পুলিশের দায়িত্ব ও সমাজের দায়

0
13

নাছিমা বেগম

যে কোনো সভ্য সমাজ ধর্ষণের ঘটনায় লজ্জিত ও শঙ্কিত হয়। সেখানে সবার একাট্টা হয়ে ধর্ষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্ষকের পরিচয় একটাই, সে ধর্ষক। সে কোন দলের অনুসারী সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়; গুরুত্বপূর্ণ হলো ধর্ষক যেই হোক না কেন তাকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা। ধর্ষকদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ দরকার। পুলিশকে এখানে সবচেয়ে বেশি আন্তরিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

আমরা অনেক সময় লক্ষ্য করি, যেসব ঘটনায় জনতার রোষ দানা বেঁধে ওঠে, জনরোষে দেশ উত্তাল হয়, যখন সরকার থেকে স্পষ্ট উচ্চারণ করা হয় ধর্ষক যেই হোক তাকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কঠোর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে; তখন পুলিশের তৎপরতা বাড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশ তাৎক্ষণিক কার্যব্যবস্থা গ্রহণ করে। ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেপ্তার করতে সমর্থ হয়। উদাহরণস্বরূপ সিলেটের এমসি কলেজ হোস্টেলের সামনে স্ত্রীকে ছিনিয়ে নিয়ে স্বামীকে বেঁধে রেখে ধর্ষণের ঘটনা এখানে উল্লেখ করছি। পুলিশের ৯৯৯ নম্বরে ফোন কল পেয়ে পুলিশ তাৎক্ষণিক ভিকটিমকে উদ্ধার করে সিলেট মেডিকেলের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করে। ধর্ষিতার স্বামী ৬ আসামির নাম উল্লেখ করে থানায় মামলা দায়ের করলে থানা সঙ্গে সঙ্গে ‘এফআইআর’ করে। ভিকটিম উদ্ধারসহ মামলা দায়েরের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের জন্য পুলিশ প্রশংসা পাওয়ার দাবিদার। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এরকম একটি ঘটনায় পুলিশ ঘটনার রাতেই এমসি কলেজ হোস্টেলে কেন অভিযান চালিয়ে আসামি গ্রেপ্তারের চেষ্টা করল না?

ধর্ষণের মতো স্পর্শকাতর মামলার ক্ষেত্রে পুলিশের তাৎক্ষণিক দায়িত্ব হলো ভিকটিমকে উদ্ধার করে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং আসামিকে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা। এটাই তাদের প্রাত্যহিক কাজ ও আইনের বিধান। সে অনুযায়ী কাজ সম্পাদন না করে কখনও কখনও কিছু সংখ্যক পুলিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনার জন্য অপেক্ষা করে। এতে মামলা তদন্তের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। যে কারণে পুলিশের সত্যিকার অর্থেই ভাবমূর্তি বিনষ্ট হয়। পুলিশ বাহিনীর অর্জিত অনেক সাফল্য ম্লান হয়ে যায়। গোটা বাহিনীকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়। পুলিশের আচরণে পরিবর্তন আনতে হবে। তাদের প্রকৃত অর্থেই জনতার পুলিশ হতে হবে। পুলিশের অনেক বড় বড় কর্মকর্তাকে দেখা গেছে যারা সততার সঙ্গে, অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন। সাধারণ মানুষ এখনও তাদের সততার জন্য স্মরণ করে, শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে। তাদের হয়তো জৌলুস নেই কিন্তু আছে আত্ম অহঙ্কার; যার মর্যাদা অনেক ওপরে।

ফেনীর সোনাগাজীর নুসরাতকে যৌন নিপীড়ন ও তার শরীরে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে নারী নিপীড়নকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি এবং স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন। প্রতিটি ঘটনায় নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। ভিকটিমের পরিবারের প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছেন। আশ্বস্ত করেছেন ন্যায়বিচার দেওয়ার। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষকের প্রতি কোনো ধরনের সহমর্মিতা নয়। ধর্ষণ সমাজের চোখে ঘৃণ্যতম অপরাধ। ধর্ষকের কোনো ক্ষমা নেই। অপরাধী যেই হোক তাকে শাস্তি পেতেই হবে।

