“জাতির পরিচয় ও বঙ্গবন্ধু”

মোঃ আপেল মাহমুদ

0
147

এ কথা সর্বজন স্বীকৃত যে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের দীর্ঘ নয় মাসের ত্যাগের বিনিময়ে লাখো লাখো প্রাণের ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম। বাঙ্গালীর স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের মানচিত্রে এই বাংলাদেশ সম্মানের সাথে জায়গা করে নিয়েছে যে ব্যক্তির জন্য তিনি হচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীনতার জন্য যখন এই মানুষটির নেতৃত্বে সমগ্র পূর্ব বাংলার মানুষজন সংগ্রামমুখর তখনই তার নামের আগে বঙ্গবন্ধু উপাধিটি যুক্ত করেন এই দেশের আপামর সাধারণ মানুষ। অনেক সাধনার পরে বাঙ্গালী জাতি পায় বাংলার একজন প্রকৃত বান্ধব। তাই বঙ্গবন্ধু নামক শিরোপাটি তার মাথায় ভালবাসার মুকুট হিসেবে পড়িয়ে দিতে কুন্ঠাবোধ করেনি বাঙ্গালী জাতি। স্বাধীনতার জন্য বাঙ্গালী জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর ত্যাগ তিতিক্ষার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই এই মানুষটাকে বাঙ্গালী জাতির জন্য এক অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে গড়ে তুলেছিল। এই কথা সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য বাঙ্গালী জাতির জন্য বঙ্গবন্ধুর ভালবাসা ছিল আকাশচুম্বী। এই মানুষটির ছবি দেখলেই বুঝা যায় তিনি ছিলেন সহজ সরল ও মানবিক চেহারা সম্পন্ন একজন ব্যক্তিত্বপূর্ন মানুষ। তার ভাষনের প্রতিটি লাইনের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় বাঙ্গালী জাতির মুক্তির চিন্তা এবং এমন রাষ্ট্রদর্শন যা একটি জাতি মুক্তির জন্য এক অকল্পনীয় ভাবধারা। যেমন তিনি ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চে যে ভাষন দিয়েছিলেন সে ভাষনের প্রত্যেকটা লাইনে ছিল শোষকের বিরুদ্ধে হুশিয়ারী, আর শোষিত বাঙ্গালী জাতির মুক্তির দিক নির্দেশনা। তিনি বলেছেন এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এই মুক্তি অর্থনৈতিক দূরাবস্থা অর্থনৈতিক শোষণ থেকে মুক্তির দিক নির্দেশনা আবার বলেছেন“ এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম” তা দিয়ে তিনি বুঝতে চেয়েছেন বাঙ্গালী জাতিকে অর্থনৈতিক নিপীড়ন থেকে মুক্ত হতে হলে, সৃষ্টি করতে হবে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে শোষকের বিরুদ্ধে। তোমাদের যা কিছু আছে তা নিয়ে প্রস্তুত থেকো, এই কথা দিয়ে বুঝাতে চেয়েছেন সামরিক অস্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কোন বিকল্প নেই, এখানে অস্ত্র বড় বিষয় নয়। বিষয় হচ্ছে প্রতিবাদ করা প্রতিরোধ করা আর মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়া আর রক্ত দেওয়ার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নেয়া। তাহলেই বাঙ্গালীর মুক্তি আসবে এবং এই কথার মাধ্যমে বাঙ্গালী জাতিকে তিনি করেছেলেন স্বাধীনতার জন্য অনুপ্রানিত, ঐক্যবদ্ধ, উজ্জীবিত। যে অনুপ্রেরনায় বাঙ্গালী জাতি সত্যিকার অর্থেই নয় মাস রক্ত সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এবং আমার বাবা মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শত বাংলার বীর সন্তানেরা সক্ষম হয়েছিল নিজেদের স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে । আর এই কারনেই বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষন ছিল বাঙ্গালী জাতির মুক্তির দলিল আর স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র। বাংলার মুক্তি সংগ্রামের ইতিহাস বিশ্লেষন করলে দেখা যায়, দেশ ভাগের পরে পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শাষকদের সকল ধরনের নির্যাতন ও আধিপত্য বিস্তারের প্রবনতা বঙ্গবন্ধু কে নানা ভাবে আলোড়িত করেছিল। আর এই কারনেই তিনি অনুভব করেছিলেন দ্বি-জাতিতত্তে¡র অসারতা। এই তত্ত¡ যে কেবল ক্ষমতা লাভের এক অনিবার্য হাতিয়ার তাও তিনি মর্মে মর্মে অনুভব করেন। এ ভাবেই তিনি আস্তে আস্তে বাঙ্গালী জাতীয়তাবোধ উদ্ধুদ্ধ হয়ে উঠেন, এবং তিনি মুসলিম লীগ থেকে নিজেকে সরিয়ে সেই সময় তিনি প্রতিষ্টা করেছিলেন “গনতান্ত্রিক যুবলীগ” একই সময়ে তিনি পূর্ব পাকিস্তান শাসন করেন। ১৯৪৯ সালে তিনি নবগঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগ এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন, পরে ১৯৫২ সালে এই দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হয়ে দলকে সু-সংগঠিত করেন। অচিরেই এই দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ পড়ে শুধু আওয়ামীলীগ হিসেবে পরিচিত হয় এবং হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে দেশের আপামর সাধারণ মানুষের দল হয়ে উঠে এই আওয়ামীলীগ এবং বঙ্গবন্ধু নেতৃত্বে সমস্ত পূর্ব বাংলায় এই দল ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। যে দলটি আদর্শ আমার বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমান আমৃত্যু লালন করেছিলেন এবং আমি সহ তার সকল সন্তানদের এই দলের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বঙ্গবন্ধুকে জানার জন্য, বুঝার জন্য এবং তার বাঙ্গালী জাতির জন্য তার ত্যাগ তিতিক্ষা উপলব্ধি করার জন্য সারা জীবন আমাদের গর্ববোধ করতে বলেছিলেন এবং আমরাও বাবার এই অদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের গর্ববোধ করি। তাই সকল ভাই বোন প্রস্তুত আছি আমারাও যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শের যে কোন ডাক দেশের প্রয়োজনে আসে তাহলে তার কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ প্রস্তুতিতে লাইনে দাঁড়াতে আমার এবং আমাদের বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ হবে না। কিন্তু যে মানুষটির কারণে আমরা এই দেশ পেয়েছি সে মানুষটাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট পাকিস্তানপন্থী ঘাতকদের হতে প্রান দিতে হয়েছিল।

