স্বপ্নদ্রষ্টাদের হারিয়ে শোকে পাথর অর্থনীতি

0
7

আমার কাগজ প্রতিবেদক :
দীর্ঘ সংগ্রামের মাধ্যমে সচল করেছেন দেশের অর্থনীতি। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্ন বিনির্মাণে গড়ে তুলেছেন অসংখ্য শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সৃষ্টি করেছেন কর্মসংস্থান। দেশকে করেছেন সমৃদ্ধ। করোনার ছোবলে সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের হারিয়ে শোকে বিহ্বল সমগ্র জাতি। হ্যাঁ, করোনায় মারা যাওয়া বেসরকারি উদ্যোক্তাদের কথা বলছি।

সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক সংগঠন, প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সূত্রে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত দেশে মহামারি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে শীর্ষ ৩০ ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা ও শিল্পপতির মৃত্যু হয়েছে।

করোনার কাছে হার মেনেছেন বাংলাদেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ীগোষ্ঠী যমুনা গ্রুপের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল, সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার, দেশের শীর্ষসারির শিল্পপতি পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও সাবেক সংসদ সদস্য এম এ হাশেম, এস আলম গ্রুপের পরিচালক মোরশেদুল আলম এবং আকিজ ফুটওয়্যারের পরিচালক শেখ মোমিন উদ্দিনসহ অনেক শিল্পপতি।

সর্বশেষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার। দুবাইয়ের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১০ ফেব্রুয়ারি তিনি মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৯১ বছর। পাওয়ার প্যাক পোর্টস, পাওয়ার প্যাক ইকোনমিক জোন, সিকদার ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড, পাওয়ার প্যাক হোল্ডিংস, সিকদার রিয়েল এস্টেট ও মাল্টিপ্লেক্স হোল্ডিংসসহ গড়ে তুলেছিলেন একাধিক শিল্প প্রতিষ্ঠান। এছাড়া কয়েকটি মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ও প্রতিষ্ঠা করেছেন জয়নুল হক সিকদার।

এর আগে না ফেরার দেশে পাড়ি দেন পারটেক্স গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও নোয়াখালী-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম এ হাশেম। গত ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ১টা ২০ মিনিটে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ১১ ডিসেম্বর কারোনা শনাক্ত হওয়ার পর এম এ হাশেমকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৬ ডিসেম্বর থেকে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে (আইসিইউ) লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়।

করোনাকালে বেড়েছে বেকার, কমেছে কর্মসংস্থান
দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে প্রথম প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হন প্রিন্স গার্মেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. তাসলিম আক্তার। গত বছরের ৯ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

করোনায় প্রাণ হারান এস আলম গ্রুপ ও এনআরবি গ্লোবাল ব্যাংকের পরিচালক মোরশেদুল আলম। তিনি এস আলম সুপার এডিবল অয়েল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং চেমন ইস্পাত লিমিটেডের চেয়ারম্যান ছিলেন। গত ২২ মে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে মারা যান ৬৫ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী।

গত বছর ৩০ মে শান্ত-মারিয়াম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা মো. ইমামুল কবির শান্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, সুন্দরবন কুরিয়ার সার্ভিস, শান্তনিবাসের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন।

বেসরকারি হাসপাতাল পপুলারের চেয়ারপারসন তাহেরা খানম করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত বছরের ১০ জুন মারা যান। করোনা পজিটিভ থাকা অবস্থায় হৃদরোগজনিত কারণে তিনি রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। সেখানেই তার মৃত্যু হয়।

গত বছরের ২৫ জুন শিল্পপতি হাসান জামিল সাত্তার করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তিনি ময়নামতি টেক্সটাইল মিলস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তার বয়স হয়েছিল ৭০ বছর।

করোনায় আক্রান্ত হয়ে ৬৬ বছর বয়সে মারা যান দেশের চা-শিল্পের খ্যাতিমান ব্যবসায়ী আফসার মঈন। গত বছরের ২৮ জুন তার মৃত্যু হয়। তিনি সুরমা টি-স্টেট ও কেএস ব্রোকার লিমিটেডের পরিচালক ছিলেন।

একই মাসের ৭ তারিখে করোনা নিয়ে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আফসার মঈনের ভাই বিশিষ্ট শিল্পপতি আজমত মঈন। তিনি মৌলভী চা-কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যান, সুরমা চা-কোম্পানির পরিচালক এবং অবিভক্ত বাংলার শিক্ষা ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী নবাব মোশারফ হোসেনের প্রপৌত্র। তার বয়স হয়েছিল ৬৮ বছর।

করোনায় না ফেরার দেশে পাড়ি দেন বাংলাদেশের অন্যতম বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবুল। গত বছরের ১৩ জুলাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। দৈনিক যুগান্তর, যমুনা টেলিভিশন এবং যমুনা ফিউচার পার্ক যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে (সাবেক অ্যাপোলো) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নুরুল ইসলাম বাবুল। তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। গত ১৪ জুন তিনি করোনায় আক্রান্ত হন।

কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ আগস্ট দেশের অন্যতম বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী আকিজ গ্রুপের পরিচালক শেখ মোমিন উদ্দিনের মৃত্যু হয়। শ্বাসকষ্টসহ করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে তিনি রাজধানীর মগবাজার আদ্-দ্বীন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

