দুর্নীতি-বিস্ফোরণে ব্যর্থ রাষ্ট্র হওয়ার পথে লেবানন

0
16

আন্তর্জাতিক ডেস্ক :

গত ৪ আগস্ট বৈরুতকে ছিন্নভিন্ন করা ভয়াবহ বিস্ফোরণ যেকোনও দেশের জন্যই দুঃস্বেপ্নের চেয়েও ভয়ঙ্কর। ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে বৈরুত বন্দরে ২ হাজার ৭৫০ টন অ্যামোনিয়াম নাইট্রেটের অনুপযুক্ত মজুত থেকে এ বিস্ফোরণ ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১৩৭ জন, আহত পাঁচ হাজারেরও বেশি। বিস্ফোরণের প্রভাবে শহরের ভবনগুলো ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, এমনকি লেবানিজ রাজধানীর দূরবর্তী এলাকার বাড়িঘরের জানালাও ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে।

তবে ছাই থেকে পুনর্জন্ম নিতে জানে বৈরুত। বলা হয়- পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাসে শহরটি অন্তত সাতবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মিত হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক বিপর্যয় প্রাচীন শহরটিকে অতীতের যেকোনও যুদ্ধ, আগ্রাসন বা ভূমিকম্পের তাণ্ডবের চেয়েও বেশি তাড়া করছে। কারণ কোনও বহিরাগত শক্তি বা প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং এবারের বিপদটি এনেছে লেবাননের নিজস্ব শাসকগোষ্ঠীই।

বৈরুত বন্দরের বিস্ফোরণ কীভাবে বা কেন ঘটল তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে এতে কোনও সন্দেহ নেই যে, গত মঙ্গলবারের এ ঘটনা কোনও সাধারণ দুর্ঘটনা নয়। এটি ছিল লেবাননের রাষ্ট্রযন্ত্রের দুর্নীতি, অক্ষমতা এবং অবহেলার অন্তর্নিহিত সংস্কৃতির সবশেষ ভয়াবহ পরিণতি।

বৈরুত বন্দরটি বাস্তবিকভাবে কোনও ধরনের সরকারি তদারকি ছাড়াই চলে। এটি যৌথভাবে পরিচালনা করে শুল্ক কর্তৃপক্ষ এবং বৈরুত বন্দর কর্তৃপক্ষ। প্রথমটি প্রেসিডেন্ট মিশেল আউনের অনুগতদের নিয়ন্ত্রণে এবং পরেরটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির অনুগত আমলারা পরিচালনা করেন। এ দু’টি কর্তৃপক্ষই কাগজে-কলমে লেবানিজ সরকারের তত্ত্বাবধানে রয়েছে, তবে বাস্তবে তারা দেশটির অন্যান্য কর্তৃপক্ষ ও সংস্থার মতো কোনও সরকারি গোষ্ঠী বা সংসদীয় কমিটির আওতায় নেই। তারা শুধু তাদের রক্ষাকারী সাম্প্রদায়িক নেতা বা গোষ্ঠীর কাছেই জবাবদিহি করে।

সরকারি অবহেলা ও দুর্নীতির তদন্তে লেবাননের অতীত রেকর্ড বলছে, এই ট্র্যাজেডিতে অবদান রাখা দেশটির সর্বোচ্চ পর্যায়ের অনেকেই কখনও বিচারের মুখোমুখি হবেন না। এটা বড় সমস্যা, কারণ এর ফলে সরকারের ওপর জনসাধারণের আস্থা কমে যায়। সাম্প্রতিক বিস্ফোরণটি লেবাননের দীর্ঘদিন ধরে চাপে থাকা অর্থনীতি, ভঙ্গুর রাজনৈতিক অবস্থা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানেও মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে।

লেবাননের সরকার গৃহহীন হয়ে পড়া তিন লাখ মানুষের আশ্রয় এবং মৌলিক চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় নগদ সহায়তা দিতে সক্ষম কি না তা এখনও পরিষ্কার নয়। তবে বিস্ফোরণ-পরবর্তী সময়ে তারা পুনরুদ্ধার ও পুনর্নির্মাণের জন্য বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ এবং বিদেশি ঋণ বাড়াতে বাধ্য হবে, যার ফলে লেবাননের সরকার বিদেশি সহায়তার ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে উঠবে এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে তাদের সমঝোতার অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলস্বরূপ, বৈদেশিক নীতি সম্পর্কিত দেশটির বিদ্যমান বিভাজনগুলো আরও প্রকট হবে।

যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স ও ইরান ইতোমধ্যেই সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে, আবার লেবাননের কিছু লোক চীনকে বৈরুত বন্দর পুনর্নির্মাণে আমন্ত্রণ জানাতে অতিউৎসাহী হয়ে উঠেছে। বিস্ফোরণে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ও জনগণের ক্ষোভ এবং দেশটিতে বিদেশি শক্তির ক্রমবর্ধমান সম্পৃক্ততা লেবাননের সরকারকে আরও দুর্বল করে দেবে এবং বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক উত্তেজনার আগুন উসকে দেবে। প্রধানমন্ত্রী হাসান দিয়াব এবং তার সমর্থকরা সম্ভবত বিস্ফোরণের ঘটনাটিকে দেশটিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সাদ হারিরির প্রভাব কমাতে ব্যবহার করবেন। জবাবে হরিরি লেবানিজ সরকার এবং প্রেসিডেন্টবিরোধী প্রচারণা চালাতে ড্রুজ নেতা ওয়ালিদ জুম্বল্যাটের সঙ্গে জোটবদ্ধ হতে পারেন। আর লেবাননের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার আরেক প্রধান খেলোয়াড় হিজবুল্লাহ দেশটিতে তাদের প্রভাব বজায় রাখতে এই উত্তেজনা ধরে রাখার চেষ্টা করবে।

নিঃসন্দেহে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে লেবানিজ জনগণের এখন সর্বোচ্চ সহায়তা প্রয়োজন। তবে এই ট্র্যাজেডির জন্য প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দায়ী দেশটির অভিজাত শ্রেণিকে নিজেদের বাঁচাতে আন্তর্জাতিক সাহায্যকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে দেয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত বৈরুতের বিস্ফোরণকে একমাত্র মানবিক সংকট হিসেবে দেখা।

এই দুর্ঘটনা ও অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়ে ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন না তুলে লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সহায়তার প্রস্তাব দেয়া দেশটির জনগণকে সাহায্য নয়, বরং ক্ষতির কারণ হবে। এটি দুর্নীতিগ্রস্ত অভিজাতদের জবাবদিহিতা এড়ানো, দায়িত্ব বদলানো এবং দেশটির যে কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজন তা বাস্তবায়ন এড়ানোর আরও একটি সুযোগ করে দেবে।

এ কারণে যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় লেবাননকে সত্যিই সাহায্য করতে চায় তবে শুধু সহায়তা পাঠানো এবং সমর্থন দেয়া উচিত নয়, ৪ আগস্ট বৈরুতে আসলে কী ঘটেছিল তা-ও স্বীকার করতে হবে: অবহেলা, অক্ষমতা ও দুর্নীতির মধ্য দিয়ে একটি ব্যর্থ হতে চলা রাষ্ট্র নিজের রাজধানী ধ্বংস করে দিয়েছে এবং নিজস্ব নাগরিকদের হত্যা করেছে।

লেখক: জো ম্যাকারন, আরব সেন্টার ওয়াশিংটন ডিসির ফেলো
(আল জাজিরায় প্রকাশিত মতামত থেকে অনূদিত)

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here