পরীক্ষা কমায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে দেশে ঘোলাটে অবস্থা

 

ছালেহ আহাম্মদ (বাবুল)

0
36

দেশে করোনার সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে একধরনের ঘোলাটে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে যেখানে বেশি পরীক্ষার ব্যাপারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে আসছেন। সেখানে উল্টো পথ ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। ল্যাবরেটরির সংখ্যা বাড়লেও হঠাৎ করেই নমুনা পরীক্ষা অনেক কমে গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার প্রভাবেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠেছে।
বৈশ্বিক মহামারী করোনা দেশে প্রথম শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। শুরু থেকেই সরকারের রোগতত্ত¡, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) করোনা পরীক্ষা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। ওই সময় আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) সহ একাধিক প্রতিষ্ঠান করোনা পরীক্ষায় আগ্রহ দেখালেও তাতে অনুমতি দেওয়া হয়নি। নানা টালবাহানায় সময় ক্ষেপন করা হয়েছে। এরই মধ্যে করোনা সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিলে পরীক্ষার আওতা বাড়ানো হয়। এ সুযোগে প্যাডসর্বস্ব জেকেজি হেলথ কেয়ার এবং রিজেন্ট হাসপাতালের মতো দু’নম্বরী প্রতিষ্ঠান পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহের অনুমতি পায়।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্য মতে, মার্চের শুরুতে একমাত্র পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল আইইডিসিআর। ৩১ মার্চ পর্যন্ত পিসিআর ল্যাবরেটরি বেড়ে দাঁড়ায় ৬টিতে এবং ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় দেড় শ’। এপ্রিল মাসের শুরুতে দুই শ’ থেকে আড়াইশ নমুনা পরীক্ষা হলেও মাসের শেষ দিকে পিসিআর ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৮টিতে। তখন ল্যাবগুলোয় ২৪ ঘণ্টায় ৫ হাজারের কাছাকাছি নমুনা পরীক্ষা হয়। এরপর গত ১ মে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৩১টি এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল সাড়ে ৫ হাজারের নমুনা। একই মাসের ৩১ তারিখে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫২টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় পরীক্ষা হয়েছিল প্রায় ১২ হাজার নমুনা। এরপর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে নমুনা পরীক্ষা বেড়ে প্রায় ১৪ হাজারে পৌঁছে। জুন মাসের শেষ দিকে ল্যাবের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৬৮টিতে এবং ২৪ ঘণ্টায় নমুনা পরীক্ষা হতো ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি। জুলাই মাসের প্রথম দুই দিনেও ১৭ থেকে ১৮ হাজারের বেশি নমুনা পরীক্ষা হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সারা দেশে করোনা উপসর্গের রোগীর সাথে ল্যাবরেটরির সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭টিতে। তবে রোগী ও ল্যাবরেটরি বাড়লেও হঠাৎ করেই নমুনা পরীক্ষা আগের থেকে অনেক কমে গেছে। গত ৩ জুলাই থেকে পরবর্তী পাঁচ দিন ল্যাবগুলোয় নমুনা পরীক্ষা হয়েছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার। এরই মধ্যে নতুন দু’টি ল্যাব যুক্ত হলেও গত দুই দিন আবার নমুনা ১৫ হাজারের ঘরে। উল্লিখিত ল্যাবে দিনে গড়ে ৩০ হাজারেরও বেশি পরীক্ষার সুযোগ থাকলেও অজানা কারণে তা হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
গতকাল নিয়মিত বুলেটিনে অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা জানান, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় (শুক্রবার দুপুর ১২টা থেকে শনিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত) নমুনা সংগ্রহ হয়েছে ১১ হাজার ৪৭৫টি। পরীক্ষা করা হয়েছে ১১ হাজার ১৯৩টি। এসব পরীক্ষায় নতুন করে ২ হাজার ৬৮৬ জনের মধ্যে কভিড-১৯ শনাক্ত হয়েছে। এ নিয়ে দেশে মোট নমুনা পরীক্ষা করা হলো নয় লাখ ২৯ হাজার ৪৬৫টি। