মাদকসেবী থেকে পাঠাগার আন্দোলনের কাণ্ডারি ইমাম

0
10

আমার কাগজ প্রতিবেদকঃ

ইমাম হোসেনের জন্ম ১৯৮৯ সালের ২০ ডিসেম্বর। বাবার নাম মৃত অহিউর রহমান। মায়ের নাম বিলাতের নেসা। তার পৈতৃক নিবাস কুমিল্লা জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার সাওড়াতলি গ্রামে।

সীমান্তবর্তী হওয়ায় সেখানকার কিছু যুবক মাদকদ্রব্য আদান-প্রদানের কাজে জড়িত ছিল। অসৎ সঙ্গের একপর্যায়ে পড়ালেখাও বন্ধ হয়ে যায়। তারপর নিজের বড় ভাইয়ের ওয়ার্কশপে এক মাস কাজ করে পালিয়ে যান চট্টগ্রামের ষোলশহরে।

সেখানে এক মেসে গাদাগাদি করে চার বন্ধু মিলে থাকতেন। একপর্যায়ে তার তিন বন্ধু চলে গেলে অল্প টাকায় মেসে থাকা সম্ভব হয় না। পরবর্তীতে রাতে ঘুমানোর জন্য বেছে নেন রেলের অকেজো বগি। তবে বগি খোলার সময় পুলিশ চোর ভেবে তাকে থানায় নিয়ে যায়।

জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বস্তিতে বসবাস শুরু করেন। কাজ করতেন ম্যানহোলে। প্রতিদিন ১২০ টাকা মজুরি পেতেন। ৩০ টাকা দিয়ে তিন বেলার খাবার খেতেন। বাকি ৯০ টাকা দিয়ে পুরোনো বই কিনতেন। বই পড়ায় আগ্রহ থাকায় তিনি নিয়মিত বই কিনতেন এবং সংগ্রহ করতেন।

১৫ দিন পর ম্যানহোলের কাজ ছেড়ে দিয়ে চট্টগ্রাম শপিং মলে দারোয়ানের চাকরি নেন ইমাম। এক মাস চাকরি করে ১২০০ টাকা বেতন পান। সেখান থেকে টাকা বাঁচিয়ে ৬০টি বই কেনেন তিনি। এত টানাপোড়েনের মধ্যেও বইপড়ার আগ্রহ বিন্দুমাত্র কমেনি।

তিন বছর পর নিজ গ্রামে ফিরে আসেন। বন্ধুদের অনুপ্রেরণায় শুরু করেন লেখাপড়া। দশম শ্রেণিতে ‘লাইব্রেরি’ প্রবন্ধ পড়ে পাঠাগার গড়ার আগ্রহ জন্মে। সেজন্য ২০০৫ সালে ‘পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশ’ নামে একটি পাঠাগার গড়ার উদ্যোগ নেন।

মাধ্যমিকে এ প্লাস পেয়ে পড়ালেখার প্রতি আগ্রহ আরও বেড়ে যায়। সংসারে অভাব থাকায় টিউশনি করে লেখাপড়ার খরচ জোগাতেন। তার পাশাপাশি নিজ বাসায় গড়ে তোলেন বিদ্যাসাগর উন্মুক্ত পাঠাগার। নিজেই পোস্টার লাগিয়ে পাঠাগারটির প্রচারণা চালাতেন।

উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত অবস্থায় কুমিল্লার দেবিদ্বারে একটি এতিমখানায় পড়ানোর বিনিময়ে তিন বেলা খাবার পেতেন। শিক্ষার্থীদের জন্য সেখানেও বিদ্যাসাগর উন্মুক্ত পাঠাগারের কিছু বই নিয়ে যান।

মেধাবী এ ছাত্র কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কেটিং বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য সময় ব্যয় না করে পাঠাগার আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে দেয়ার লড়াই শুরু করেন। পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন প্রথমে লুৎফর রহমানের মানবজীবন বই দিয়ে শুরু করেন। এখন তার পাঠাগারে বই আছে ১১ হাজার ৫২০টি।

তাদের ট্রাস্টি বোর্ডে সদস্য ১১ জন। অফিসিয়ালি তাদের সদস্য ৪৭২ জন। তারা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পাঠাগারের জন্য পুরোনো বই সংগ্রহ করেন। তা ছাড়াও প্রতিবছর বইমেলা থেকেও বই সংগ্রহ করেন। সংগঠনটির লক্ষ্য সারাদেশের ৮৭ হাজার ১২১টি গ্রামে কমিউনিটি পাঠাগার গড়ে তোলা।