৭১ থেকে ৭৫ পর্যন্ত এই অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশ বিরোধী শক্তি এমন ভাবে মাথা নাড়া দিয়ে উঠে যে এই দেশে ধীরে ধীরে স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির মাথা তুলে দাঁড়ায়। যারা দেশে এক চরম অস্থিরতা ও অশান্তির সৃষ্টি করে। স্বাধীনতার পক্ষের চিন্তার চেতনার বিলোপ্ত ঘটাতে সামরিক শক্তির অশুভ কালোছায়া সারা দেশকে গ্রাস করে। এই অপশক্তিকে হটাতে দীর্ঘ কুড়ি বছর বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা অনেকটাই পিছিয়ে পড়ে। দেশের অগ্রগতি নানা ভাবে ব্যাহত হয়। আল্লাহর অশেষ রহমতে বঙ্গবন্ধুর কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পিতার ইচ্ছা বাস্তবায়নে আওয়ামীলীগের হাল ধরেন এবং অর্জন করেন সাধারন মানুষের আস্থা এবং জনগন তাকে এবং আওয়ামীলীগকে ক্ষমাতায় বসায়। তাও একবার নয় চার বার, আর মাননীয় শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের অর্থ নৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সহ সর্ব দিকে যে অপ্রতিরোধ্য অগ্রগতি তা একক ভাবেই চোখে পড়ার মতো। আর এই কারনেই বলা হয়ে থাকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের দল যখন ক্ষমতা থাকে বাংলার মানুষ তখন দারিদ্রমুক্ত হয়। মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় বিশ্ব দরবারে। সর্বশেষ যে কথাটি বলতেই হয় বাংলাদেশ ও শেখ মজিবুর রহমান প্রায় দুটি সমার্থক শব্দ। পাকিস্তানে অপশাসন থেকে মুক্তি লাভের জন্যই এই রাষ্ট্রের জন্ম। এই রাষ্ট্রের জন্ম বাঙ্গালী চিন্তা চেতনার বাস্তবায়নের লক্ষ্যে। তাই বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব মূল্যায়ন করা হবে না। কেননা জন্ম দাতাকে অস্বীকার করলে কারো পরিচয় যেমন অর্থহীন তেমন বাংলাদেশের অস্তিত্তে¡র প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও এক অনিবার্য সত্তা।

লেখক : একজন বীর মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, পুলিশ সুপার, ট্যুরিস্ট পুলিশ, চট্টগ্রাম রিজিয়ন।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here