মাদকের বিরুদ্ধে এ্যাকশনঃ পথ দেখাচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ

0
207

মো. হাসান খান :
একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ ‘আপনি আচরি ধর্ম অপরে শিখাও’। অর্থাৎ কোন কিছু আগে নিজে মান্য করে এরপর অপরকে তা মানার বিষয়টি বুঝানো হয়েছে। এ প্রবাদের যথার্থ প্রতিফলন মিলেছে বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. বেনজীর আহমেদের সাম্প্রতিক এক মন্তব্যে। শনিবার (২৭ জুন) রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে আইজিপি কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, “পুলিশের কোনো সদস্য মাদক নেবে না, মাদকের সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কযুক্ত থাকবে না। ক্যান্সার চিকিৎসায় কোনো ব্যক্তি ক্যান্সারে আক্রান্ত হলে আক্রান্ত অংশ কেটে অপসারণ করা হয়। ঠিক তেমনিভাবে পুলিশের কোনো সদস্য যদি মাদকের সাথে সম্পর্কযুক্ত থাকে তাহলে নির্দয়ভাবে তাকেও বাহিনী থেকে অপসারণ করা হবে। এ ব্যাপারে কোনো ছাড় দেয়া হবে না।” ওই সভায় আইজিপি আরো বলেছেন, ‘পুলিশকে মাদকমুক্ত হতে হবে, পুলিশকে মানুষের কাছ থেকে অবৈধ সুবিধা নেওয়া যাবে না। মানুষের প্রতি নিষ্ঠুরতা নয়, মানবিক আচরণ করতে হবে। জনগণের সেবায় নিয়োজিত পুলিশ অফিসার ও ফোর্সের সার্বিক কল্যাণও নিশ্চিত করা হবে।’
এটা অনস্বীকার্য যে, মাদক একটি বিশাল সমস্যা। এটি নতুন কোনো সমস্যা নয়। আদিকাল থেকেই মানব সভ্যতা বির্বতনের পাশাপাশি এ সমস্যা জড়িয়ে আছে। বর্তমানে এটি আগ্রাসী এবং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মাদকের বিষাক্ত ছোবল শেষ করে দিচ্ছে তারুণ্যের শক্তি ও অমিত সম্ভাবনা। ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনের অবক্ষয়, প্রত্যাশার সঙ্গে প্রাপ্তির অসামঞ্জস্যতা, হতাশা এবং মূল্যবোধের অভাবের সুযোগ নিয়ে মাদক তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তরুণ সমাজের প্রতি। বেকারত্বও মাদকের বিস্তারে সহায়ক-এমন কথাও বলছেন বিশ্লেষকরা। এই মরণ নেশার বিস্তারে সমাজে একদিকে যেমন অপরাধ বাড়ছে, তেমনিভাবে নষ্ট হচ্ছে সামাজিক শৃঙ্খলা। নিষিদ্ধ জগতে অস্ত্রের পর মাদকই সবচেয়ে লাভবান ব্যবসা। বিশেষ করে ফেনসিডিল ও ইয়াবা সহজলভ্য ও বহনযোগ্য বলে এর বিস্তার দেশজুড়ে। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষজন মাদককারবারের সাথে জড়িত। তারা বিভিন্ন কলাকৌশলের আশ্রয়ে ব্যবসা পরিচালনা করে। আশার কথা অনেকদিন ধরেই প্রশাসন মাদকের বিরুদ্ধে জেহাদী ভূমিকায় রয়েছে। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করার পর ২০১৮ সালের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে দেশব্যাপী ‘মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় পরিচালিত অভিযানে অনেক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হন। এনকাউন্টারে নিহত হন অনেকে। