যে কৌশলে ব্লাকমেইল করতেন পাপিয়া ও তার স্বামী

0
11

গত বছর সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ব্যবসায়িক কাজে নরসিংদীর বাগদী এলাকায় গিয়েছিলেন তপন তালুকদার টুকু নামে এক ব্যবসায়ী। সঙ্গে ছিলেন আরও তিনজন। সারা দিন কাজ সেরে বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে ঢাকায় ফেরার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন। চলে এসেছিলেন নরসিংদী রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত। হঠাৎ একটি ফোন। অন্য প্রান্ত থেকে এক নারীর কণ্ঠ। ব্যবসার প্রস্তাব। লোভ সামলাতে পারেননি তিনি। ফোনে দেওয়া ঠিকানা অনুযায়ী লাভের আশায় ওই সময় তিনি ঢাকায় না এসে চলে যান বাগদীর দোতলা একটি বাড়িতে। গিয়ে দেখেন আগে যে বাড়িটিতে তিনি গিয়েছিলেন তার পাশেই ওই বাড়ি। ড্রইং রুমে বসতেই আসেন এক নারী। পরিচয়ের পর তিনি অন্য রুমে চলে যান। ঠিক ওই সময় টুকুদের কাছে এসে সোফায় বসেন চারজন সুন্দরী নারী। পর্যায়ক্রমে ওই নারীরা তাদের কাছে ঘেঁষার চেষ্টা করেন। কিছু সময় পর সামনে আসেন এক ব্যক্তি। অভিযোগ, টুকুরা ওই নারীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেছেন। বলা হয়, এগুলো ভিডিও করে রাখা হয়েছে। তাদের কোনোভাবেই যেতে দেওয়া হবে না। পুলিশ আসছে। হতবিহ্বল হয়ে পড়েন টুকুসহ চারজন। একপর্যায়ে তাদের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করে পাপিয়া গ্যাং। নইলে থানায় শ্লীলতাহানির মামলা। কোনো উপায় না পেয়ে টুকুরা তাদের সঙ্গে থাকা ২০ হাজার টাকা দিয়ে দেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও পুলিশ আসেনি। শুরু হয় আমানুষিক নির্যাতন। টানা দুই দিন নির্যাতন শেষে ব্যাংকের মাধ্যমে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা পরিশোধের পর মুক্তি মেলে ভুক্তভোগী টুকুদের। এ তো গেল মাত্র একটি ঘটনা। এই ভুক্তভোগী টুকু অভিযোগ করতেও গিয়েছিলেন রাজধানীর বিমানবন্দর থানায়। তবে থানা কর্তৃপক্ষ ঘটনার স্থান নরসিংদী হওয়ায় ওই অভিযোগ গ্রহণ করেনি। পরামর্শ দিয়েছে নরসিংদীতে যোগাযোগ করতে। এমন অসংখ্য ভুক্তভোগী রয়েছেন যারা যুব মহিলা লীগের সদ্যবহিষ্কৃত নেত্রী শামীমা নূর পাপিয়া গ্যাংয়ের শিকার হয়েছেন। তাদের মৌখিক ও লিখিত অভিযোগের সংখ্যা রীতিমতো পাহাড়সম বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র। এরই মধ্যে তাদের অনেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে অবহিত করেছেন। তবে তাদের বেশির ভাগই সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ হওয়ার আশঙ্কায় লিখিত অভিযোগ জমা দেননি।

