বাঙালির গুজব প্রেম এবং গোয়েবেলসের প্রোপাগান্ডা তত্ত্ব

ফজলে রাব্বী খান

0
24

হিটলারের প্রোপাগান্ডা মন্ত্রী জোসেফ গোয়েবেলস ২য় বিশ্বযুদ্ধ কালীন সময়ে প্রোপাগান্ডাকে ‘বিজ্ঞান ও শিল্পের’ পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। গোয়েবেলসর তত্ত্ব অনুযায়ী কোনো মিথ্যাকে বারবার প্রচার করলে জনগণ সেটিকেই সত্য হিসেবে মনে করে। গোয়েবেলস অনবরত প্রপাগান্ডার মাধ্যমে জার্মান শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং নাগরিকদের মনোজগতের গন্ডিতেও নিয়ন্ত্রণ স্থাপনে সক্ষম হন। গোয়েবেলসের প্রোপাগান্ডা যুদ্ধকালে জয়-পরাজয়ের ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলত, ব্রিটিশ সরকারকে রীতিমতো বেগ পেতে হয়েছিল গোয়েবেলসের প্রোপাগান্ডা মোকাবিলা করতে।

যুদ্ধ শেষ হলেও পৃথিবীতে প্রোপাগান্ডার ব্যবহার শেষ হয়নি, বরং সময়ের সঙ্গে প্রোপাগান্ডা হয়ে উঠেছে আরো আধুনিক এবং প্রযুক্তিনির্ভর। বর্তমান সময়ের ফেক নিউজ, এমবেডেড জার্নালিজম, ইয়োলো জার্নালিজম—এগুলো সবই প্রোপাগান্ডা পরিবারেরই সদস্য। বলা যেতে পারে প্রোপাগান্ডার মাসতুত ভাই। প্রোপাগান্ডা পরিবারে যে আরেক সদস্য সদূর জার্মান থেকে বঙ্গভূমিতে এসে অভিযোজিত হয়েছে তার নাম ‘গুজব’। এই গুজব আমাদের অনেক প্রিয়, সুযোগ পেলেই আমরা হুজুগে হুজুগে নতুন নতুন গুজবে মেতে উঠি। তাই গুণীজনেরা আমাদের নাম দিয়েছিলেন ‘হুজুগে বাঙালি’। এই নামের সার্থকতা আমরা প্রতি বছরেই অন্তত কয়েকবার প্রমাণ করে থাকি।

পৌরাণিক সময় থেকেই গুজবি প্রোপাগান্ডার অস্তিত্ব পাওয়া যায়। কূটকৌশলের পুরোধা, চাণক্য (৩৭১-২৮৩ খ্রি. পূর্ব) তার অর্থশাস্ত্রে রাজ্য নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রোপাগান্ডা বা উদ্দেশ্যপূর্ণ প্রচারের কথা গুরুত্বসহকারে উল্লেখ করেছেন। গুজবের কারণে পৃথিবীতে রক্তক্ষরণও কম হয়নি। গুজবকে কেন্দ্র করে প্রথম গণহত্যার তথ্য পাওয়া যায় ফ্রান্সে। ১৩২১ সালে এরকম একটি ধর্মীয় গুজবকে কেন্দ্র করে ফ্রান্সের খ্রিস্টানরা প্রায় পাঁচ হাজার ইহুদিকে হত্যা করে।

আমাদের দেশেও প্রতি বছর গুজবের খাতায় নতুন নতুন গুজবের নাম যুক্ত হয়। হারপিক দিয়ে ডেঙ্গু নিধন, ভুয়া নোট, পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথার প্রয়োজনীয়তা, ছেলেধরা, মটরযান আইন, লবণের কেজি দেড় শ টাকা—এরকম অভিনব সব গুজবের সঙ্গে আমরা মাঝে-মাঝেই পরিচিত হই। এ দেশে গুজবের কারণে দাঙ্গা-হাঙ্গামার ঘটনা নতুন কিছু নয়। নাসিরনগর, রামু বা ভোলায় রক্তপাতের পেছনেও গুজবের ভূমিকা ছিল।

আমাদের দেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এধরনের গুজবভিত্তিক কিছু ঘটনা কন্সপিরিসি থিওরি দিয়ে ব্যাখ্যা করলে বিশেষ কিছু সত্য উপলব্ধি হয়। কেথরিন কে ইয়াংয়ের বর্ণনা মতে, ‘প্রত্যেকটি প্রকৃত ষড়যন্ত্রের চারটি বৈশিষ্ট্য থাকে—প্রথমত ষড়যন্ত্র কোনো দলবদ্ধ ব্যক্তিদের দ্বারা সংঘটিত হয়, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির দ্বারা নয়। দ্বিতীয়ত, সমাজের সার্বিক উপকারে আসে এমন কোনো উদ্দেশ্যে নয় বরং অশুভ এবং বেআইনি উদ্দেশ্যে ষড়যন্ত্র সংঘটিত হয়। তৃতীয়ত, ঘটনাগুলো হয় খুব গোছালো ধরনের, বিচ্ছিন্ন এবং স্বতঃস্ফূর্ত নয়। চতুর্থত, পুরো প্রক্রিয়া চলে সর্বসাধারণের দৃষ্টির অগোচরে।’

গুজবের স্রোতে কখনো কখনো আমরা সত্য ঘটনাকেও গুজব বলে চালিয়ে দেই। এ বছর ডেঙ্গু মহামারি আকার ধারণ করলেও প্রথম দিকে সেটাকেও গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে ভুগতে হয় অনেকেই। গুজবে লাভবান হয় কোনো বিশেষ শ্রেণি, আর খেসারত দেয় সাধারণ মানুষ। বাঙালির গুজব প্রেম, সেই বিশেষ শ্রেণির উদ্দেশ্য বাস্তবায়নকে আরো সহজ করে দিয়েছে। সাইবার দুনিয়ার এই যুগে না জেনেই কোনো তথ্য বিশ্বাস করা বা অনলাইনে ছড়িয়ে দেওয়া থেকে বিরত থাকা অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় আপনি নিজের অজান্তেই প্রোপাগান্ডা সিন্ডিকেটের ‘গুজব প্রচার’ হাতিয়ারে পরিণত হতে পারেন। ফলে সমাজে নেমে আসবে নিত্যনতুন অভিনব সব সংকট।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here