শারুনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা মুনিয়ার ভাইয়ের

নাজমুল হক ভুঁইয়াঃ

রাজধানীর গুলশানের ফ্ল্যাট থেকে মরদেহ উদ্ধার হওয়া মোসারাত জাহান মুনিয়ার (২১) মৃত্যুকে ‘হত্যা’ উল্লেখ করে এবার হত্যা মামলা করেছেন তার বড় ভাই মো. আশিকুর রহমান সবুজ। মামলায় তিনি আসামি করেছেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সামশুল হক চৌধুরীর ছেলে নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনকে।

গতকাল রবিবার ঢাকা মহানগর হাকিম মোর্শেদ আল মামুন ভূঁইয়ার আদালতে এ মামলা করেন তিনি। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে একই ঘটনায় এর আগে গুলশান থানায় আত্মহত্যার প্ররোচনার অভিযোগে হওয়া মামলার তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যা মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম স্থগিত রাখার আদেশ দিয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আবু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। আদালত থেকে পাওয়া নথি অনুযায়ী, আশিকুর রহমান  সবুজের মামলার আর্জিতে বলা হয়েছে, ‘আমরা তিন ভাইবোনের মধ্যে মোসারাত জাহান মুনিয়া তৃতীয়। তার বয়স ২১ বছর। সে মাধ্যমিক শেষ করে মিরপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের একাদশ শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিল। আমরা পরিবারের পক্ষ থেকে পড়াশোনার জন্য যথাসাধ্য সহযোগিতা করে আসছিলাম।

ইতিমধ্যে আসামি নাজমুল করিম চৌধুরী শারুনের সঙ্গে আমার বোনের পরিচয় হয়। পরিচয়ের পর থেকে মাঝেমধ্যে আসামি শারুনের সঙ্গে কথাবার্তা ও দেখা-সাক্ষাৎ হতো মুনিয়ার। আমার বোনকে হত্যার আগে তার কাছ থেকেই আমি এসব কথা জেনেছি ও শুনেছি। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখ ও পরিতাপের বিষয় গত দুই বছর আগে আমার বোন নুসরাত জাহান (তানিয়া) ও তার স্বামী মিজানুর রহমানের জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করে গুলশানে ১২০ নম্বর সড়কের ১৯ নম্বর বাড়িতে ফ্ল্যাট ভাড়া করে। সেখানে আমার ছোট বোন নুসরাত আমার অপর ছোট বোন মুনিয়াকে ওই বাসায় অবস্থানের নির্দেশ দেয়। সেই মোতাবেক মুনিয়া সেখানে অবস্থান শুরু করে।’

আর্জিতে আরও বলা হয়, ‘আমার বোনের সঙ্গে সায়েম সোবহান আনভীরের কেবলই বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিল। এখানে উল্লেখ্য যে, সায়েম সোবহান আনভীর এবং নাজমুল করিম শারুনের মধ্যে ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব ছিল। আসামি শারুন অধুনা মৃতা বোন মুনিয়ার মাধ্যমে সায়েম সোবহান আনভীরের ব্যবসায়িক ও ব্যক্তিগত অনেক গোপন তথ্য কৌশলে মুনিয়াকে ব্যবহার করে জেনে নেয়। আমার সরল ও কোমলমতি বোন প্রথম অবস্থায় কিছু বুঝতে না পারলেও পরবর্তীতে সম্পূর্ণ বিষয় বুঝতে পেরে একপর্যায়ে মুনিয়া শারুনের অসৎ উদ্দেশ্য ও অনৈতিক কাজে সহযোগিতা করতে অসম্মতি জ্ঞাপন করে, তাতে করে শারুন মুনিয়ার ওপর চরমভাবে ক্ষিপ্ত হয় এবং প্রতিশোধ নেওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকে এবং মানসিকভাবে ভীষণ চাপ প্রয়োগ করতে থাকে।

বিষয়টি আমাকেসহ পরিবারের সকলকে আমার অধুনা মৃতা বোন মুনিয়া অবগত করে, আমি  বিষয়টি আমার মেজো বোন তানিয়ার সঙ্গে আলোচনা করলে সে বলে, “এসব কিছুই হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে।” উপরোক্ত ঘটনার আলোকে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, মুনিয়াকে আনভীরের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে না পেরে শারুনই আমার বোনকে তার সহযোগীদের নিয়ে হত্যা করে।’

