মানিক চন্দ্র দে’র কবিতা

    0
    21

    আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে

    ( বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী স্মরণে )

    সবটুকু সুখ বিলিয়ে দিয়েছিলে বাঙ্গালীর মাঝে
    স্ত্রীর ভালবাসাটুকু পাওয়ার ও সময় ছিলনা কিম্বা সন্তানের গায়ের গন্ধমাখা উম!
    কিভাবে পাবে? বাঙ্গালির অধিকার আদায়ে
    তোমার উদ্ধত আঙুলের ভয়ে
    বার বার ওরা জেলে করেছে বন্দী তোমায়।
    যতক্ষণ বাইরে ছিলে জাতিকে জাগিয়ে তুলতে
    খেয়ে না খেয়ে
    চষে বেড়াতে বাঙলার মাঠ ঘাট – দশদিক,
    পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল।
    কোন বুড়ি হয়তো একটু ভর্তা মাখানো পান্তা নিয়ে দাঁড়াত,
    ,অথবা নিজের ক্ষেতে বোনা পাকা টমেটো পরম স্নেহে তুলে দিত কোন কৃষক।
    এইতো সারাদিনের খাওয়া!

    ঊনিশ শ’ একাত্তরের সাত ই মার্চে দেয়া তোমার সেই কালজয়ী ভাষন
    রূপ নিয়েছিল মহাকাব্যে,
    হেমিলনের বাঁশির চেয়ে কি কম ছিল তার শক্তি ? তাহলে পৃথিবীর সেরা দশটি ভাষনের একটি হল কিভাবে?
    তুমি যেভাবে বলেছ, তাই করেছে গ্রমের কৃষক রহিমুদ্দি,
    আদমজীর শ্রমিক রহমত,
    চাকরিজীবী রকীবউদ্দীন।
    বোধ হয় গাছের পাতা, ফুল, পাখিরাও।
    শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে তুমি নিরঙ্কুশ বিজয়ী,
    তোমারইতো প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা!
    কিন্ত পশ্চিমা সামরিক জান্তার ষড়যন্ত্র,বুলেট
    আর আগুনের লেলিহান শিখা,
    পৈশাচিক উল্লাসে কাঁপে ঢাকা শহর,
    আগুন ছড়িয়ে পড়ে গ্রাম থেকে গ্রামে শহর থেকে শহরে।
    নির্বিচারে চলে মেশিনগান আর চায়নিজ রাইফেল, বোমা।
    প্রধান লক্ষ্য আওয়ামী লীগ আর হিন্দু। কিন্তু
    রক্ষা কি পেয়েছিল মসজিদের ধর্মপ্রান মুসল্লীও ?
    জ্বলেছিল মন্দির মসজিদ একসাথে।
    কিন্তু তোমার যোগ্য নেতৃত্বে গড়ে উঠা
    তোমার খাঁটি চার নেতার ধরা শক্ত হালকে শক্তি
    যুগিয়েছিল রাজারবাগের পুলিশ,ইপিআর, আর বাঙালী দেশপ্রেমিক বীর সেনানী, কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র জনতা একসাথে।
    মৃত্যুর মঞ্চে বার বার নিয়েও চুল পরিমান টলাতে পারেনি তোমাকে। আপোষ শব্দটি তোমার অভিধানে ছিলনা কখনো।
    ” সাতকোটি বাঙালীরে হে মুগ্ধ জননী
    রেখেছ বাঙালি করে মানুষ করনি” রবীঠাকরের এই কথাকে ভুল প্রমান করে, পশ্চিমা মদ্যপ লাল চক্ষু কে
    তোমার অমিততেজী তর্জনী জানিয়ে দিয়েছিল,
    “সাতকোটি বাঙালীরে দাবায়ে রাখতে পারবানা।”
    সত্যি তো ‘দাবায়ে’ রাখতে পারেনি।
    বিশ্বের অন্যতম আধুনিক তেজী বাহিনী কেন
    পরাজিত হল পাললিক ভূমির কাদামাখা এই মানুষগুলোর কাছে, ‘ ক্যাচকা মারে ছিন্নভিন্ন হয়ে
    কেন বাংলা ছাড়ল লজ্জাজনক ভাবে।
    আমাদের পরম মিত্র ছিল সোভিয়েত, ভারত।
    সারা বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষ ও এসেছিলে পাশে।
    কারণ বাঙালি ছিল ঐক্যবদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর ডাকে।
    সততা আর নিষ্ঠা ছিল, ছিল সাধনা আর ঐক্য।
    ছিলনা ব্যক্তিগত লোভলালসা,এভারেস্ট ছোঁয়ার বাসনা
    এ কারণে কি?
    অদৃষ্টের নির্মম পরিহাসে প্রতি বিপ্লবী চক্রান্তে তুমি আজ টুঙ্গিপাড়ায় – চির নিদ্রায়।
    কিন্ত তুমি কি শান্তিতে আছ পিতা?
    আমি যে শুনতে পাচ্ছি তোমার কান্না!
    আজ তোমার স্বপ্নের সোনার বাংলা উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে ধাবমান উন্নত বিশ্বের পথে
    কিন্তু তবু তোমার চোখে কান্নার জল কেন?
    দেশে একদল বর্ণচোরা রাজাকার মুখে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে
    রাহুগ্রাসে ডুবিয়ে দিতে চায় তোমারই রক্তের যোগ্য উত্তরসুরীর সব অর্জন। এজন্য কি এই অশ্রুজল?
    তোমার যোগ্য উত্তরসুরীকে চারদিক থেকে ঘিরে আছে মজুদদার, কালোবাজারি, চাটুকার।
    একা শুধু তিনি লড়াইয়ে রত।
    যেমন তুমি আপসোস করে বলতে, ‘ সব চাটুকারের দল’!
    “সেই ট্রাডিশন কি সমানে চলেছে? ”
    তোমার শ্রমিকেরা, কৃষকেরা, কেরাণীরা যারা একদিন
    হাতুড়ি, কাস্তে, কলম ফেলে শামিল হয়েছিল আন্দোলন সংগ্রামে, যুদ্ধে
    একটু শান্তিতে ঘুমোবার, মোটা ভাত কাপড়ের আশায়।
    আজ তাদের রক্ত শুষে খায়, ওরা কারা?
    ওদের মুখেও তো তোমার জয়গান,পরনে মুজিবকোট!
    কিন্ত অন্তরে? কাক সেজেছে ময়ুর আজ।
    সোনার পাতলা আবরণের ভেতর পুরোটাই খাদ।
    তাইতো মজুদদার, কালোবাজারি আজ গরীবের পুষ্টি ড্রাকুলার মত
    চুমুকে চুমুকে করছে পান।
    বংলার বধু, কন্যা, নাতনী, নিষ্পাপ শিশুরা পর্যন্ত আজ ধর্ষিত -লাঞ্চিত।
    স্বাধীন সোনার বাংলার পথে দীপ্ত পাায়ে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ – যাদের কারণে
    তাদের ফসল লুটে খায় চাটুকারের দল।
    বিশ্বকবির সোনার বাংলা -তোমার লালিত স্বপ্ন।
    কিন্ত বার বার পিছনে টেনে ধরে ওরা কারা?
    সুয়োরানীর দল? তাদের মুখে এক, ভেতরে আরেক।
    তারা টুঙ্গিপাড়া যায় লোক দেখাতে, তুমি তো জান,
    লক্ষ্য তাদের ক্ষমতার মসনদ
    থাকে যেন নিরাপদ।
    যারা সত্যিকারের ভালবাসে তোমায়
    তোমার সপরিবারে মৃত্যু নিয়ত কাঁদায়
    টুঙ্গিপাড়া আজ তাদেরই হৃদয়ে।

