ভুয়া বিলে ৬০ লাখ টাকা উত্তোলন

*  ১৭ প্রকল্পে ৩০০ কোটি টাকার কাজ করছে অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান
* অনুসরণ করা হয়নি অনুমোদিত নকশা
* কাজ পায় এক প্রতিষ্ঠান, বাস্তবায়নে অন্য প্রতিষ্ঠান
* ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানেনই না কাজ পেয়েছেন

কুমিল্লা ও চাঁদপুরে তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। এরমধ্যে একটি প্রকল্পে ভুয়া বিলে প্রায় ৬০ লাখ টাকা তুলে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। তিনটি প্রকল্পেই নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে।

এমনকি কোনো প্রকল্পেই নকশা অনুযায়ী কাজ হয়নি। এসব প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে সাহারা এন্টারপ্রাইজ। অথচ প্রকল্প তিনটির কাজ এই প্রতিষ্ঠান পায়নি। অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ বাগিয়ে নিয়ে তারা কাজ করছে। শুধু এই তিনটি প্রকল্পেই নয়, সাহারা এন্টারপ্রাইজ অন্য তিনটি প্রতিষ্ঠানের নামে যৌথভাবে (জয়েন্ট ভেঞ্চার-জেভি) কাজ বাস্তবায়ন করছে।

তিন বছরে তারা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এইচইডি) ১৭টি প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার কাজ করছে। বড় কাজের অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে কাজের মান নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠছে। দায়সারাভাবে কাজ করে বেশি বিল তুলে নিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এইচইডির দুটি পৃথক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯ সালের শেষের দিকে কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। তিতাস ও বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে যৌথভাবে কাজ পায় কবির ট্রেডার্স-ম্যাক কনস্ট্রাকশন।

হাইমচর উপজেলার কাজ পায় ম্যাক কনস্ট্রাকশন-ঢালী কনস্ট্রাকশন (জেবি)। অথচ কাজগুলো বাস্তবায়ন করে সাহারা এন্টারপ্রাইজ নামে অন্য একটি প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে এইচইডির সার্কেল-৬ সিলেটের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার আলী তদন্ত করেন। গত বছরের ১ অক্টোবর তিনি প্রতিবেদন দাখিল করেন।

আনোয়ার আলীর প্রতিবেদনের পর এ ঘটনায় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে এইচইডি। কমিটির প্রধান করা হয় সার্কেল-৬ সিলেটের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আবুল খয়রাত মো. বদরুল ইসলামকে।

কমিটির অন্য দুজন সদস্য হলেন: এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (ডিজাইন) রিজিয়া সুলতানা এবং এইচইডি সিলেট বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুর রহমান। এই কমিটি ২০২০ সালের ১৭ নভেম্বর প্রতিবেদন দাখিল করেন। দুটি তদন্তেই তিন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির তথ্য উঠে আসে। দুটি তদন্তের পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

এ বিষয়ে এইচইডির অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. আবদুল হামিদ বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেভাবে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, সেভাবে নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে তিনি আর কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

প্রথম প্রতিবেদনের বিষয়ে প্রকৌশলী আনোয়ার আলী বলেন, আমি যেসব অনিয়ম পেয়েছি, সেগুলো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। এর বাইরে আমার কোনো বক্তব্য নেই।

তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটির সদস্য এইচইডির প্রধান কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (ডিজাইন) রিজিয়া সুলতানা বলেন, আমরা তদন্তে যতটুকু জানতে পেরেছি, তা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছি। প্রতিবেদনে যেসব বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে এগুলো সঠিক।

প্রকৌশলী আনোয়ার আলী তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, জাইকা অর্থায়নে বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নীতকরণ কাজটি করা হয়। গত বছরের ২৩ জুন তিনি বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উন্নীতকরণ কাজ পরিদর্শনে গিয়ে দেখেন, ওপিডি ভবনের ‘রাফট ফাউন্ডেশনের ঢালাই’ চলছে। তিনি দেখেন, ঢালাইয়ের পুরুত্ব ৩০ ইঞ্চির স্থলে মাত্র ২২ ইঞ্চি করা হচ্ছে। বটম ও টপ রডের মধ্যবর্তী চেয়ার বাঁকিয়ে উপরের লেয়ারের রড প্রায় ৭ ইঞ্চি নিচে নামিয়ে ফেলা হয়েছে।