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত্যুবরণ করেছেন আরও ৩০ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছেন ২ হাজার ৩০৫ জন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে করোনা শনাক্তে নতুন নতুন আরটি-পিসিআর ল্যাবরেটরি স্থাপন করা হচ্ছে। ল্যাবরেটরি বাড়ার সাথে সাথে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে উল্টোটা। নতুন ল্যাব সংযোজনের সাথে সাথে কমে যাচ্ছে নমুনা পরীক্ষার সংখ্যাও। এতে করোনা পরীক্ষা করতে আসা মানুষের দুর্ভোগ চরম আকারে বাড়ছে। রাজধানীর পাশাপাশি বাইরের বিভিন্ন জেলার মানুষও এই দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। উপসর্গ ছাড়া পরীক্ষা না করা, আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে থাকা লোকজনকে পরীক্ষার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির নেগেটিভ জানতে দ্বিতীয়বার পরীক্ষা না করা এমন বেশকিছু শর্ত আরোপের কারণে নমুনা সংগ্রহের পরিমাণও কমে গেছে। এ ছাড়া পরীক্ষা করাতে যে দুর্ভোগ, সে কারণেও মানুষের মধ্যে পরীক্ষার ব্যাপারে অনাগ্রহ দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গত ১ জুলাই থেকে পরীক্ষার জন্য সরকার ফি নির্ধারণ করায় গত ৯ দিনে কমপক্ষে ২০-২৫ শতাংশ নমুনা কম সংগ্রহ হচ্ছে বলে বিভিন্ন ল্যাব র্কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। ফলে দেশের সন্দেহজনক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশই পরীক্ষার বাইরে থেকে যাচ্ছে। আর আক্রান্ত বা উপসর্গের রোগীরা যথাসময়ে পরীক্ষা করতে না পারায় স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। সেজন্য করোনা টেস্টের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা আরো বাড়াতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণের গতি অনুযায়ী বর্তমানে প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা উচিত। সবচেয়ে কম সক্ষমতার হিসাবে ধরলেও এখনো এসব ল্যাবের ৩৫ শতাংশ সক্ষমতাই কাজে লাগানো যাচ্ছে না। অথচ এসব ল্যাবে বর্তমান লোকবল দিয়েই কমপক্ষে প্রতিদিন ২৭ হাজার নমুনা পরীক্ষা করা সম্ভব। এদিকে করোনা মোকাবিলায় গঠিত সরকারের জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির হিসাবে প্রতিদিন অন্ততপক্ষে ২০ হাজার পরীক্ষা করানোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এ কমিটিও পরীক্ষা বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন।
ল্যাব বাড়ার সাথে সাথে নমুনা পরীক্ষা কেন কমে যাচ্ছে জানতে চাইলে আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা: এ এস এম আলমগীর হোসেন বলেন, নমুনা সংগ্রহ কম হওয়ায় পরীক্ষার সংখ্যা কমছে। প্রথম পরীক্ষায় যাদের করোনা পজিটিভ হয়েছিল তাদের দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা করে নেগেটিভ হয়েছে কি না দেখা হতো। এখন সেটি বন্ধ হয়ে গেছে। আগে বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করাকালে একজন পজিটিভ হলে সেই পরিবারের অনেকে নমুনা দিতো। এখন প্রতিজনের নমুনা পরীক্ষার ফি ২০০ টাকা লাগে বিধায় অনেকে অপ্রয়োজনে নমুনাও দিচ্ছেন না। এ ছাড়া দেশের কিছু এলাকায় বন্যা দেখা দেয়ায় সেখানে নমুনা সংগ্রহ করা কম হচ্ছে। এসব কারণেও নমুনা সংগ্রহ কমছে।
এ বিষয়ে ঢাকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারেল সেন্টারের পরিচালক অধ্যাপক ডা. একেএম শামসুজ্জামান বলেন, অবশ্যই পরীক্ষা বাড়ানো উচিত। এটা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা। টেস্ট বাড়াতে হবে। শনাক্ত সংখ্যা বাড়াতে হবে। যত বেশি শনাক্ত হবে তাদের আইসোলেশন করে দিতে হবে; যাতে পুনরায় সংক্রমণ বাড়তে না পারে। তারপরও আমি বলব, আমাদের পরীক্ষা বাড়ানো প্রয়োজন। তবে নমুনা সংগ্রহ বাড়ানোর পাশাপাশি নমুনা পরীক্ষার যে সব সুযোগ-সুবিধা, সেটাও আমাদের দেশে সংগতিপূর্ণভাবে বাড়ানো প্রয়োজন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, গত তিন মাসে আট লাখের মতো টেস্টিং কিট আমদানি করা হয়েছে। তবে কিটের মজুদ খুব দ্রæতই শেষ হয়ে যাচ্ছে। সে কারণেই কয়েকটি ল্যাবে কিটের সরবরাহ বন্ধ আছে। আর ল্যাবগুলোতে পরীক্ষার সংখ্যা কমিয়ে দিতে বলা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর এ সমস্যা সমাধানে একটি মানসম্মত কর্মপদ্ধতি তৈরি করতে এবং কিটের মজুদ বাড়াতে কাজ করছে।
অবশ্য স্বাস্থ্য অধিদফতরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বারবার বলছেন, কিটের কোনো অভাব নেই এবং পরীক্ষাগারগুলোতে প্রয়োজনীয়সংখ্যক কিট সরবরাহ করা হচ্ছে।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here