মনিরামপুরে আলোচনায় আরডিসি নাজিম উদ্দীন

সাংবাদিক আরিফুল ইসলামের নির্যাতক কুড়িগ্রামের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দীন যেন টাকার মেশিন। হতদরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া স্থানীয়দের চাঁদার টাকায় পড়াশোনা করা নাজিম উদ্দীন ৩৩তম বিসিএসে চাকরি পেয়ে নিজেকে বদলে ফেলেছেন। এই অল্প বয়সেই কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। দিনমজুর পিতার সন্তান নাজিম উদ্দীন যশোরের মনিরামপুর পৌরশহরে ৮ শতক জামির ওপর স্ত্রী সাবরিনা সুলতানার নামে ৫ তলাবিশিষ্ট ভবন নির্মাণ করছেন। এরই মধ্যে চার তলার কাজ শেষ হয়েছে। এছাড়া স্ত্রী ও শ্বশুরের নামে পৌরশহরে আরও অনেক জমি কেনার খোঁজ মিলতে শুরু করেছে।

নাজিম উদ্দীন মনিরামপুর উপজেলার খানপুর ইউনিয়নের মৃত নিছার আলীর ছেলে। বৈবাহিক সূত্রে নিছার আলী উপজেলার কাশিপুর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে ঘরজামাই থাকতেন। নাজিম উদ্দীন মেধাবী হওয়ায় তার লেখাপড়ায় স্থানীয়রাও সহযোগিতা করেছেন। জামায়াতের সমর্থক নিছার আলী টালি ভাটার শ্রমিকের কাজ করতেন। কিন্তু নানার পরিবার আওয়ামী লীগ সমর্থক হওয়ায় নাজিম উদ্দীনের উপরে ওঠার সিঁড়ি পেতে অসুবিধা হয়নি। সরেজমিন কাশিপুর গ্রামে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়। নাজিম উদ্দীন মনিরামপুর সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাস করে মনিরামপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজে লেখাপড়া করেছেন। একই কলেজের ছাত্রলীগের তৎকালীন আহ্বায়ক সন্দীপ ঘোষ জানান, নাজিম উদ্দীন ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয় ছিল। বদমেজাজি নাজিম উদ্দীনের বিরুদ্ধে কক্সবাজার, বাগেরহাট ও মাগুরার মহাম্মদপুরে সহকারী কমিশনার (ভূমি) থাকাকালীন ক্ষমতার অপব্যবহারের অনেক উদাহরণ রয়েছে। সরকারি দায়িত্ব পালনে তিনি যেখানেই গেছেন, সেখানেই নানা কাণ্ড ঘটিয়েছেন। কক্সবাজারে দায়িত্ব পালনের সময় সাদা শার্ট ও লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধের কলার চেপে ধরে জমির আল দিয়ে একজন বয়স্ক ব্যক্তিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেতে দেখা যায় নাজিম উদ্দীনকে। সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় ২০১৮ সালে তিনি কক্সবাজারের কলাতলীর মোহাম্মদ আলীকে ধরে নিয়ে আসেন। সেই ভিডিও পরে ভাইরাল হয়। মোহাম্মদ আলীকে উদ্ধৃত করে তখন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কোনো কিছু না বলেই হঠাৎ সহকারী কমিশনার লোকজন নিয়ে জমি মাপজোখ শুরু করেন। তারপর তাকে পেটান ও টেনেহিঁচড়ে একটি টমটমে তোলেন। এসি ল্যান্ড অফিসে নিয়ে তাকে সাক্ষ্য দিতে জোরাজুরি করেন। তবে নাজিম সেসময় দাবি করেছিলেন, ওই বৃদ্ধ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয় কেন্দ্রে যেতে চাইছিলেন না বলে তাকে টেনে নেয়া হয়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মনিরামপুর পৌর এলাকার ৯৩ নম্বর গাংড়া মৌজার ৫৯৬ নম্বর দাগের (আরএস চূড়ান্ত) ২৫ শতক জমির মধ্যে ১৪.