মাঠ প্রশাসনের নিরাপত্তা দিতেই হবে

মো.আবদুল করিম

0
3

১৯৮২ সালে উপজেলা পদ্ধতি চালু করার সময় তৎকালীন মহকুমাগুলোকে জেলায় উন্নীত করা হয়, মহকুমা পদ্ধতি বিলুপ্ত করা হয় এবং থানাগুলোকে উপজেলায় রূপান্তর করা হয়। মহকুমা প্রশাসকের (এসডিও) পদটি উন্নীত করে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক পর্যায়ের কর্মকর্তাকে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পদে নিয়োগ করা হয় এবং উপজেলা পরিষদকে পর্যাপ্ত প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়। তৎকালীন সামরিক শাসক কর্তৃক উপজেলা পদ্ধতি চালু হলেও এটি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ হিসেবে তখন দেশে-বিদেশে প্রশংসিত হয়েছিল। নির্বাহী কর্মকর্তা উপজেলা পরিষদের প্রধান নির্বাহী ও সরকারের প্রতিনিধি।

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা খানমের ওপর সম্প্রতি সংঘটিত দুর্বৃত্তদের বর্বরোচিত হামলাকে কোনো কোনো মহল ‘ডাকাতির চেষ্টা’ বা ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। ওই উপজেলার ডুগডুগি বাজারের সরকারি জমিতে স্থানীয় একজন রাজনৈতিক নেতা নির্মিত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করার লক্ষ্যে ইউএনও ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য যে তারিখ ও সময় নির্ধারণ করেন, ঠিক তার কয়েক ঘণ্টা আগে ওয়াহিদার প্রাণনাশের লক্ষ্যে সংঘটিত এ আক্রমণকে ‘পূর্বপরিকল্পিত’ হামলা বলে যথাযথই দাবি করেছেন বাংলাদেশ প্রশাসনিক সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদসহ আরও অনেকেই।

হামলাকারীরা বাসার কোনো জিনিস চুরি করেনি, এমনকি বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইলটিও। সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা ওয়াহিদার কাছ থেকে অনৈতিক ও অবৈধ সুবিধা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে তাকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয় বলে সংশ্নিষ্টদের ধারণা। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ওয়াহিদা তার এলাকায় অবৈধভাবে নদীর বালু উত্তোলন, সরকারি জমিতে অবৈধ দখল, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি বন্ধে কঠোর ও অনমনীয় ভূমিকা নেওয়ায় স্থানীয় মাস্তান, পেশিবাজ, স্বার্থান্বেষী মহল ও দুর্নীতিবাজদের বিরাগভাজন হন।

পাবলিক পরীক্ষায় নকলবাজি বন্ধ, দুর্যোগে ত্রাণসামগ্রী বিতরণে স্বচ্ছতা আনয়ন, প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে এবং চোরাকারবারি বা মাদক ব্যবসা ইত্যাদি বন্ধে পদক্ষেপ নিলেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের মাঠ পর্যায়ে বিরূপ পরিস্থিতির শিকার হতে হয়। কর্মস্থলে (অফিস, ভোটকেন্দ্র, পরীক্ষাকেন্দ্র ইত্যাদি) ম্যাজিস্ট্রেট বা ইউএনওরা বহুবার হামলার শিকার হয়েছেন। কিন্তু নিজ সরকারি বাসভবনে ঘুমন্ত অবস্থায় কোনো উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর শারীরিক হামলার ঘটনা আগে কখনও ঘটেছে বলে মনে পড়ছে না।

এই অঘটনে পুরো মাঠ প্রশাসন বিস্মিত ও স্তম্ভিত হয়ে পড়েছে। মামলার প্রধান আসামি আসাদুল ইসলামসহ অন্য সন্দেহভাজনদের দ্রুত গ্রেপ্তারের মাধ্যমে র‌্যাব-পুলিশ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছে। ডিবি পুলিশের ওপর তদন্তভার ন্যস্ত হওয়ায় দ্রুত তদন্ত শেষ হবে বলে অনেকেই আশা করছেন। সুষ্ঠু তদন্ত করে আইনি প্রক্রিয়ায় আসামিদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সবার দাবি। অন্যথায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে, পুরো সরকারি প্রশাসনিক ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা সৃষ্টিসহ দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে। এতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বেড়ে যেতে পারে, দেশের উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং ২০৪১-এর মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার সার্বিক পরিকল্পনাগুলো ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। ইউএনও ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলায় কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা রয়েছে কিনা, তা খুঁজে বের করে প্রয়োজনে জরুরি প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ অতীব জরুরি।

