সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকার চাকরি ও মানবিকতা

এ কে এম শহীদুল হক

0
4

গত প্রায় দুই বছর ধরে মিডিয়ার বদৌলতে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে সৌদি আরবে চাকরি নিয়ে যাওয়া গৃহপরিচারিকারা নির্যাতিত হয়ে দেশে ফিরে আসছেন। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের তত্ত্বাবধানে তাঁরা দেশে ফিরছেন এবং বাংলাদেশ সরকার তাঁদের কিছু ক্ষতিপূরণের অর্থও প্রদান করছে। গত প্রায় দুই বছরে দুই সহস্রাধিক নারী গৃহকর্মী দেশে ফিরেছেন। তাঁদের প্রায় সবাই নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছেন বলে দেশে ফেরত গৃহপরিচারিকারা অভিযোগ করেছেন। অনেকের শরীরে নির্যাতনের চিহ্নও বিদ্যমান। কেউ ভাঙা পা নিয়ে, কেউ শরীরে জখমের চিহ্ন নিয়ে এবং কেউ বা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন। সেদিন ফিরে এলেন সুমি, যাঁর ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

২০১৫ সালে বাংলাদেশ ও সৌদি সরকারের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির আলোকে বাংলাদেশ সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকা পাঠানো শুরু করে। গত পাঁচ বছরে প্রায় দুই লাখ গৃহপরিচারিকা সৌদি আরবে পাঠানো হয়েছে। সৌদি আরবে যেতে তাঁদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হয়নি। সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে বাংলাদেশের প্রায় সাত লাখ নারী শ্রমিক বর্তমানে কর্মরত।

বাংলাদেশে থেকে সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকা পাঠানোর আগে ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া ওই দেশে গৃহপরিচারিকা পাঠাত। গৃহপরিচারিকাদের ওপর অমানবিক শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের এবং চুক্তি মোতাবেক বেতন না দেওয়ার ব্যাপক অভিযোগ পাওয়ার পর এবং অভিযোগগুলো বেশির ভাগ সত্য প্রমাণিত হওয়ায় ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকা পাঠানো বন্ধ করে দেয় এবং তাদের দেশের মেয়েদের সৌদি আরব থেকে নিজ দেশে ফেরত নিয়ে যায়।

ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া থেকে গৃহপরিচারিকা আনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৌদি সরকার বাংলাদেশ থেকে গৃহপরিচারিকা নেওয়ার প্রস্তাব দেয়। সেই প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকা পাঠানোর জন্য সৌদি আরবের সঙ্গে ২০১৫ সালে চুক্তি করে। মাসিক ৮০০ সৌদি রিয়াল (১৭০০০ টাকা) বেতনে দুই বছর চুক্তিতে গৃহপরিচারিকা সৌদি আরবে পাঠানো শুরু হয়।

অভিযোগ উঠেছে, যেসব শর্তে নারী শ্রমিক তথা গৃহপরিচারিকারা সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, সেসব শর্তের বেশির ভাগই মানা হয় না। নিয়মিত বেতন দেওয়া হয় না, কাজের ধরন ও পরিবেশ শর্ত মোতাবেক থাকে না, অনেকের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন করা হয়। দেশে ফেরত আসা গৃহপরিচারিকাদের কাছ থেকে আরো জানা যায় যে অমানবিকভাবে প্রহার, জ্বলন্ত বস্তু দ্বারা শরীরে আঘাত, লাথি মেরে সিঁড়ির মধ্যে ফেলে দেওয়া, দুই-তিন দিন একটি প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা, অশ্লীল ভাষায় বকাবকি করা, দৈনিক ১৮ থেকে ২০ ঘণ্টা পরিশ্রম করানো, খাবার ঠিকমতো না দেওয়াসহ নানা ধরনের নির্যাতন গৃহপরিচারিকাদের ওপর চলে। মিডিয়া রিপোর্ট থেকে জানা যায়, অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রগ্রাম নামের একটি সংস্থা ফেরত আসা ১১০ জনের মধ্যে এক জরিপ করে। জরিপে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ নারী শারীরিকভাবে নির্যাতিত হয়েছেন। ১৪ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ৮৬ শতাংশ চুক্তি মোতাবেক পূর্ণ বেতন পাননি। ২৪ শতাংশ গৃহপরিচারিকাকে নিয়োগকর্তারা ঠিকমতো খাবার দিতেন না। গত ৯ মাসে ৪৮ জন গৃহপরিচারিকার মৃতদেহ বাংলাদেশে ফেরত আসে। ব্র্যাকের Migration Programme-এর মতে, নির্যাতনের সংখ্যা আরো বেশি। নির্যাতন এবং অমানবিক ও বর্বর আচরণের শিকার হয়ে দুই বছর চুক্তি শেষ হওয়ার আগে পাঁচ-সাত মাসের মধ্যেই বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় দুই সহস্রাধিক গৃহপরিচারিকা দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসের পরিচালনায় Safe Home-এ আরো নারী কর্মী দেশে ফেরার অপেক্ষায় আছেন।