ধর্ষকের মৃত্যুদণ্ডের দাবিতে জনআন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন জনগণের অব্যাহত দাবির মুখে সরকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী এনে ধর্ষকের শাস্তি যাবজ্জীবনের পরিবর্তে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে ১২ অক্টোবর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা ৭টি সংশোধনী সংসদ অধিবেশন চলমান না থাকায় গত ১৩ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি অধ্যাদেশ জারি করেন। মৃত্যুদণ্ড নিয়ে বিভিন্নমুখী প্রতিক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও ধারণা করা হয়েছিল, সমাজে নারী নির্যাতন বা ধর্ষণ কমবে। কারণ, অ্যাসিড সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড আরোপের বিধান পাস করার পর অ্যাসিড সন্ত্রাস অনেকাংশে কমে গিয়েছিল।

মৃত্যুদণ্ড জারির পরপরই ১৫ অক্টোবর টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলায় এক মাদ্রাসা শিক্ষার্থীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের মামলায় পাঁচজনকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন টাঙ্গাইলের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক। রায়ে প্রত্যেককে এক লাখ টাকা করে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়। ধারণা করা যায়, মৃত্যুদণ্ড আরোপের বিধান পাস করার সঙ্গে সঙ্গেই মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করার এই রায় ধর্ষকদের জন্য একটি বার্তা নিয়ে আসবে। মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির ভয়ে এ ধরনের ঘৃণ্যতম কাজ থেকে হয়তোবা তারা বিরত থাকবে। দেখা গেল তা হয়নি। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যায়, নারী ও শিশু ধর্ষণের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২০-এর ৩২ক সংযোজন মৃত্যুদণ্ডাদেশ আরোপের চেয়েও গুরুতত্বপূর্ণ বলে মনে করি। এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২-এর অধীন মেডিকেল পরীক্ষা ছাড়াও, ওই ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ডিএনএ আইন, ২০১৪-এর বিধান অনুযায়ী ডিএনএ পরীক্ষা করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এর ফলে ধর্ষণের শিকার নারীর শরীরে থাকা আলামত কোনো কারণে তা সংরক্ষণ করা না গেলে ঘটনার সময় পরিধেয় পোশাক থেকে ডিএনএ সংগ্রহ করে আসামির ডিএনএ ম্যাচ করলেই আসামি শনাক্ত করা সহজ হয়ে যাবে। তদন্তের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হবে না। মামলা বিচারের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত দেওয়া সহজ হবে।

সম্প্রতি বাগেরহাটের মোংলায় পিতৃহীন সাত বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় অভিযোগ গঠন ও সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে রায় দিয়েছেন আদালত। ফৌজদারি কার্য ব্যবস্থায় এটাই সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে প্রদত্ত রায়।

এখানে উল্লেখ্য, ওই বিচার কাজে পুলিশ যেমন অতি সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে তদন্ত কাজ সম্পন্নের পর চার্জশিট দিয়েছেন, তেমনি বিচারকও অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত সময়ের মধ্যে পুরো বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন যেটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

অনুরূপভাবে প্রতিটি মামলায় পুলিশের তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যথাসম্ভব দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হলে ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে। অপরাধের সঙ্গে জড়িত হওয়ার আগেই সবাই সতর্ক থাকবেন বলে আশা করা যায়।

অবশ্য একটি কথা না বললেই নয়। নীতি-নৈতিকতা রাতারাতি তৈরি হয় না। পরিবার থেকেই গোড়াপত্তন হয়। মা-বাবার একটি বড় দায়িত্ব হলো সন্তানদের মানুষ করা। এ জন্য লক্ষ্য করা যায়, যেসব পরিবারে মূল্যবোধের চর্চা হয়, তাদের সামনে লোভনীয় যে কোনো প্রস্তাব বা অনৈতিক কোনো কিছুই তারা গ্রহণ করেন না। একজন মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ তৈরির ক্ষেত্রে পরিবার, সমাজ ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ধর্ষকদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি।

চেয়ারম্যান, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here