    পিতা! তুমি আশীর্বাদ করো, তোমার অবিনাশী গর্জনে আবার জেগে উঠুক
    পাড়া, মহল্লা, গ্রাম।
    একটি মেয়েও যাতে ধর্ষিত না হয়, মায়ের বুক যেন ভরেনা হাহাকারে।
    এসিডে যেন আর ঝলসে না যায় কোন নিষ্পাপ মায়াবী মুখ।
    এক বিন্দু অশ্রু ও যেন আর গড়িয়ে না পড়ে কোন মায়ের।
    দিনে রাতে নির্ভয়ে স্বাধীন মানুষ বের হবে রাজ পথে
    প্রয়োজনে।
    সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্প করবেনা বাতাস কলুষিত।

    আবার বাঙালী জেগে উঠুক অন্যায়ের বিরুদ্ধে, শোষনের বিরুদ্ধে, ধর্ষণের বিরুদ্ধে একাত্তরের মত।
    নারী পুরুষ সকলে মিলে।; পাড়া, মহল্লায় গ্রামে গঞ্জে।
    আমরা অনেক সময় নষ্ট করেছি, আর নয়।
    তোমায় আর কাঁদতে দেবনা, পিতা!
    তোমার আজীবন লালিত সুখী সুন্দর
    সোনার বাংলা গড়ে তোমায় দেব উপহার
    তোমার জন্ম শতবর্ষে এই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

    আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

    Please enter your comment!
    Please enter your name here