ক্লিন যুবলীগের ডার্টিম্যান লক্ষ্মীপুরের টিপু-নোমান

0
1694

   ভাইরাল হওয়া অডিও নিয়ে তোলপাড়

* কমিটি বাণিজ্য চলছে পুরনো স্টাইলে

বিশেষ প্রতিনিধি :
হাইকমান্ডের সতর্কতা ও নির্দেশনাকে উপেক্ষা করেই লক্ষ্মীপুরে যুবলীগকে ‘প্রাইভেট কোম্পানিতে’ পরিণত করা হয়েছে। পুরনো স্টাইলেই দেদারছে চলছে কমিটি বাণিজ্য। অন্যদিকে হাইব্রিড ও অনুপ্রবেশকারীদের দাপটে কোণঠাসা হয়ে আছেন ত্যাগী নেতা-কর্মীরা।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ এবং বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যে তৃণমূলের এ চিত্র ওঠে এসেছে। দলীয় সূত্র মতে, লক্ষ্মীপুরের বিতর্কিত আওয়ামী লীগ নেতা আবু তাহেরের মেঝো ছেলে বর্তমান সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান সালাহ্ উদ্দিন টিপুর কাছেই জেলা যুবলীগ প্রায় অর্ধযুগ ধরে জিম্মি হয়ে আছে। দেড় বছর আগে দুর্নীতি বিরোধী শুদ্ধি অভিযানে খোলনলচে পাল্টে সংগঠনকে নতুনভাবে সাজানো হলেও এর কোনো প্রভাব পড়েনি লক্ষ্মীপুরে। বরং সালাহ্ উদ্দিন টিপুর এক অডিও রেকর্ড নিয়ে সংগঠনের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এই রেকর্ডটি সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কথোপকথন হয় জেলা যুবলীগের সভাপতি সালাহ্ উদ্দিন টিপু ও সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক বায়েজিদ ভূঁইয়ার মধ্যে। অডিও রেকর্ডের ভাষ্যানুযায়ী যায়, সালাহ্ উদ্দিন টিপু ও সেক্রেটারি আবদুল্লাহ আল নোমান সাড়ে তিন বছর আগে প্রায় সোয়া কোটি টাকার বিনিময়ে জেলা যুবলীগের সভাপতি, সেক্রেটারি নির্বাচিত হয়েছিলেন। যুবলীগের বিতর্কিত সাবেক দপ্তর সম্পাদক আনিসের স্ত্রীর মাধ্যমে এই টাকার লেনদেন হয়েছে বলে অডিও বার্তায় টিপু নিজেই স্বীকার করেন। কথোপকথনকালে বায়েজিদ ভূঁইয়াকে জেলার সেক্রেটারি করার প্রস্তাব দেন টিপু। এ সময় বায়েজিদের এক প্রশ্নে জবাবে টিপুকে বলতে শোনা যায় “কোন ব্যাপার না সব ম্যানেজ হয়ে গেছে, যুবলীগ টোটাল চালায় নিখিল ভাই, পরশ ভাই হইছে শো”।
জানা যায়, টিপু-নোমানের দুই সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি সাড়ে তিন বছর পুরো জেলায় যুবলীগকে একটি ট্রেড লাইসেন্স সম্পন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে। নিয়ম অনুসারে ২০১ সদস্য বিশিষ্ট পূর্ণাঙ্গ কমিটি তিন মাসের মধ্যে কেন্দ্রে জমা দেওয়ার কথা থাকলে সাড়েও তিন বছরে পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা দেয়নি টিপু-নোমান। এদিকে বিগত সাড়ে তিন বছরে টিপু-নোমান অপকর্মের ফিরিস্তিও বিশাল। দেড় কোটি টাকায় কমিটি ক্রয় করে নিয়ে প্রথমেই প্রতিদ্ব›দ্বী যোগ্য এবং ত্যাগী যুবলীগের কর্মীদের কঠোরভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া শুরু করে তারা। স্থানীয় বিএনপির চিহ্নিত খুনিদের রিক্রুট করা হয়, লেলিয়ে দেওয়া হয় ত্যাগী আওয়ামী নেতাকর্মীদের পেছনে। পুরষ্কার হিসেবে টেন্ডারের ভাগ দিয়ে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা হয় তাদের।