আর্জিতে তুলে ধরা তথ্যমতে, ‘ঘটনার দিন ও সময়ে আমার মেজো ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান তার মোবাইল ফোন থেকে সন্ধ্যা ৬টা ৪৯ মিনিটে আমাকে কল করে জানায়, মুনিয়া ঢাকায় আত্মহত্যা করিয়াছে। তাদের কাছ থেকে ঘটনা শুনিয়া আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি এবং বারবার মূর্ছায় যেতে থাকি। পরের দিন গত ২৭ এপ্রিল বিকেল সাড়ে ৪টায় আমার মেজো বোন নুসরাত জাহান তানিয়া এবং ভগ্নিপতি মিজানুর রহমান মৃতা মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ নিয়ে কুমিল্লা আসে। তারপর আমরা দাফন-কাফনের কাজ শেষ করিয়া আমি ঢাকায় ফিরে আসি। তখন শুনতে পারি, আমার বোন (নুসরাত) প্রকৃত ঘটনা না জেনে শুধু সায়েম সোবহান আনভীরকে আসামি করে গুলশান থানায় দ-বিধি ৩০৬ ধারায় (আত্মহত্যার প্ররোচনা) মামলা দায়ের করেন।

এ বিষয়ে আমাদের কারো সাথে কোনো আলোচনা করে নাই। আমি ঢাকায় আসিয়া ঘটনাস্থলে যাইয়া বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে শুনি এবং বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সংবাদ/নিউজের মাধ্যমে এবং আমার মৃতা বোনের মোবাইল ডিভাইস থেকে সংগৃহীত কথোপকথনের স্ক্রিনশট দেখি এবং পড়ি। পরবর্তীতে আমার মেজো বোন নুসরাত জাহান তানিয়ার কাছ থেকে শুনে এবং উপস্থিত লোকজনের কাছ থেকে প্রকৃত বিষয়টি জেনে বিশেষ করে এজাহারের ভাষ্য অনুযায়ী, “পুলিশসহ ভিতরে প্রবেশ করে দেখতে পায় ফ্যানের সঙ্গে ঝুলানো পা বিছানার সঙ্গে লাগানো এবং সামান্য বাঁকানো দুই পা ছিল।” ইহাতে যেকোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব যে, পা যদি খাটের ওপর লাগানো থাকে সেটা কোনো অবস্থায় তা আত্মহত্যা নয়, ইহা একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, আমার বোনকে হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে এই আত্মহত্যার মিথ্যা নাটক উপস্থাপন করা হয়েছে।’

আশিকুর তার এজাহারে আরও লেখেন, ‘আসামি নাজমুল করিম শারুন আমার কোমলমতি বোনকে অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার ও ভোগ করেছে। আমার অধুনা মৃতা বোন মুনিয়া যখনই এই ঘৃণ্য চক্রান্ত থেকে বের হয়ে ফেরত আসতে চেয়েছে তখনই শারুন আমার বোন মুনিয়ার ওপর চরম ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাক্ষী, আমার বোন তানিয়ার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মিয়াছে যে, নাজমুল করিম চৌধুরী শারুন সুকৌশলে আমার বোনের ফ্ল্যাটে ঢুকে অজ্ঞাতনামা আসামিদের সহযোগিতায় নির্মমভাবে হত্যা করে মুনিয়ার মৃতদেহ ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে এবং কৌশলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। এখানে উল্লেখ্য যে, উক্ত ফ্ল্যাটের ডুপ্লিকেট চাবি শারুনের নিকটও থাকত এবং মূল দরজার তালা উভয় দিক থেকে লাগানো যায়। যেহেতু আসামি উল্লিখিত ঘটনা ঘটাইয়া (ফৌজদারি দণ্ডবিধির) ৩০২/৩৪ ধারায় অপরাধ করিয়াছে, তদবিষয়ে সুবিচার এবং বিজ্ঞ আদালতের ন্যায়ানুগ আদেশ প্রার্থনা করে।’

বিলম্বে এজাহার দায়ের বিষয়ে বাদী লিখেছেন, ‘লাশ দাফন-কাফন শেষ করে এবং কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসিয়া তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে, ঘটনা ভালোভাবে জানিয়া ও শুনিয়া, বিভিন্ন পত্রিকার কপি সংগ্রহ ও মুরব্বিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করিয়া গুলশান থানায় এজাহার দায়ের করিতে গেলে, থানা কর্র্তৃপক্ষ এজাহার গ্রহণ না করিলে বিজ্ঞ আদালতে মামলা দায়ের করিতে কিছুটা বিলম্ব হয়।’

এই মামলায় সাক্ষী করা হয়েছে মুনিয়ার চাচা মো. শাহদাত হোসেন সেলিম ও ভাবি উম্মে কুলছুম জেরিনকে। এছাড়া এজাহারে আরও সাক্ষী হাজিরের কথা বলা হয়েছে।

গত ২৬ এপ্রিল মুনিয়ার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধারের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুনিয়া ও শারুনের কথোপকথনের কয়েকটি স্ক্রিনশট ছড়িয়ে পড়ার পরিপ্রেক্ষিতে হুইপপুত্র শারুন চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে পুলিশ। এছাড়া গুলশান থানায় দায়ের করা মামলার বাদী নুসরাত জাহানও স্বীকার করেছেন, মুনিয়ার সঙ্গে আনভীরের একটি ছবি দিয়ে শারুন তাকে ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করে। তাছাড়া শারুনের সঙ্গে মুনিয়ার ঘনিষ্ঠতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন নুসরাত।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here