গত বৃহস্পতিবার ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) আবদুল বাতেন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পাপিয়ার বিরুদ্ধে যে কোনো ভুক্তভোগী অভিযোগ করতে পারেন। অভিযোগ পেলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে জড়িত প্রমাণ পেলে পাপিয়া দম্পতির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে আরও একটি অভিযোগের বিষয়ে জানা গেছে, নরসিংদীতেই গ্রামের বাড়ি এক ব্যবসায়ীর। পরিবার নিয়ে বসবাস করেন রাজধানীর একটি অভিজাত এলাকায়। পাপিয়া তার পূর্বপরিচিত। তখনো তিনি পাপিয়ার অন্য চরিত্র সম্পর্কে অবহিত না থাকায় তার আমন্ত্রণে সরল বিশ্বাসেই গিয়েছিলেন বাগদীর বাসায়। ড্রইং রুমে চলছিল গল্প-আড্ডা। কিছু সময় পর পাপিয়া অন্য কক্ষে যাওয়ার পরই সেখানে আসেন দুই সুন্দরী যুবতী। হঠাৎ করেই চলে যায় বিদ্যুৎ। দুই যুবতী তার কাছে এসে তাকে জোর করে জড়িয়ে ধরেন। জোর করেও ওই ব্যক্তি তাদের সরাতে পারছিলেন না। কিছু সময়ের মধ্যেই বিদ্যুৎ চলে আসায় দেখেন এক ব্যক্তি তাদের ছবি ওঠাচ্ছে। ঘটনাস্থলে আবারও পাপিয়ার আগমন। সঙ্গে তার স্বামী মফিজুর রহমানব চৌধুরী ওরফে মতি সুমন। ইন্টারনেটে ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তার কাছ থেকে হাতিয়ে নেন ৫ লাখ টাকা। পরে বিভিন্ন সময় তাকে জিম্মি করে হাতিয়ে নেন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা। তদন্তসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, ‘পাপিয়ার শিকার এমন অনেকের বিষয়েই আমরা জানতে পেরেছি। আমরা পর্যায়ক্রমে তাদের সঙ্গে কথা বলব। আসলেই কি তারা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের শিকার হয়েছেন, নাকি স্বেচ্ছায় পাপিয়ার ডেরায় গিয়েছিলেন।’
জানা গছে, মফিজুর দম্পতির প্রতারণার শিকার ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ ও অনৈতিক কাজে বাধ্য হওয়া মেয়েরা ‘মুখ খুলতে’ শুরু করেছেন। র‌্যাবের হাতে গ্রেফতারের পর পাপিয়া দম্পতির প্রতারণার শিকার মেয়েরা পাপিয়ার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। কীভাবে তাদের এই পথে এনেছেন পাপিয়া, সবিস্তারে তার বর্ণনা করেছেন।

ব্যবসায়ী টুকুর অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করে গতকাল বিকালে বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) বি এম ফরমান আলী বলেন, ‘ঘটনা শোনার পর পাপিয়া ও তার স্বামীকে টুকুর মুখোমুখি করা হয়েছিল। তারা প্রতারণার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে ঘটনা যেখানে ঘটেছে সেই নরসিংদী এলাকায় মামলা করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে টুকুকে। এ ছাড়া মামলা এখন গোয়েন্দা পুলিশের কাছে। প্রয়োজনে টুকু গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’

এদিকে গতকাল ভুক্তভোগী টুকু বলেন, ‘ওই দুঃসহ স্মৃতি মনে হলে এখনো শিউরে উঠি। টানা দুই দিন আমি এবং আমার সঙ্গের আরও তিনজনের ওপর চলে স্টিমরোলার। কয়েক দফায় আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জোর করে আমার সঙ্গে ওই মেয়েদের অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে পাপিয়া। তার সহযোগী সাব্বিরের নেতৃত্বে চলে নির্যাতন। পাপিয়া ও তার স্বামী আমাকে হুমকি দিয়ে বলেন, এখান থেকে পার পেতে হলে আপনাকে ১০ লাখ টাকা দিতে হবে। নইলে এ ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল করে দেব। ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেব। আপনার নামে মানব পাচারের মামলা দেওয়া হবে। মানসম্মানের ভয়ে আমি তৎক্ষণাৎ ২০ হাজার টাকা দেওয়ার পরও তাদের মন গলেনি। বারবার মারধর করে। বাড়ির ছাদে আটকে রাখে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘটনার শুরু শুক্রবার। রবিবার দুপুরে সোনালী ব্যাংকের মাধ্যমে ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা আনিয়ে দিলে ওইদিন বিকালে তারা আমাদের ছেড়ে দেয়।’

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here