলেও সংযোগটি বিচ্ছিন্ন পাওয়া যায়।

 

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here