অন্যদিকে টিপু-নোমান প্রতিটি ইউনিয়ন, উপজেলা, থানা কমিটির একটি পদ বিক্রি করেছে একাধিকার। এসব পদের যুবদল, ছাত্রদল, শিবিরের ক্যাডারদেরও স্থান করে দেওয়া হয়। পত্র-পত্রিকায় ইতিমধ্যে এসব নিয়ে অসংখ্য রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। যেমন রায়পুর উপজেলা কমিটি বিদ্যমান থাকাবস্থায় টাকার বিনিময়ে ব্যাক ডেটে আরেকটি কমিটির অনুমোদন দেয় টিপু-নোমান। এই নিয়ে তোলপাড় শুরু হলে বর্তমান চেয়ারম্যানের নির্দেশে উভয় কমিটি স্থগিত করা হয়। এখানেই শেষ নয় তাদের অপকর্মের বিশালতা। নতুন উপজেলা কমিটিতে সদস্য করা হয় মানব পাচারে অভিযুক্ত স্বতন্ত্র এমপি পাপুলের মেয়েকে। পাপুল কখনো আওয়ামী রাজনীতির সাথে জড়িত ছিলেন না। প্রায় ২ কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছে পাপুলের মেয়ের পদটি। এরইমধ্যে জেলা কমিটি পদ বিক্রি হয়েছে মৌখিক এবং এসএমসের মাধ্যমে। একই পদ একাধিক জনের নিকট মৌখিকভাবে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগও আছে। এখানেই থেমে থাকেনি টিপু। ২০১৯ সালে সদর উপজেলা নির্বাচনে টিপু নিজেই প্রার্থী হয়েছেন নৌকার বিপক্ষে। দৃশ্যমান হয় আওয়ামী লীগ বনাম টিপু যুবলীগ। একাধিক ফেসবুক লাইভে এসে টিপু নিজেই আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কথা বলে। ভোট কারচুপি অভিযোগ তোলা হয় সরাসরি নেত্রীর বিরুদ্ধে। তাছাড়া ভোটে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের গুলি, অপহরণ করে ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টি করা হয়। কেন্দ্র কেন্দ্র অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী দিয়ে হারিয়ে দেওয়া হয় নৌকাকে। লক্ষ্মীপুরের মাটিতে এই প্রথম নৌকা প্রতীক পরাজিত হয় টিপুর যুবলীগ বাহিনীর হাতে।
অন্যদিকে যুবলীগের সাবেক দপ্তর সম্পাদক কাজী আনিসের বিশ্বস্ত সহযোগী হিসেবে বারবারই অনুসন্ধানে নাম উঠে এসেছে নোমানের। কাজী আনিসের সহযোগী এবং ক্যাসিনো ব্যবসার সাথে জড়িত থাকার বিষয়ে একাধিক রিপোর্টও প্রকাশিত হয় পত্র-পত্রিকায়।
ইতিমধ্যে টিপু-নোমানের কমিটি মেয়াদও গত বছরের নভেম্বর শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদ উত্তীর্ণ দুই সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটি এখন শুরু করেছে নতুন ফন্দিফিকির। সম্প্রতি সারাদেশের পূর্ণাঙ্গ কমিটি জমা করার জন্য কেন্দ্র থেকে একটি সার্কুলার জারি হয়। এতেই টিপু-নোমানের ধান্ধার সুযোগ সৃষ্টি হয়। গত ২৯ এপ্রিল টিপুর স্বাক্ষরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির একটি তালিকা যুবলীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সেলে জমা দেওয়া হয়েছে। সূত্র মতে এতে সহ-সভাপতি করা হয়েছে টিপুর ছোট ভাই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী শিবলুকে। তবে বায়েজিদকে বাগে আনতে না পেরে নোমানকেই রাখা হয় সেক্রেটারি হিসেবে। আরেকটি সূত্র নিশ্চিত করেছে এই কমিটিতে একজন প্রেসিডিয়াম সদস্যের ১১ জন এবং একজন কার্যনির্বাহী সদস্যের ৩৪ জন অনুসারীর নাম রয়েছে যাদের বেশীরভাগই অনুপ্রবেশকারী, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ডাকাতি ও হত্যা মামলার আসামী। এছাড়া কমিটিতে নামা রাখা হয়েছে ৫০ লক্ষ টাকার বিনিময়ে শিবির থেকে জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি বনে যাওয়া সেই সময়ের আলোচিত-সমালোচিত চৌধুরী মাহমুদুন্নবী সোহেলের নাম।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here