জনবান্ধব প্রশাসন কতদূর?

ফজলুল হক ভুঁইয়া রানা

0
19

দুর্নীতি মুক্ত এবং জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা দীর্ঘদিনের। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে বহুবার জনবান্ধব প্রশাসন গড়ে তোলার তাগিদ দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের নানা সুযোগ-সুবিধা প্রদান ছাড়াও বহুমুখী উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর কতটুকু প্রতিফলন ঘটেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। স¤প্রতি বিশ্বব্যাংকের বিকল্প নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের একটি স্ট্যাটাস নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সরকারি কর্মকর্তাদের বেশিরভাগই যে অপরিচিত কল ধরেন না তা নিয়ে সাবেক এই শীর্ষ কর্মকর্তার আক্ষেপ প্রকাশ পেয়েছে স্ট্যাটাসটিতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তিনি লিখেছেন ‘সহকর্মীদের সঙ্গে প্রবাস থেকে কথা বলতে গিয়ে বুঝলাম তাদের বেশিরভাগই অপরিচিত কল ধরেন না, মেসেজ পড়ে দেখেন না বা উত্তর দেন না। আমরা কি এ সংস্কৃতি হতে বের হতে পারি না?’ পরে নেটিজেন অনেকেই সেই স্ট্যাটাসটির নিচে মন্তব্য করে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং তা ফেসবুকে ভাইরাল করে দেন। মূলতঃ সহকর্মীরা ফোন না ধরায় অভিমানে সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব স্ট্যাটাস দিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করলেও প্রশাসনের এ চিত্র উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার বিষয়। যেখানে একজন শীর্ষ আমলার এ অভিজ্ঞতা, সেখানে সাধারণ মানুষের কি দশা তা সহজেই বোধগম্য। ভুক্তভোগী কেউ বিপদের মুখে নিতান্ত নিরূপায় হয়েই প্রশাসনের কোন কর্তা ব্যক্তির ফোনে হয়তো কল দিলেন। অথচ অপরিচিত ভেবে অনেক কর্মকর্তাই ফোন রিসিভ করার গরজ অনুভব করেন না। ফলে ভুক্তভোগীকে অসহায়ত্বের মধ্যে থেকেই বিপদ মোকাবেলা করতে হয়। এর ব্যতিক্রমও রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরেক কর্মকর্তার স্ট্যাটাস ভাইরাল হয়েছে। নওগাঁর জেলা প্রশাসক (ডিসি) হারুন-অর-রশিদ বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার আহবান জানিয়ে গত ১৯ জানুয়ারি মধ্যরাতে ‘দিন বদলের গল্প’ শিরোনামে তার ব্যাক্তিগত ফেসবুক আইডিতে ওই স্ট্যাটাস প্রকাশ করেছেন। সেখানে একজন চালকল শ্রমিকের ডিসিকে ফোন করে মিলের কাছে তার পাওনা ২০ দিনের মজুরি আদায়ে সহায়তার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। স্ট্যাটাসে ডিসি লিখেছেন, ‘ এই ঘটনাটিকে আমার বদলে যাওয়া বাংলাদেশের একটি খণ্ড চিত্র বলে মনে হয়েছে।’ তাছাড়া ডিজিটাল বাংলাদেশের সুফল আমরা কতটা ভোগ করছি তার একটি ছোট্ট উদাহরণ এ ঘটনা। সবচে’ বড় কথা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলে যাওয়া মানসিকতা এ ঘটনায় প্রস্ফূটিত হয়েছে। ডিসির কাছে এভাবে মানুষ সহজে পৌঁছাতে পারে তা এখনো হয়তো অনেকে বিশ্বাস করতে চান না। তাছাড়া মানুষের ধারণা ডিসির কাছে একটা কিছু বললে তিনি তার এডিসিকে বলবেন, এডিসি ইউএনওকে বলবেন। এভাবে তিন চারজন ঘুরে মেসেজ যাবে। ডিসি সরাসরি মানুষকে ফোন দিতে পারেন তাও মানুষ বিশ্বাস করতে চান না।

