ঢাকায় ভয়ংকর ছিনতাইকারী চক্র

0
55

কেউ ওত পাতে কেউ ঘুরে ঘুরে শিকার ধরে

নাজমুল হক ভুঁইয়াঃ
রাজধানীতে ভয়ংকর হয়ে উঠেছে ছিনতাই চক্র। রাতে ছিনতাইকারীরা বেশি তৎপর থাকে। কেউ ওতপেতে থাকে রাস্তার ধারে, আর কেউ গাড়ি নিয়ে ঘুরে ঘুরে শিকার ধরে। সম্প্রতি বেশ কিছু অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বেশ কয়েকটি চক্রকে গ্রেফতারও করেছেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নগরীর মূল সড়কের পাশাপাশি অলিগলির সরু রাস্তাকেও ব্যবহার করছে ছিনতাইকারীরা। ছিনতাইয়ে জড়িয়ে পড়েছে ভাসমান মানুষের একটি অংশও। অপরাধের পর ভোর রাতে ফুটওভার ব্রিজসহ বিভিন্ন পরিত্যক্ত জায়গায় আশ্রয় নেয় এরা।

সম্প্রতি একটি ছিনতাই চক্রকে গ্রেফতার করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। দিনে এদের কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ হোটেল বয়, কেউ বিয়ে বা পার্টির ডেকোরেশনের কাজ করত। দিনের আলো নিভে যেতেই তারা হয়ে উঠত ভয়ংকর। এরা প্রথমে ছিনতাই করত পিকআপ কিংবা মাহেন্দ্র। এরপর ছিনতাই করা পরিবহণ নিয়ে দাপিয়ে বেড়াত নগরীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ফাঁকা জায়গায় কোনো পথচারি, মোটরসাইকেল আরোহী ও মালবাহী যানবাহন দেখলেই সেটির গতিরোধ করে শুরু করে ছিনতাই।

১৪ ফেব্রুয়ারি বিকালে উত্তরার ৪ নম্বর সেক্টরে কয়েকজনের সঙ্গে হাঁটছিলেন একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষিকা। তার হাতের ব্যাগটিকে টার্গেট করে আবারও ঘুরে আসে কালো রঙের একটি গাড়ি। সুযোগ বুঝে টান দেয়। হ্যাঁচকা টানে ওই শিক্ষিকা রাস্তায় পড়ে গুরুতর আহত হন। গোয়েন্দা পুলিশ সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ছিনতাইকারী সুমনকে ১৬ ফেব্রুয়ারি গ্রেফতার করেছে। সে জানিয়েছে, পেশায় গাড়িচালক হলেও ছিনতাই তার নেশা। একজন নামকরা ব্যক্তির গাড়ি চালায় সে। ডিউটির ফাঁকে ছিনতাই করত সুমন।

এর আগে ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে শাহবাগ থানাধীন টিএন্ডটি এক্সচেঞ্জের পূর্ব পাশে টেম্পোস্ট্যান্ড এলাকায় শহীদুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ীকে মারধর করে ৩৫ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় মামলা হলে গোয়েন্দা পুলিশ ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি মাজহারুল ইসলাম ওরফে রাকিব, জহিরুল তালুকদার, আবু বক্কর সিদ্দিক ওরফে খোকা, সেলিম ওরফে ল্যাংরা সেলিম, লালন ও সেলিম মিয়া নামে ছিনতাই চক্রের ৬ সদস্যকে গ্রেফতার করে। এদিকে ২৩ জানুয়ারি হাইকোর্টের সামনে ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন জাসদ নেতা ও ডিশ ব্যবসায়ী হামিদুল ইসলাম। এ ঘটনায় উত্তর মুগদা ও কামরাঙ্গীরচর থেকে চক্রের মূল হোতা এরাবিয়ান সোহেলসহ ৫ জনকে গ্রেফতার করে গোয়েন্দা পুলিশ। ১২ জানুয়ারি রাতে যাত্রাবাড়ীতে ভাসমান ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে সাঈদ খোকন মীর নামে এক পিকআপচালক নিহত হন।

ডিএমপি সূত্রে জানা গেছে, অপরাধ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে ২০ জানুয়ারি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ডিবির ৩২টি টিম একযোগে বিশেষ অভিযান চালিয়ে চুরি-ছিনতাই চক্রের ৩৪ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলেছেন, পেশাদার ছিনতাই চক্র সুযোগ বুঝে ভাসমান লোকজনকেও ছিনতাইয়ের কাজে লাগাচ্ছে। আর বসবাসের নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা না থাকায় অপরাধ সংগঠনের পর দ্রুত স্থান বদলে এরা অন্য এলাকায় চলে যায়। এদিকে ১৬ জানুয়ারি থেকে ডিএমপির সব থানা এলাকায় টহল বাড়ানো হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে-নগরীর গুলিস্তান, সদরঘাট, কমলাপুর, যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, নিউমার্কেট, কলাবাগান, শুক্রাবাদ, কাওরান বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ভাসমান অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। মূলত রাতে চলাচলকারী মানুষকে টার্গেট করে এরা ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটাচ্ছে।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ছিনতাইকারীরা ডাকাতিসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়াতে দ্বিধাবোধ করে না। একসময় ভাসমান আপরাধীরা পেশাদার অপরাধী হয়ে উঠে। এদেরকে দিয়ে কোনো কোনো সময় অর্থের বিনিময়ে অপরাধ করানো হয়। বেশিরভাগ ছিনতাইকারী মোটরসাইকেল ও মাইক্রোবাস ব্যবহার করে। গোয়েন্দা সংস্থার ভুয়া পরিচয় দিয়ে ছিনতাইকারীরা নিরীহ সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুট করে। তবে ছিনতাইয়ের শিকার অধিকাংশ মানুষ পুলিশের দ্বারস্থ হন না। আবার কেউ থানায় গেলেও মামলা না নিয়ে হারানো জিডি হিসাবেই এন্ট্রি করা হয়।

গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এ কে এম হাফিজ আক্তার বলেন, অপরাধ দমনে টহল টিম বাড়ানো হয়েছে। রাজধানীর বাসা-বাড়ির ও ভাড়াটিয়াদের তথ্য হালনাগাদের কাজ হাতে নেওয়া হয়েছে।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here