সংগঠনটির দাফতরিক কার্যালয় কুমিল্লার ধর্মসাগর উত্তর পাড় পৌড়পার্ক এলাকায়। সংগঠনটির প্রধান কাজ হলো কোনো অঞ্চলে কেউ যদি পাঠাগার গড়তে চান; তাকে উৎসাহ, দিক-নির্দেশনা দেয়া এবং পাঠাগার নিয়ন্ত্রণ করা।

তাদের প্রচেষ্টায় দেশের ৪৩টি জেলায় পাঠাগার আন্দোলন ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সারাদেশে সংগঠনটির নিয়ন্ত্রণে আছে ১৩৫টি পাঠাগার। পাঠাগার আন্দোলনের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী পাঠাগার গড়তে চাইলে কমপক্ষে ৩০০টি বই থাকতে হয়।

তাদের দিক-নির্দেশনায় নরসিংদীর শিবপুর উপজেলার বিরাজনগর বাজারে প্রথম পাঠাগার গড়ে ওঠে। সেটির নামও দেয়া হয় বিদ্যাসাগর উন্মুক্ত পাঠাগার। ২০১৩ সালের ৭ আগস্ট পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার দিন প্রধান অতিথি ছিলেন তৎকালীন ডিসি আবু হেনা মোর্শেদ জামান।

স্থানীয় জনগণ পাঠাগারটির জন্য ১৩ লাখ টাকা অনুদান দেন। পাঠাগার আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে থাকা সবচেয়ে উন্নত পাঠাগারও এটি। পাঠাগার আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে থাকা ২৫টি পাঠাগারের অবস্থা আশাব্যঞ্জক নয়। কারণ পাঠাগারগুলোয় বইয়ের সংখ্যা খুব কম।

ইমাম হোসেনের এ উদ্যোগে খুশি হয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক তার পাশে দাঁড়ান। শিক্ষকরা পথশিশুদের জন্য পাঠশালা খুলতে ইমামকে উৎসাহ দেন। তারই ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে কুমিল্লায় সামাজিক বনবিভাগে একটি অকেজো ঘরে ইমাম পথশিশুদের জন্য পাঠশালা গড়ে তোলেন।

পাঠশালাটির নাম প্রজন্ম শিশু পাঠশালা। সেখানে সপ্তাহে ২ দিন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক পাঠদান করেন। পাঠশালায় ১৫০ জন পথশিশু ক্লাস করে। এ খবর গণমাধ্যমে প্রকাশ হওয়ার পর অস্ট্রিয়ার ভিয়েনাভিত্তিক এনজিও (হোপ ৮৭) ৭ লাখ টাকার বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের বই ‘পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশকে’ দেয়।

ইমাম হোসেন পাঠাগারের পাশাপাশি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করায় এনজিওটি তাকে বই দেয়। বিষয়টি তখন ব্যাপক সাড়া ফেলে কুমিল্লায়। এতে ইমামের উৎসাহ বেড়ে যায়। পাঠাগার আন্দোলনের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত হতে থাকলে বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণ পাঠাগার গড়তে আগ্রহী হয়।

এভাবেই পাঠাগার আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন ইমাম। সরকারি সহযোগিতা সর্ম্পকে তিনি বলেন, ‘গত বছর ১৯ হাজার টাকার বই এবং ১৯ হাজার টাকার চেক পেয়েছিলাম। টাকাটা কুমিল্লার পাঠাগার আন্দোলনের জন্য খরচ করা হয়েছে। আমাদের নিযন্ত্রণে থাকা ৫০টি পাঠাগার সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে। এমনকি সেই পাঠাগারগুলোর লাইব্রেরিয়ানরাও প্রতিমাসে দুই হাজার টাকা করে পাবেন। বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন।’

পাঠাগার আন্দোলনের সদস্য হতে হলে একাডেমিক কোনো যোগ্যতার প্রয়োজন হয় না। শুধু বই পড়ার আগ্রহ থাকতে হয়। পাঠাগার আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণে থাকা পাঠাগারগুলোয় স্কুল-কলেজ পড়ুয়া পাঠক বেশি। তবে গ্রামীণ পাঠাগারগুলোয় কৃষক শ্রেণির পাঠক বেশি। কৃষক পাঠকদের সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘কৃষকরা পাঠাগার থেকে বই সংগ্রহ করে মাঠে নিয়ে যায়। তারা মাঠে চাষাবাদের পাশাপাশি যখন গাছের নিচে বসে বই পড়েন; সেই দৃশ্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে।’

পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশের অন্যতম সফলতা ২০১৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে সারাদেশের ১৪০০ যুবক-যুবতী নিয়ে জাতীয় যুব সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। সংগঠনটি প্রতিমাসে সদস্যদের নিয়ে মিটিং করে। মাসিক একটি চাঁদা নির্ধারণ করা থাকলেও সামর্থের অভাবে অনেকে চাঁদা দেয় না।

‘পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশের’ সংগ্রামটা অনেকটা নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানোর মতো। এ বিষয়ে পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমরা লাইব্রেরিয়ানরা যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাই না। আমরা যদি কোন সরকারি ভাতা পেতাম, তাহলে পাঠাগার আন্দোলনকে আরও বেগবান করতে পারতাম।’

ইমাম হোসেনের এসব কাজের জন্য উৎসাহ দিতেন তার মা, বন্ধু ও শিক্ষকরা। বই সংগ্রহের পেছনে ইমাম হোসেনকে সবচেয়ে বেশি প্রেরণা জুগিয়েছেন মাধ্যমিকের ইংরেজি শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলাম ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষক মো. মাহবুবুর রহমান চৌধুরী। এ দুজন শিক্ষকই তাকে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি অন্যান্য বই পড়তে বিশেষ গুরুত্ব দিতেন।

শিক্ষকদের বিষয়ে ইমাম বলেন, ‘তারা বইপ্রেমী মানুষ। সব সময় আমাকে বইপড়া এবং বই সংগ্রহের জন্য উৎসাহ জুগিয়েছেন তারা। তাদের কারণেই আমি বইপড়ার কদর বুঝতে পেরেছি।’ বইপ্রেমী ইমাম হোসেনের প্রিয় লেখক আহমদ ছফা ও হুমায়ূন আজাদ।

সাংগঠনিক কাজে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার খরচ কীভাবে বহন করেন জানতে চাইলে ইমাম হোসেন বলেন, ‘আমাদের পাঠাগার আন্দোলনের নিজস্ব একটি তহবিল রয়েছে। সেখান থেকেই খরচের টাকা নেই। আর যে অঞ্চলে যাই, সে অঞ্চলের পাঠাগারের সদস্যদের মাধ্যমে খাবারের ব্যবস্থা হয়।’

ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘পাঠাগার আন্দোলন নিয়ে কাজ করায় নিজের ক্যারিয়ারে মনোযোগ নেই বললেই চলে। টিউশনি করেই জীবিকা নির্বাহ করছি। আমরা লাইব্রেরিয়ানরা যদি নিয়মিত সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেতাম, তাহলে ভালোভাবে চলাফেরা করতে পারতাম।’

নিজের প্রাপ্তির জায়গা সম্পর্কে ইমাম বলেন, ‘বাংলাদেশ বেসরকারি গণগ্রন্থাগার পরিষদের নির্বাচিত সভাপতি হওয়ায় এখন আমি সবার পরিচিত। আমার সঙ্গে সবার নিয়মিত যোগাযোগ হয়। আর পাঠাগার আন্দোলন বাংলাদেশকে মানুষ ইতিবাচকভাবে নিয়েছে, এটা আমার জন্য বিরাট অর্জন।’

পাঠাগার আন্দোলনের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এদেশের প্রতিটি মানুষের কাছে বইপড়ার কদর পৌঁছাতে হবে। পাঠাগার আন্দোলন সারাদেশে ছড়িয়ে দিতে হবে এবং মানুষকে এ ব্যাপারে উৎসাহিত করতে আমরা নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন করবো।’

পাঠাগার আন্দোলনের এ যোদ্ধা বলেন, ‘পৃথিবীর সব আন্দোলন শূন্য থেকেই শুরু হয়েছিল। আমিও মাত্র একটি বই নিয়ে পাঠাগার আন্দোলন শুরু করি। এখন আমার পাঠাগারে অনেক বই। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এটা সম্ভব হয়েছে।’ ইমাম মনে করেন, সমাজের বিত্তবানরা যদি এ আন্দোলনে এগিয়ে আসেন; তাহলে পাঠাগার আন্দোলন একসময় সাফল্যের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here