ডিসি হারুন-অর-রশিদের এ অনুভ‚তি যে অত্যুক্তি কিছু নয়, তা বলাই বাহুল্য। কেননা, আমাদের প্রশাসন এখানো আমলাতান্ত্রিক ধারণা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ‘ফিতার’ রং পাল্টালেও প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের মনমানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। নিজের পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং ভুক্তভোগী বিভিন্ন জনের সঙ্গে আলাপের সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, প্রশাসনের কর্মকর্তা অধিকাংশই নিজেদের সাধারণ্যের ঊর্ধ্বে কিছু ভাবেন। চেয়ারে বসলেই যেন তারা হুঁশ হারিয়ে ফেলেন। জনসেবা নেয়, শাসক হিসেবে ছড়ি ঘোরাতেই তারা অভ্যস্ত। তাদের ধ্যান-ধারণায় ঔপনিবেশিক চিন্তাভাবনা স্পষ্ট। সরকারের পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগের পরও এক শ্রেণির মানুষের প্রভুত্ববাদী মানসিকতার পরিবর্তন হয়নি। অথচ সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের মালিক হচ্ছে জনগণ। সংবিধানের প্রথম ভাগে ৭-এর (১) ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ; এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ গত বছরের মাঝামাঝি একটি রিট আবেদনের শুনানি গ্রহণকালে হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতি আর প্রধানমন্ত্রী ছাড়া দেশে কোনো ভিআইপি নেই। বাকিরা সবাই প্রজাতন্ত্রের চাকর।’

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রশাসনের এ দুরবস্থার কারণ বহুবিধ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে: বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের অভাব, নিয়োগকালে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক যথাযথ যাচাই না করা, দলবাজি ইত্যাদি। এ কারণে শুধু সাধারণ মানুষই হয়রানির শিকার হন না, অনেক সময় স্বগোত্রীয় কর্মকর্তারাও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে সিনিয়রকে জুনিয়রদের উপেক্ষা কিংবা যথাযথ সম্মান না জানানোর অনুযোগ প্রায়শঃ শোনা যায়। মাঠ পর্যায়ে এ চিত্র আরো ভয়াবহ। নওগাঁর ডিসি দিন বদলের গল্প শোনালেও অধিকাংশ ডিসি, ইউএনও কিংবা সহকারী কমিশনার ভ‚মি (এসি ল্যান্ড) সামন্ত প্রভুর ন্যায় অধিষ্ঠিত হয়ে আছেন। প্রধানমন্ত্রীর তাগিদ কিংবা জনবান্ধব প্রশাসন গড়ার নীতিবাক্য তাদের কর্ণকুহরে প্রবেশ করে না। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে যা কখনও কাম্য নয়। আমাদের সংবিধানের ছত্রে ছত্রে জনগণের সার্বভৌমত্ব, সুপ্রিমেসি এবং অধিকার উচ্চকিত হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, স্বাধীনতার ৪৮ বছর পরও এ দেশে জনগণের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। বরং পাবলিক সার্ভেন্টদের সুপ্রিমেসি প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। কিছু মানুষের প্রভুত্ববাদী মানসিকতায় সংবিধানের মূল চেতনা অব্যাহতভাবে লঙ্ঘিত হয়ে চলেছে।
যা হোক, দেশে বর্তমানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের ব্যাপক প্রস্তুতি চলছে। জাতির জনকের আদর্শকে শাণিত করতেই আয়োজনে নানা কর্মসূচী রয়েছে। বঙ্গবন্ধু দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিলেন একটি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে। স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী সমাগত। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা এখনও অলীক স্বপ্ন হয়ে আছে। তবে স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়া অসম্ভব কোন ব্যাপার নয়। এ জন্য সরকারের মূল চালিকা শক্তি প্রশাসনকে আরো উদ্যমী ও জনবান্ধব হতে হবে। জাগ্রত করতে হবে দেশপ্রেমকে। পরিশেষে প্রশাসন সংশ্লিষ্টদের জন্য জাতির জনকের একটি ভাষণের উদ্ধৃতি দিতে চাই। ১৯৭৫ সালের ২৬ মার্চ ঢাকার ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ভাষণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, “আপনি চাকরি করেন, আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব কৃষক। আপনার মাইনা দেয় ওই গরিব শ্রমিক। আপনার সংসার চলে ওই টাকায়। আমরা গাড়ি চড়ি ওই টাকায়। ওদের সম্মান করে কথা বলুন, ইজ্জত করে কথা বলুন। ওরাই মালিক, ওদের দ্বারাই আপনার সংসার চলে। সরকারি কর্মচারীদের বলি, মনে রেখো এটা স্বাধীন দেশ। এটা ব্রিটিশের কলোনি নয়।…”

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here