এসব কাজের সব বিল ঠিকাদার নিজে প্রস্তুত করে প্রভাব খাটিয়ে তুলে নেন। তাদের দাখিল করা বিলে গরমিল পাওয়ার পর একজন উপসহকারী প্রকৌশলী বিলে স্বাক্ষর করতে রাজি হচ্ছিলেন না। বদলির হুমকি দিয়ে বিলের কাগজে স্বাক্ষর করায় ঠিকাদার। ফাউন্ডেশনে ১৩ ধরনের কাজে খরচ হওয়ার কথা প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অথচ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ১৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ ভুয়া বিলে উত্তোলন হয়েছে ৫৯ লাখ টাকা (প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা)

এছাড়া এইচইডির তিন সদস্যের তদন্তে বেরিয়ে আসে, বরুড়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শনের সময় একটি স্থানে গর্ত করে ‘রাফট ফাউন্ডেশন’ পরীক্ষা করেন। সেখানে দেখা যায়, ৩০ ইঞ্চি ঢালাইয়ের স্থলে ২৭ ইঞ্চি পাওয়া যায়। এটি অনুমোদিত নকশার চেয়ে কম।

তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিম্নমানের সরঞ্জামাদি : তিতাস উপজেলা কমপ্লেক্সে নির্মাণে ফাউন্ডেশনের ঢালাইয়ে নিম্নমানের সরঞ্জামাদি ব্যবহার করা হয়েছে। এমনকি ঠিকাদার বৈদ্যুতিক মালামালের নমুনা অনুমোদন না নিয়ে নিম্নমানের মালামাল দিয়ে কাজটি করেন। এসব বিষয় পরিদর্শনের সময় একাধিক প্রকৌশলী দেখার পর সাইট পরিদর্শন বইতে উল্লেখ করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তারা সাইট অর্ডার বই খুঁজে পাননি। উল্লিখিত দুটি তদন্ত প্রতিবেদনেই এসব তথ্যের সত্যতা মিলেছে।

আনোয়ার আলী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, তিতাস উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স উন্নীতকরণ কাজটি ২০১৮ সালের ৩ জুলাই শুরু হয়। এই প্রকল্পে পাঁচতলা ভিত্তির উপর চারতলা ওপিডি ভবন নির্মাণ কাজটি অন্যতম। ওপিডি ভবনটি ৪৫ ফুট লম্বা প্রি-কাস্ট পাইল ফাউন্ডেশনের উপর নির্মাণের জন্য প্রধান কার্যালয় থেকে নকশা দেওয়া হয়। নকশা পাওয়ার পর ঠিকাদার টেস্ট পাইল ও সার্ভিস পাইল একই সঙ্গে ঢালাই করে।

পরিদর্শনের দিন দেখা যায়, ১৫০টি প্রি-কাস্ট পাইল ঢালাই করা হয়েছে। এমনকি পাইল টেস্টের জন্য হেমার দিয়ে ২টি পাইল ড্রাইভের সময় ৯ ফুট মাটির নিচে যাওয়ার পর পাইল দুটি ভেঙে যায়। মূলত নিম্নমানের ঢালাইয়ের কারণে পাইল দুটি ভেঙে যায়। নিম্নমানের ঢালাইয়ের কারণে ভবিষ্যতে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করা হলে ‘গ্রাভিটি লোড’ নিতে পারবে কি না, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর মতামত নেওয়া যেতে পারে।

পরের তিন সদস্যের তদন্ত কমিটিও বলেছে, প্রিকাস্ট পাইল বোরিং করে ড্রাইভিং করার বিষয়টি সয়েল মেকানিক্সের জটিল বিষয়। এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়া যেতে পারে।

