কানাকানি বা গুজবের পরিণতি

মানিক চন্দ্র দে

0
8
একটি বিদেশি গল্প।
এক দেশে একলোক প্রেসিডেন্ট হাউজে নিম্নপদে চাকরি করে।  সে হঠাৎ  একদিন দেখল,মহামান্য  রাস্ট্রপতি ভবনের সামনে একটি নতুন ট্যাংক আনা হয়েছে। তার মনে সন্দেহ হল। ব্যাপার কি?  নতুন ট্যাংক আনা হল কেন? নিশ্চয়ই এর পেছনে কোন কাহিনি আছে।  সে  কাজশেষে যথারীতি বাসায় গেল। খুব চিন্তিত।  খেতে খেতে তার স্ত্রীকে বলল, ‘ দেশের অবস্থা ভাল না!  প্রেসিডেন্টের বাড়ির সামনে ট্যাংক দেখলাম।’  তার বৌ এটা শুনলো। পরদিন সেই ভদ্রলোক অফিসে গেল। তার বৌ পাশের বাড়ির ভাবীকে বলল, ‘ভাবী, জানেনতো, দেশের অবস্হা ভাল না। আপনার ভাই প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে নতুন ট্যাংক আসতে দেখেছে’।  কথাটা ক্রমশ একবাড়ি দুবাড়ি করে  দশ বাড়ি থেকে  পাড়া, মহল্লা, পুরো শহর  থেকে শহরে এমনকি গ্রামে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ল নানাভাবে,   ‘দেশের অবস্থা ভাল ন; ‘প্রেসিডেন্ট ভবন ট্যাংক দিয়ে  ঘিরে ফেলেছে।’ ফলে মানুষের ভেতরে আতংক দেখা দিল।   যার ফলশ্রুতিতে বাজারে  কেনাকাটার ধূম পড়ে গেল, জিনিসপত্রের কৃত্রিম সংকটে  জিনিসের দাম বেড়ে গেল।  শেয়ার বাজার পড়ে গেল। মানুষের মধ্যে থমথমে অবস্হা। শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে লোক ছাটাই শুরু হয়ে গেল। দেশে ক্ষমতাসীন  সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠল। এই সুযোগে বিরোধী দল দিল আন্দোলন হরতালের ডাক। সব অচল।  দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি  হয়ে গেল। দেশে কার্ফু জারী হল। পরবর্তীতে ক্যু’ করে সেনাবাহিনীর একাংশ  রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নিল।
প্রকৃত ঘটনাটি হল, প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে আগে যে ট্যাংকদ্বয় রক্ষিত ছিল। সেগুলো পুরনো ও ব্যাকডেটেড  হয়ে যাওয়ায় তার বদলে দুটো নতুন ট্যাংক প্রতিস্হাপন করা হয়েছিল যা ঐ কর্মচারীটি দেখে ও একটু ভিন্নভাবে বৌকে বলেছিল।
পরিণতিতে দেশ ই ধ্বংশ হয়ে যাবার উপক্রম!