গত ২৮ সেপ্টেম্বর করোনার কাছে হার মানেন চট্টগ্রামের শিল্পপতি হাসান মাহমুদ চৌধুরী। তিনি চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় আবাসিক এলাকা চান্দগাঁও আবাসিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি ও কাশেম-নুর ফাউন্ডেশনের কো-চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন লাতিন আমেরিকা বাংলাদেশ চেম্বারের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও থাই চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। হাসান মাহমুদ জাতীয় পার্টির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন বাবলুর ছোট ভাই।

করোনা মহামারিতে প্রাণ হারান দেশের অনেক স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তা। তাদের মধ্যে মোনেম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবদুল মোনেম খান ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমানের মতো বেশ কয়েকজন প্রথিতযশা ব্যবসায়ী রয়েছেন।

এছাড়া করোনাকালে মারা যান পোশাক খাতের ব্যবসায়ী অ্যাপারেল ফেয়ারের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হুমায়ুন মাহমুদ, বাংলাদেশ হোটেল অ্যান্ড গেস্ট হাউজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সদস্য সাদিক আহসান, বাংলাদেশ প্লাস্টিক রাবার সু মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন ও সাবেক এফবিসিসিআই সদস্য হাজী মো. মনসুর আলী, বাংলাদেশ পেপার মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি আলহাজ সিরাজ উদ্দিন দেওয়ান, বাংলাদেশ পাথর ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি হাজী নুরুল ইসলাম, বাংলাদেশ ড্রেস মেকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হাজী মো. আবদুল কালাম আজাদ, বাংলাদেশ রি-রোলিং মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি ও সাবেক এফবিসিসিআই পর্ষদ সদস্য আবু বকর সিদ্দিক, বাংলাদেশ চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আলহাজ শের মোহাম্মদ, ন্যাশনাল কোল্ড স্টোরেজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. কামরুল হুসেন চৌধুরী (গোর্কি), বাংলাদেশ মনিহারি বণিক সমিতির সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান, বাংলাদেশ মেটাল ওয়্যার অ্যান্ড ওয়্যারনেইলস মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশন সহ-সভাপতি মো. মোবারক হোসেন, রয়েল ট্রেডিং করপোরেশনের স্বত্বাধিকারী বদরুল হুদা মুকুল, এফবিসিসিআইয়ের সদস্য মো. হাবিবুল্লাহ ও বাংলাদেশ পোদ্দার সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের সদস্য মো. বাচ্চু মিঞা, ইস্ট ওয়েস্ট ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের চেয়ারম্যান হারুন-অর-রশিদ, রহমত গ্রুপের চেয়ারম্যান আলহাজ মোহাম্মদ আলী সরকার, এনএফকে টেক্সটাইলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আবদুল মান্নান, পার্ল প্রিনস বিডি লিমিটেডের চেয়ারম্যান তসলিম আক্তার।

মারা যাওয়া ব্যবসায়ীদের মধ্যে আরও আছেন আলী যাকের। অভিনেতা, মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। দেশের বৃহৎ বিজ্ঞাপনী সংস্থা এশিয়াটিক থ্রিসিক্সটি’র কর্ণধার ছিলেন তিনি। গত ২৩ নভেম্বর তার করোনা পজিটিভ আসে এবং ২৭ নভেম্বর মারা যান। তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর।

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সানবিমস স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ নিলুফার মঞ্জুর ২৬ মে মারা যান। নিলুফার মঞ্জুর দেশের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও এপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মঞ্জুর এলাহীর স্ত্রী।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনের উহানে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়। সেখানে প্রথম কোনো রোগীর মৃত্যু হয় ২০২০ সালের ৯ জানুয়ারি। তবে তার ঘোষণা আসে ১১ জানুয়ারি। ১৩ জানুয়ারি চীনের বাইরে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় থাইল্যান্ডে। পরে বিভিন্ন দেশে তা ছড়িয়ে পড়ে। ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পরিপ্রেক্ষিতে ওই বছরের ৩০ জানুয়ারি বৈশ্বিক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ২ ফেব্রুয়ারি চীনের বাইরে করোনায় প্রথম কোনো রোগীর মৃত্যু হয় ফিলিপাইনে।

বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় ২০২০ সালের ৮ মার্চ। ১৮ মার্চ প্রথম একজনের মৃত্যুর কথা জানায় স্বাস্থ্য অধিদফতর। অধিদফতরের সর্বশেষ (৭ মার্চ) তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা আট হাজার ৪৬২ জন। আক্রান্তের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৪৯ হাজার ৭২৪ জন। মোট সুস্থ হয়েছেন পাঁচ লাখ ৩ হাজার ৩ জন।

করোনাভাইরাস প্রতিরোধে গত ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়। দেশে এখন পর্যন্ত টিকা নিয়েছেন ৩৬ লাখ ৮২ হাজার ১৫২ জন। তার মধ্যে পুরুষ ২৩ লাখ ৫৫ হাজার ৪২৩ জন, নারী ১৩ লাখ ২৬ হাজার ৭২৯ জন। টিকাগ্রহীতাদের মধ্যে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে ৮২৫ জনের।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here