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য। ঢিমেতালে হলেও সেই অভিযান এখনো চলমান রয়েছে। প্রশ্ন ওঠেছে এত কড়াকড়ির পরও মাদক কেনাবেচা কিংবা পাচার হয় কিভাবে। বলাবাহুল্য, বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর ন্যায় প্রশাসনের সাথে সম্পৃক্ত কতিপয় দুর্বৃত্ত এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের প্রশ্রয় থাকার কারণেই মাদক বিরোধী যুদ্ধে পূর্ণ সফলতা আসছে না। সে হিসেবে বর্তমান পুলিশ প্রধান ড. বেনজীর আহমেদ সমস্যার গোড়াতেই হাত দিয়েছেন বলা যায়। অর্থাৎ পুলিশকে মাদকমুক্ত করা গেলেই দেশ ও সমাজ থেকে মাদককে বিদায়ের পথ অনেকটা সহজ হবে। কারণ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কারো প্রশ্রয় বা সহায়তা না পেলে কারো পক্ষে অবৈধ কিছু করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। বেনজীর আহমেদ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে একাধিক কনফারেন্সে মাদকের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। কোনো পুলিশ সদস্য মাদক কারবারে যুক্ত বা অর্থের বিনিময়ে মাদক কারবারিদের সহায়তা করলে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন তিনি। মাদকের বিরুদ্ধে তার এই বার্তা পুলিশের সব ইউনিটে পৌঁছেছে।
বাহিনী প্রধানের আহ্বানে প্রথম সাড়া দিয়ে নজির গড়েছে হাইওয়ে পুলিশ। এটা সকলেই জানি যে, পুলিশের অন্যান্য ইউনিটের মতো একটি হলো হাইওয়ে পুলিশ। দেশের সব মহাসড়কে দায়িত্ব পালন করে থাকে তারা। বলা হয়ে থাকে- কক্সবাজার, টেকনাফসহ দেশের অন্যান্য এলাকা থেকে মাদকের যে জাল দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে, তার একটি বড় অংশ হাইওয়ে ও আঞ্চলিক সড়ক হয়ে স্থানান্তর হয়। পণ্য পরিবহন, জরুরি সেবার সঙ্গে যুক্ত যানসহ নানাভাবে মহাসড়ক হয়েই ইয়াবা, ফেনসিডিল, হোরোইনসহ নানা ধরনের মাদক রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য জেলায় প্রায় প্রতিদিন যাচ্ছে। মাদকরোধে তাই হাইওয়েতে দায়িত্বপালনকারী পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রেক্ষাপটে হাইওয়ে পুলিশ সদস্যরা মাদকমুক্তির ব্যাপারে লিখিত অঙ্গীকারনামা দিয়েছেন। দুই হাজার ৮৬২ সদস্যের এই ইউনিটের প্রত্যেক সদস্য লিখিত অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন। পরে তারা ইউনিটপ্রধানের মাধ্যমে ওই অঙ্গীকারনামা পাঠিয়েছেন হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজি মল্লিক ফখরুল ইসলামের কাছে। লিখিত অঙ্গীকারনামায় তারা বলেন- মাদক সেবন, বিক্রয়, সরবরাহ ও মাদক সংশ্নিষ্ট কোনো কাজের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট নয়। ভবিষ্যতেও থাকবে না। বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) এ সংক্রান্ত এক অনুষ্ঠানে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মল্লিক ফখরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘পুলিশ মহাপরিদর্শকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে আমরাই প্রথম ইউনিট যারা মাদকমুক্তির ব্যাপারে এমন অঙ্গীকারনামা দিয়েছি। আমরা চাই, পুলিশ আগে নিজেরা পুরোপুরি শোধরাক। পুলিশের কোনো সদস্য মাদকের সঙ্গে কোনোভাবে জড়াতে পারবে না। কনস্টেবল থেকে শুরু করে আমি নিজেও এই অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেছি। হাইওয়ে মাদকমুক্ত থাকবে, সারাদেশকে মাদকের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা হবে।’
হাইওয়ে পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি তানভীর হায়দার চৌধুরী বলেন, ‘মাদকের সঙ্গে কোনো পুলিশ সদস্য জড়ালে তাদের নৈতিক মনোবল হারায়। তাই এ ধরনের অঙ্গীকারনামা ইউনিটপ্রধানের কাছে আমরা প্রদান করি।’
হাইওয়ে রেঞ্জ মাদকমুক্ত দেশ গড়ার যে শপথ নিয়েছে, তা অন্যান্য ইউনিটকে পথ দেখাবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here