১৯৭৪ সাল।  আমি  ক্লাস এইটে। বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে মার্চপাস্ট হবে। আমি তখন আমার স্কুলে একটু আধটু স্কাউটের প্রোগ্রামে থাকতাম।  তো, আমরা স্কুল থেকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গেলাম।  দেখি, বিশাল সমাবেশ হয়েছে শিশু কিশোরের। বিভিন্ন স্কুল/ কলেজ থেকে আমাদের মতো ছাত্র ছাত্রী এসেছে।  আমাদের মার্চপাস্ট মহড়া হবে যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ সন্তান শেখ কামাল। আমি এই প্রথম সামনা সামনি শেখ কামালকে দেখলাম। হ্যাংলাপাতলা,  লম্বা, ছিপছিপে শরীর। মুখে শুরুতে মোটা ও প্রান্তে ক্রমশ সরু মোছ।  খুব ভাল লাগল। এর বহু আগে কিন্তু সরাসরি জাতির পিতাকে দেখেছি আমাদের পুরান ঢাকার  ধূপখোলায় নির্বাচনী জনসভায়, ১৯৭০ সালে।
 ১৯৭৪ সাল থেকেই  স্কুলে, পথে ঘাটে নানা অপপ্রচার কানে আসতো বঙ্গবন্ধু ও তাঁর পরিবার সম্পর্কে। ১৯৭৫ এ তা প্রকট হল। তার মধ্যে অন্যতম ছিল,  শেখ কামাল ‘ব্যাংক ডাকাতি’ করতো ( অথচ কালই শুনলাম এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী পর্যন্ত বললেন, এটা চরম মিথ্যাচার!  অপপ্রচার।  শেখ কামাল খুবই সৎ, দক্ষ ক্রীড়া সংগঠক,আবাহনী ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা , লাজুক ধরনের অত্যন্ত ভদ্র ছেলে ছিলেন,  তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাংক ডাকাতির তথ্য  ডাহা মিথ্যা) ।   আবার কেউ কেউ বলতো, বঙ্গবন্ধু ভাল ইংরেজি জানেন না, তিনি ভাল নেতা হতে পারেন,কিন্তু ভাল প্রশাসক নন। ‘ইত্তেফাক’ পত্রিকায় কুড়িগ্রামের বাক ও বুদ্ধি প্রতিবন্ধী বাসন্তীর খালি গায়ে জাল জড়িয়ে ছবি তুলে পাক মার্কিন চক্রান্তে বাংলাদেশে তৎকালীন সময়ে বিরাজমান দুর্ভিক্ষকে ফুলিয়ে ফাপিয়ে বড় করে তোলা, যেমন- ‘উত্তর বঙ্গে লাখে লাখে মানুষ না খেতে পেরে রাস্তাঘাটে মরছে’ ইত্যাদি। আসলে,  দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ক্ষেত্র তৈরি করছিল খুবই সুনিপুণভাবে, বঙ্গবন্ধুর সরকার উৎখাতের।
যার পরিণতিতে ‘৭৫ এর মর্মান্তিক এই হত্যাযজ্ঞ।
অথচ আমরা সবাই জানি কত মিথ্যা ছিল সেইসব অপপ্রচার, যা কুচক্রীমহল করেছিল সেদিন। এরা সবাই ছিল আসলে স্বাধীনতা বিরোধী, পাকি রাজাকার।
১৯৭৫ এর ১৫ আগষ্ট আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান  (যিনি এদেশে না জন্মালে এদেশ স্বাধীন হতো কিনা সন্দেহ)  ও বঙ্গমাতা-  মহীয়সী নারী শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব ( যিনি বঙ্গবন্ধুর যোগ্য প্রেরণাদাত্রী)  সহ  শেখ কামাল, শেখ জামাল, শেখ রাসেল ( তখন  তাঁর মাত্র ১২ বছর বয়স!) এবং  তাঁর  নিকট আত্মীয় স্বজন সেদিন  নৃশংসভাবে বিপথগামী সৈনিকদের হাতে মর্মান্তিক মৃত্যুবরণ করেন। শহীদ হন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তাঁর  বোন শেখ রেহানা বেঁচে যান, বিদেশে ছিলেন বলে।
তারপর নভেম্বরে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী চার দক্ষ কারিগর তাজউদ্দীন আহমেদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম,  ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে জেলখানার ভেতরে রেখেই  বিপথগামী ঐ সেনাদের কেহ কেহ গুলি করে হত্যা করে। তাঁরাও শহীদ হন।
আজ  শোকের এই মাসে বিনম্র চিত্তে স্মরণ করি তাঁদের সকলকে। তাঁদের আত্মার চিরশান্তি কামনা করি।
পিতা!   টুঙ্গিপাড়া থেকে ছড়িয়ে পড়েছে তোমার আদর্শ,  তোমার ত্যাগ আর তোমার সংগ্রামের অমরগাঁথা। যা থেকে সবাই প্রেরণা পাচ্ছে। সত্যের আলোতে আলোকিত হচ্ছে বিশ্বজগত।
তোমাকে শতকোটি প্রণাম আমার।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here