৬৯ শতাংশ জমি ৪৬ লাখ টাকায় ক্রয় করেন তিনি। জমিটি গাংড়া গ্রামের আকবর আলীর কাছ থেকে ২০১৯ সালের ১৫ জুলাই তার শ্বশুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক (অব.) আবদুর রাজ্জাকের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। জানতে চাইলে আকবর আলী জানান, স্থানীয় মোসলেম উদ্দীনের মধ্যস্থতায় ৪৬ লাখ টাকায় তিনি ওই জমি বিক্রি করেন, যা আবদুর রাজ্জাকের জামাই ম্যাজিস্ট্রেট নাজিম উদ্দীন কিনেছেন। কিন্তু দলিল করা হয় নাজিম উদ্দীনের শ্বশুর আবদুর রাজ্জাকের নামে। মনিরামপুর ৯৪ নম্বর মৌজায় ৮৩ খতিয়ানের ১৩২ নম্বর দাগের ( আরএস চূড়ান্ত) ৩২.২৫ শতকের মধ্যে ৮ শতক জমি ১৩ লাখ টাকায় কেনা হয়, যা উপজেলার কাজিরগ্রামের মোকলেছুর রহমানের কাছ থেকে ৬ শতক এবং তার স্ত্রী মোছা. নাজমুন নাহার রুপার কাছ থেকে ২ শতকসহ ৮ শতক জমি নাজিম উদ্দীনের স্ত্রী সাবরিনা সুলতানার নামে ২০১৮ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি রেজিস্ট্রি করা হয়। মজার ব্যাপার হচ্ছে, রেজিস্ট্রিকৃত জমি নাজিম উদ্দীনের স্ত্রী সাবরিনা সুলতানার নামে হলেও সেখানে স্বামীর নাম না দিয়ে তার বাবা (নাজিম উদ্দীনের শ্বশুর) আবদুর রাজ্জাকের নাম দেয়া হয়েছে। এই জমির ওপরই নির্মাণ করা হচ্ছে পাঁচতলার বিশাল অট্টালিকা। সরেজমিন সেখানে গেলে কর্মরত শ্রমিক লিটন হোসেন জানান, এক বছর ধরে ভবন নির্মাণের কাজ চলছে। ভবনটি নির্মাণ করছেন জনৈক শহিদুল ইসলাম শহিদ নামের কন্ট্রাকটর। এক প্রশ্নে লিটন জানায়, ভবনটি নাজিম উদ্দীন নির্মাণ করছেন। আতিয়ার রহমান নামের রাজমিস্ত্রি জানান, এ পর্যন্ত দেড় কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এসব বিষয়ে নাজিম উদ্দীনের দাবি, তার শ্বশুর পেনশনের টাকা দিয়ে গাংড়া মৌজায় জমি কিনেছেন। আর শ্বশুরের কিনে দেয়া স্ত্রী সাবরিনা সুলতানার নামে ৮ শতক জমির ওপর ভবনটি প্রবাসী শ্যালিকা নির্মাণ করছেন। তবে তার কথার অমিল পাওয়া যায় উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসে গেলে। ওই অফিস সূত্র জানায়, ২০১১ সালের ১ মার্চ অবসরে যান নাজিম উদ্দীনের শ্বশুর আবদুর রাজ্জাক। অবসরের ৪ দিন পর পেনশনের ৮ লাখ ১৭ হাজার ৬০০ টাকা উত্তোলন করেন তিনি। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, পেনশনের এই টাকা দিয়ে ৮ বছর পর কীভাবে তিনি ৪৬ লাখ টাকায় জমি কিনলেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হলে টাকার উৎস সম্পর্কে সত্য উদ্ঘাটন হবে বলে অনেকে মনে করেন। এদিকে জামিনে মুক্তির পর আরিফুল ইসলাম বলেছেন, ‘রাতে ঘরে ঢুকেই আরডিসি নাজিম উদ্দীন আমার মাথায় কিল-ঘুষি মারতে শুরু করেন। মারতে মারতে আমাকে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তুলে চোখ-হাত-পা বেঁধে ফেলা হয়। এরপর আমাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে এনকাউন্টারে দেয়ার হুমকি দেয়। আমাকে নাজিম বারবার বলেন, আজ তোর জীবন শেষ। তুই কলেমা পড়ে ফেল, তোকে এনকাউন্টারে দেয়া হবে।’

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here