বিভাগীয় কমিশনার মাঠ পর্যায়ে বেসামরিক প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা। তার আওতাধীন জেলা প্রশাসকদের মাঠ প্রশাসনে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘চক্ষু-কর্ণ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। দেশের অনেকগুলো আইনে জেলা প্রশাসককে বিভিন্ন প্রকার ক্ষমতা অর্পণ করা হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে প্রণীত এই প্রশাসনিক কাঠামোতে মাঠ প্রশাসনের কেন্দ্রবিন্দু তথা জেলা প্রশাসককে অনেক ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ইউরোপ, আমেরিকার মতো উন্নত দেশগুলোতে এসব ক্ষমতা এখন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের কাছে স্থানান্তর করা হয়েছে। কিন্তু ঔপনিবেশিক আমলের প্রশাসনিক কাঠামো এখনও উপমহাদেশের দেশগুলোতে প্রায় হুবহু চালু রয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হলেন তৃণমূল পর্যায়ে সরকারের সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ অফিসার। তিনি উপজেলা পরিষদে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন এবং এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইউএনও একাধারে প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট, উপজেলার রাজস্ব সংগ্রাহক ও উন্নয়ন কার্যাদির মুখ্য সমন্বয়ক। উপজেলায় কর্মরত সরকারের সব দপ্তর ও বিভাগের কার্যক্রম (সংরক্ষিত এবং স্থানান্তরিত) তিনি সমন্বয় করেন। উপজেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, পাবলিক পরীক্ষা ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪ ধারা জারি, রাষ্ট্রীয় গোপনীয় কার্যাদি সম্পাদন, নির্বাচন পরিচালনা, দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত কার্যাদি, সীমান্ত সংক্রান্ত বিষয়াদি, বেসামরিক প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার বিষয়ক কার্যাদি; খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মৎস্য ও পশুসম্পদ, সমাজকল্যাণ, পুলিশ, আনসার, ভিডিপিসহ সব বিভাগের কার্যক্রম সমন্বয় করা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব। কাজেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার ওপর হামলা প্রকারান্তরে সরকারের সব বিভাগের কর্মকর্তার ওপর হামলার শামিল এবং তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বের ব্যাপকতাই তাকে স্বার্থান্বেষী মহল, দুর্নীতিবাজ, পেশিশক্তিবাজ, মাদক ব্যবসায়ী ও চোরাচালানিদের শত্রুতে পরিণত করে। খাদ্য, সার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি মজুদদারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে, সীমান্তের চোরাচালান বন্ধ করলে, মাদক পাচার ও ব্যবহার বন্ধে পদক্ষেপ নিলে, নদীর অবৈধ বালু বা পাথর উত্তোলন করতে না দিলে, ইটের ভাটায় অবৈধ কাঠের ব্যবহার বন্ধ করলে, পরীক্ষায় অসদুপায় বন্ধ করলে, উপজেলায় চুরি-ডাকাতি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিলে, সরকারি খাস জমি উদ্ধারে তৎপর হলে, দুর্যোগকালীন ত্রাণ বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করলে স্থানীয় প্রভাবশালীদের অনেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সংশ্নিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হন। নানাভাবে তারা আইনের সুষ্ঠু প্রয়োগে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করেন। অতীতেও দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মাঠ পর্যায়ের বহু ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দৈহিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন।

সরকারি কর্মচারীর দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করলে পেনাল কোড ১৮৬০-এর ১৮৬ ধারা অনুযায়ী মাত্র তিন মাসের কারাদণ্ড অথবা পাঁচশ’ টাকা জরিমানা করা যায়, যা বর্তমান বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অপ্রতুল বলে প্রতীয়মান হয়। নিম্ন পর্যায়ের জনৈক কর্মচারীর সরকারি দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন সৃষ্টি করায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের একজন প্রাদেশিক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে জনৈক দাপুটে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগী হয়েছিলেন বলে তার স্মৃতিকথা থেকে জানা যায়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ের বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়হীনতা ও আন্তঃসার্ভিস কথিত বিদ্বেষ প্রশাসনিক অনুকূল পরিবেশকে বিঘ্নিত করে। স্থানীয় স্বার্থান্বেষী মহল এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে থাকে। ঘোড়াঘাট উপজেলায় স্থানীয় সাংসদ এবং উপজেলা চেয়ারম্যানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে দ্বন্দ্ব বিরাজ চলছিল বলে খবরে প্রকাশিত হয়েছে।

ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলায় রুজুকৃত মামলায় প্রধান অভিযুক্ত আসামি আসাদুল ইসলাম এলাকায় ভূমি দস্যুতা, অবৈধ বালু উত্তোলন, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, গ্রাম্য বাজারে আধিপত্য বিস্তারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত থাকার অভিযোগ স্থানীয় পত্রিকান্তরে অনেক আগেই প্রকাশিত হয়েছিল। এ ধরনের কথিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যথাসময়ে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক ছিল। সন্ত্রাসীদের কোনো দলীয় পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কথিত সন্ত্রাসী এর আগে পৌর মেয়র আব্দুস সাত্তার মিলনের ওপরও হামলা চালিয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলার রাতে নির্বাহী কর্মকর্তার বাসার কর্তব্যরত নৈশপ্রহরী নাহিদ হোসেন পলাশের ভূমিকাও প্রশ্নবিদ্ধ। অবশ্য হামলার পর সম্ভাব্য স্বল্পতম সময়ে সরকারি হেলিকপ্টারে ইউএনও ওয়াহিদাকে ঢাকায় এনে সর্বোচ্চ মানের চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়েছে। সফল অস্ত্রোপচারের পর তার অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও তিনি শঙ্কামুক্ত নন। এ ক্ষেত্রে সরকারের ত্বরিত পদক্ষেপ প্রশংসার দাবিদার।

তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই প্রধান সন্দেহভাজন ব্যক্তির প্রাথমিক স্বীকারোক্তির ওপর ভিত্তি করে জঘন্য হামলার ঘটনাটিকে ‘নিছক চুরি’ এবং ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ বলে মন্তব্য করা দুর্ভাগ্যজনক এবং হতাশাব্যঞ্জক, যা তদন্তকাজে পেশাদারিত্বের প্রতিফলন ঘটায় না। এ ধরনের মন্তব্য প্রকাশের ফলে আসামি পক্ষ আইনি প্রক্রিয়াকে ভিন্ন খাতে প্রবাহের চেষ্টা করতে পারে। স্থানীয় দুর্নীতি সহায়ক কোনো প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি এ ঘটনায় জড়িত আছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে বিচার বিভাগীয় তদন্তের দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ।

ঘটনার মূল মদদদাতা হিসেবে একজন রাজনৈতিক নেতার নাম ইতোমধ্যেই পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। পুরো ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দ্রুত বিচার আদালতের মাধ্যমে ওয়াহিদা খানমের ওপর হামলাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। তবে এ ঘটনাকে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ হিসেবে মন্তব্য করছেন কেউ কেউ। জানা যায় যে, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের বাসভবনের নিরাপত্তা জোরদারকল্পে আনসার সদস্য নিয়োগের ব্যাপারে একটি সরকারি সিদ্ধান্ত বেশ কিছুদিন আগেই নেওয়া হয়েছিল। এ ঘটনার পরপরই ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে।

পর্যবেক্ষকরা লক্ষ্য করেছেন যে, ওয়াহিদার ওপর হামলা সংক্রান্ত মামলাটি দায়ের করেছেন তার ভাই। ইউএনওর সরকারি বাসায় এ ঘৃণ্য অপরাধটি সংঘটিত হলেও পুলিশ অথবা সরকার পক্ষ বাদী হয়ে এ ব্যাপারে কেন মামলা দায়ের করা হলো না, তা অনেকের প্রশ্ন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালনরত কর্মকর্তা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরকারিভাবে জীবন বীমা কর্মসূচির আওতায় সুরক্ষা সেবা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। ওয়াহিদা খানমের দ্রুত রোগমুক্তি কামনার পাশাপাশি প্রকৃত দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করছি।

প্রধানমন্ত্রীর সাবেক মুখ্য সচিব

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here