বদলির পরও ছাড়েননি স্বাস্থ্যের দুই ধাপ নিচের ‘লোভনীয়’ পদ

স্বাস্থ্য খাতের বিভিন্ন দফতর-অধিদফতর ও সংস্থার পদগুলোকে লোভনীয় মনে করা হয়। তাই এসব প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ পেতে চলে জোর তদবির। এখানে একবার পদায়ন করা হলে কেউ আর বদলি হতে চান না।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, মূলত দুর্নীতির মাধ্যমে অঢেল সম্পদ অর্জনের সুযোগের কারণে স্বাস্থ্য খাতের দফতর-সংস্থায় পদগুলোর এত কদর। সম্প্রতি উন্মোচিত স্বাস্থ্য খাতের সংস্থাগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দুর্নীতির চিত্র এই ধারণাকেই জোরালোভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, আরও যারা এ রকম আছে তাদের ব্যাপারেও প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আরও এ রকম আছে, আরও আসবে

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিচালক (প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অতিরিক্ত সচিব হেমায়েত হোসেন। তাকে দেড় মাস আগে বদলি করা হলেও তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পদ ছাড়েননি।

অতিরিক্ত সচিব হেমায়েত হোসেন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে সংযুক্ত হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরে দায়িত্ব পালন করছেন। পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পরিচালক পদটি উপসচিব সমমর্যাদার। সেখানে অতিরিক্ত সচিব হয়েও দুই ধাপ নিচের পদে কাজ করছেন হেমায়েত হোসেন।

গত ৬ আগস্ট হেমায়েত হোসেনকে স্থানীয় সরকার বিভাগের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের রেজিস্ট্রার জেনারেল পদে বদলি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে আদেশ জারি করা হয়। অতিরিক্ত সচিবরাই এই পদে দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু হেমায়েত হোসেন সেই পদে যোগ দেননি। চেষ্টা-তদবির করে তিনি পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরেই থেকে গেছেন।

গত ১৭ সেপ্টেম্বর ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ শাহজাহানকে জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের রেজিস্ট্রার জেনারেল নিয়োগ দিয়ে আরেকটি আদেশ জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতর থেকে জানা গেছে, পরিবার কল্যাণ পরিদর্শিকা পদে নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এই নিয়োগের বিভাগীয় নির্বাচন কমিটির সভাপতি হলেন হলেন হেমায়েত হোসেন। গত ১০ সেপ্টেম্বর মৌখিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে। এতে ৩৯৫ জনকে নির্বাচিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, এই নিয়োগকে কেন্দ্র করে বড় অংকের লেনদেন হয়েছে। এরসঙ্গে জড়িত হেমায়েত হোসেন। মূলত এই কারণেই তিনি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের রেজিস্ট্রার জেনারেল পদে যোগ দেননি।

এ বিষয়ে কথা বলতে সোমবার হেমায়েত হোসেনকে অসংখ্যবার ফোন দেয়া হলেও তিনি ধরেননি।

সম্প্রতি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন স্বাস্থ্য অধিদফতরের গাড়িচালক আবদুল মালেক, যিনি স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক এনায়েত হোসেনের গাড়ি চালাতেন।

তৃতীয় শ্রেণির এই কর্মচারী ব্যবহার করতেন ডিজির জন্য বরাদ্দ করা পাজেরো গাড়ি। এখানেই শেষ নয়, রাজধানীর তুরাগে গাড়িচালক আবদুল মালেকের রয়েছে ২৪টি ফ্ল্যাটবিশিষ্ট সাত তলার দুটি বিলাসবহুল বাড়ি। একই এলাকায় ১২ কাঠার প্লট। এছাড়া হাতিরপুলে ১০তলা ভবনের নির্মাণকাজ চলছে। ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে বিপুল অংকের অর্থ।

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রশাসনকে জিম্মি করে চিকিৎসকদের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতেন। চিকিৎসকদের বদলি-পদোন্নতিতেও ছিল তার হাত। নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতিতে তদবিরের নামে-বেনামে আদায় করেছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। যার বদৌলতে অল্প দিনেই শতকোটি টাকার বেশি অর্থ-সম্পদের মালিক এই মালেক ড্রাইভার।

অপরদিকে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে স্বাস্থ্য খাতের ১২ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সম্পদ বিবরণী দাখিলের নির্দেশ দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

এর আগে ধরা পড়েছিলেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিকেল এডুকেশন শাখার হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা (বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত) মো. আবজাল হোসেন। তারও বিপুল অর্থ-বৈভবের খোঁজ পাওয়া গেছে।

সোমবার স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান বলেন, ‘আমাদের যে নিয়ম আছে তাতে তার ছাড় পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। শুধু তাই নয়, আরও যারা এ রকম আছে তাদের ব্যাপারও প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে। আরও এ রকম আছে, আরও আসবে।’

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here