Bangladesh Association of International Recruiting Agencies (BAIRA) এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, সৌদি আরব থেকে ফেরত আসা গৃহপরিচারিকার সংখ্যা মোট সংখ্যার ১০ শতাংশ। বাকিরা সৌদিতে কর্মরত। তাঁদের মতে, অনেকে সৌদি আরবে যাওয়ার পর Home Sickness-এ ভোগেন, আরবি না জানার কারণে কাজে ও সৌদি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারেন না ইত্যাদি কারণেও দেশে ফিরে এসেছেন। নির্যাতনের যে অভিযোগ পেয়েছে, তা নিয়ে বাংলাদেশ দূতাবাস সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করছে এর একটা সমাধান বের করার জন্য।

অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে এর প্রতিকার সৌদি সরকারকেই করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাসকেও এর প্রতিকারের জন্য কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া তাদের মেয়েদের ওপর অমানবিক নির্যাতনের কারণে সৌদিতে গৃহপরিচারিকা পাঠানো বন্ধ করে দিল এবং তাদের মেয়েদের দেশে ফিরিয়ে নিল, সেই অবস্থায় বাংলাদেশ কেন সৌদিতে গৃহপরিচারিকা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে সৌদি সরকারের সঙ্গে চুক্তি করল, এটা বোধগম্য নয়। জানা যায়, সৌদি আরবে গৃহপরিচারিকাদের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতন হচ্ছে মর্মে প্রতিবেদন প্রকাশ করার পর বাংলাদেশ থেকে নারীরা সৌদিতে যেতে আগ্রহী ছিলেন না। তার পরও সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সৌদিতে গৃহপরিচারিকা পাঠানো হয়। এটা বড়ই দুঃখজনক ও দেশের জন্য অপমানজনকও বটে। আমাদের দেশের মেয়েরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে গিয়ে স্বল্প বেতনে অনেক পরিশ্রম ও কষ্টের কাজ করেন। বেতন-মজুরিও সন্তোষজনক নয়, থাকা-খাওয়াও ভালো নয়। ভারত অনেক বছর আগে থেকেই অদক্ষ শ্রমিক বা জনশক্তি বিদেশে পাঠানো বন্ধ রাখছে। দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির জন্যই এ ব্যবস্থা ভারত নিয়েছে।

বাংলাদেশের কিছু কিছু জনশক্তি রপ্তানি এজেন্সি ও দালালদের প্ররোচনায় পড়ে অনেকে বিদেশে গিয়ে দুর্ভোগের মধ্যে পড়েন। কিন্তু প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সংস্থা কর্তৃক এসব এজেন্সি ও দালালের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দৃষ্টান্ত বিরল। যার কারণে প্রতারকচক্রের কবলে নিরীহ লোক হয়রানির শিকার হয়েই যাচ্ছে।

প্রান্তিক পরিবারের একজন খেটে খাওয়া মানুষ—পুরুষ হোক বা মেয়ে হোক, দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে সংসারে কিছুটা আর্থিক সচ্ছলতা আনার আশায় অনেক স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমান। বিদেশে যাওয়ার পর তাঁদের অনেকের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হওয়া তো দূরের কথা, পক্ষান্তরে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। এর চেয়ে দুঃখের ও কষ্টের কী হতে পারে?

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার গত এক দশকে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছে। সব সেক্টরে প্রভূত উন্নয়ন হচ্ছে। বিদেশে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে। কিন্তু সৌদি আরবে বৈরী পরিবেশে গৃহপরিচারিকা পাঠানো কি বাংলাদেশের ভাবমূর্তিতে আঘাত হানার শামিল নয়? দেশের উন্নয়নের সঙ্গে স্বল্প বেতনে বিদেশে বৈরী পরিবেশে লাখ লাখ গৃহপরিচারিকা পাঠানোর সামঞ্জস্য খুঁজে পাওয়া যায় না। এতে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ হতদরিদ্র ও অভাব-অনটনের দেশ হিসেবে চিত্রায়িত হচ্ছে। তাই দেশের মেয়েদের সম্ভ্রম ও নির্যাতনের বিনিময়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা কতটুকু যৌক্তিক, তা সংশ্লিষ্টদের ভেবে দেখার প্রয়োজন আছে।

বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য উন্নয়ন ও বাস্তব আর্থ-সামাজিক দৃশ্যপটের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখা এবং দেশের ভাবমূর্তি বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশে গৃহপরিচারিকা পাঠানো ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর বিষয়ে নতুন করে চিন্তা করা প্রয়োজন। বিদেশে পরিচারিকা পাঠাতে হলে তাঁদের অন্ন, বস্ত্র, নিরাপত্তা, মানবিকতা ও সম্ভ্রমকে অগ্রাধিকার দিয়ে শর্ত আরোপ করতে হবে এবং সেই শর্তাবলি প্রতিপালিত হচ্ছে কি না তা নিশ্চিত করার জন্য দূতাবাসের কর্মকর্তা, মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি ও সৌদি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যৌথ পরিদর্শন ও মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। শর্ত ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আইনের বিধান থাকতে হবে, যা ওই দেশের পুলিশ প্রয়োগ করবে। বিদেশে লোক পাঠানোর আগে তাঁদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে। সেখানকার পরিবেশ সম্পর্কে সঠিক ব্রিফিং প্রদান করাও আবশ্যক। পুস্তিকা আকারে পেশাভিত্তিক স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (SOP) থাকাও প্রয়োজন।

লেখক : সাবেক আইজিপি, বাংলাদেশ পুলিশ

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here