বৈদ্যুতিক কাজের বিষয়েও আনোয়ার আলীর উত্থাপিত অভিযোগের সত্যতা পায় তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি। তাদের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, শিটেড ক্যাবলের পরিবর্তে নন শিটেড ক্যাবল ব্যবহার করেছে। এই ত্রুটি সংশোধনের ব্যাপারে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স : তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি হাইমচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করে দেখে, নকশায় উল্লিখিত পাইলের চেয়ে ২০টি পাইল ড্রাইভ কম করা হয়েছিল। পরে আবার ২০টি পাইল ড্রাইভ করা হয়। তবে এগুলো নকশা অনুযায়ী হয়নি। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধির পাইল ড্রাইভিং সংক্রান্ত সঠিক ধারণা না থাকার কারণে যেনতেনভাবে এগুলো করা হয়। এসব অনিয়ম হওয়ার পরও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ৪ কোটি ৫৮ লাখ ৫৪ হাজার টাকার বিল পরিশোধ করা হয়।

অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান : আনোয়ার আলী তার প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, তিনটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কাজ বাস্তবায়ন করেছে শরীফ খন্দকার এবং তার নিয়োগপ্রাপ্ত অনভিজ্ঞ লোকজন। এই প্রতিষ্ঠানটি কাজ পায়নি। তারা সাব কন্টাক্টে কাজ করছে। তিনটি উপজেলার কাজগুলোর মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কবির ট্রেডার্স এবং মেসার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন নামে দুটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে আবার কোনোখানে মেসার্স ম্যাক কনস্ট্রাকশন এবং ঢালী কনস্ট্রাকশন (লি.)-এর সঙ্গে জেভি করে কাজগুলো নেওয়া হয়েছে।

আবার কোনো জায়গায় শুধু ম্যাক কনস্ট্রাকশনের নামেও কাজ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের মালিক নিজে কাজ করছেন না। কাজগুলো করেন শরীফ খন্দকার এবং তার নিয়োগপ্রাপ্ত অনভিজ্ঞ লোকজন।

তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, শরীফ খন্দকার কিছুদিন আগেও সাহারা এন্টারপ্রাইজের নামে ছোট ছোট কাজের ঠিকাদারি করতেন। শরীফ খন্দকার কুমিল্লা সার্কেলের আওতায় তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে ৭০ কোটি টাকার ৫টি কাজ করছেন। এ ছাড়াও এসব প্রতিষ্ঠানের নামে তিনি এইচইডিতে তিন বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ১৭টি কাজ করেছেন।

বড় কাজে তার পূর্ব-অভিজ্ঞতা না থাকায় তার নিয়োগপ্রাপ্ত লোকজনও অভিজ্ঞ নন। তার কাজের মান নিয়ে প্রকৌশলীরা আপত্তি তুললেও তিনি বিল তুলে নেন। দায়সারাভাবে বেশি বিল নিতে তিনি উপর মহল থেকে তদবির করান। কেউ বেশি বিল দিতে না চাইলে তিনি বদলির হুমকি দেন। কোনো কর্মকর্তা বিল দিতে অস্বীকার করলে কোনো কোনো সময় তিনি বদলিও হন। এ কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা তাকে ভয় পান।

এ বিষয়ে শরীফ খন্দকার বলেন, ‘যিনি তদন্ত করেছেন, তাকেই এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করেন। সত্য-মিথ্যা উনি জানেন।’

সাহারা এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী কি না-এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সেটি এড়িয়ে যান। তার প্রতিষ্ঠানের নামও তিনি বলেননি। তবে তিনি দাবি করেন, জয়েন্ট ভেঞ্চারে (জেভি) তিনি কাজ পেয়েছেন।

তবে ম্যাক কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী আলম বলেন, কাজগুলো আমরাই করছি। শরীফ খন্দকার আমাদের বন্ধু। তিনিই কাজগুলো দেখাশোনা করেন। তিনি কাজ করছেন না।

তদন্তে অনিয়মের বিষয় উঠে এসেছে-এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমার জানা নেই।

কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির বলেন, কুমিল্লা অঞ্চলে তো আমরা কোনো কাজ করছি না। আমরা তো কাজ করছি উত্তরবঙ্গে।

জয়েন্ট ভেঞ্চারে আপনার প্রতিষ্ঠান কাজ করছে উল্লেখ করলে তিনি বলেন, জয়েন্ট ভেঞ্চারে হতে পারে। সেখানে অনিয়ম হয়েছে কি না, খোঁজ নিয়ে জানাব।

ম্যাক কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী ফিরোজ আহমেদের মোবাইল ফোনে বুধবার বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। একই মোবাইল ফোন নম্বরে এসএমএস পাঠালেও তিনি সাড়া দেননি।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here