সড়ক পরিবহন : অপরাধের শাস্তি কমছে, শিথিল হচ্ছে চালকদের যোগ্যতা

0
37

আমার কাগজ প্রতিবেদক :

সড়ক পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের আপত্তির মুখে ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশোধিত আইনের খসড়া প্রণয়ন করে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়।

সংশোধিত আইনের খসড়া অনুযায়ী, সড়ক পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের অপরাধের শাস্তি কমছে। সেই সঙ্গে কমছে চালকদের শিক্ষাগত যোগ্যতা।

আইনটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নের আগেই সরকার সংশোধনে যাচ্ছে। এটা সড়কে শৃঙ্খলা ফেরানোর উদ্যোগকে বাধাগ্রস্ত করবে হবে বলে মনে করছেন সড়কের নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।

সড়ক আইন সংশোধনের দাবিতে একাধিকবার আন্দোলনে নামে পরিবহন শ্রমিকরা

অনেক বাধা পেরিয়ে সংসদে পাস হওয়ার পর ২০১৮ সালের ৮ অক্টোবর ‘সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮’ এর গেজেট জারি করা হয়। এরপরও পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের বাধার মুখে আইনটি বাস্তবায়ন করতে পারছিল না সরকার। পরে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর থেকে সরকার সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর ঘোষণা করে।

আইনের কঠোর শাস্তির ধারাগুলো সংশোধনের দাবিতে এরপরও একাধিকবার পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা আন্দোলনে নামে। এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে— এই আশ্বাসে আন্দোলন থেকে সরে এসেছিলেন তারা। এর আগে আইনটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়ে সুপারিশ দিতে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও রেলমন্ত্রীর সমন্বয়ে তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়।

সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা আইনটি সংশোধন করতে যাচ্ছি, এজন্য নিয়ম অনুসারে মানুষের মতামত নিচ্ছি। আগামী ১৩ মে পর্যন্ত মতামত নেয়া হবে। এরপর মতামতসহ খসড়া আমরা আন্তঃমন্ত্রণালয় মিটিংয়ে তুলব। এরপর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠাব।’

তবে সড়ক পরিবহন আইন পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের আগেই এটি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়ার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি সচিব।

নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা)-এর চেয়ারম্যান ও চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘পরিবহন সেক্টরে যারা আছেন তারা সরকারি দলের নেতা। আইনটি পাস হওয়ার পর তারা এটি পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নই করতে দেননি। তারা সংশোধনের জন্য লেগে ছিল। তারা যেটা চাইছেন সেটাই হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘আবার যদি সড়কে ছাত্র মারা যায়, বড় ধরনের আন্দোলন হয়, তবে হয়তো আবার নড়াচড়া হবে। একটা সন্তান ঠিকভাবে জন্মই নিলো না, আর আগেই তাকে অপারেশন করা শুরু করে দিয়েছে! আইনটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা উচিত ছিল, তারপর অসুবিধাগুলো দেখে প্রয়োজনে সংশোধন করা যেত।’

বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহতের পর ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামে শিক্ষার্থীরা

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘পরিবহন সেক্টরে যে নৈরাজ্য চলছে, সেখানে শৃঙ্খলা ফেলাতে আমরা কোনো আশা দেখছি না। কিন্ত আমরা দেখছি পরিবহন সেক্টরের লোকজন যা চাচ্ছে তাই হচ্ছে। এখন করোনা মহামারি চলছে, লকডাউন চলছে। এর মধ্যে এরা এগুলো করছে। মানুষ রাস্তায় নামতে পারবে, তারা মূলত এই সুযোগটা নিচ্ছে। আমরা একটা মিটিং করে সংশোধিত খসড়ার বিষয়ে আমাদের পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।’

যেখানে যেখানে আসছে সংশোধন

সংশোধিত খসড়া আইনে কন্ডাক্টরের পাশাপাশি ‘সুপারভাইজার’ নামে একটি পদ যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ‘হেলপার কাম ক্লিনার’ ও ‘বন্দোবস্তকারী’ নামেও পদ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বর্তমান আইন অনুযায়ী ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে কমপক্ষে শিক্ষাগত যোগ্যতা অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়। সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে, তবে কর্তৃপক্ষ অনুমোদিত তিন চাকা বিশিষ্ট মোটরযান চালানোর ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রাপ্তির ক্ষেত্রে ন্যূনতম পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

বর্তমান আইন অনুযায়ী ফিটনেসের অনুপোযোগী কোনো মোটরযানকে সনদ দেয়া হলে, সনদ দেয়া কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়। এক্ষেত্রে সংশোধিত আইনে বলা হয়েছে, কোনো অবস্থাতেই ত্রুটিপূর্ণ কোনো মোটরযানের ফিটনেস সনদ দেয়া যাবে না।

পণ্যবাহী মোটরযানে এর রেজিস্ট্রেশন সনদে উল্লেখিত আসন সংখ্যার বেশি কোনো ব্যক্তি বহন করা যাবে না বলে সংশোধিত খসড়া আইনে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমান আইনে এমন বিধান নেই।

ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালালে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড পেতে হয়। সংশোধিত খসড়ায় জরিমানা কমিয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে সড়ক পরিবহন আইন দ্রুত পাস হয়

ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রস্তুত, প্রদান বা নবায়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে শাস্তি ৬ মাস থেকে ২ বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ড। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ জরিমানা কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে নকল, ভুয়া বা জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স ব্যবহারের শাস্তিও কমছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয়দণ্ডের প্রস্তাব করা হয়েছে খসড়া আইনে। বর্তমানে এই শাস্তি ৬ মাস থেকে ২ বছরের কারাদণ্ড বা এক থেকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা।

ড্রাইভিং লাইসেন্স স্থগিত, প্রত্যাহার বা বাতিলের পর মোটরযান চালালে বর্তমানে শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এখন জরিমানা কমিয়ে ১৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে।

গণপরিবহনে ভাড়ার তালিকা প্রদর্শন ও নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত টাকা দাবি বা আদায় করলে শাস্তি সর্বোচ্চ ১ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। একই সঙ্গে চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসাবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। সংশোধিত আইনে জরিমানা কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করা ছাড়াও চালকের পয়েন্ট কাটার বিধান বাদ দেয়া হয়েছে।

কোনো কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের (চুক্তিতে ভাড়ার মাধ্যমে পরিচালিত) মালিক নির্ধারিত দিনভিত্তিক জমার অতিরিক্ত অর্থ আদায়, কন্ট্রাক্ট ক্যারিজের ভাড়া সংক্রান্ত মিটার পরিবর্তন এবং রুট পারমিটে বর্ণিত এলাকার মধ্যে যে কোনো গন্তব্যে মিটারে না যাওয়ার শাস্তি ৬ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেয়া হবে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে।

সংশোধন আইনে ড্রাইভিং লাইসেন্স পেতে শিক্ষাগত যোগ্যতা শিথিল হচ্ছে

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী মিটার পরিবর্তনের ক্ষেত্রে এই শাস্তি বহাল থাকবে। মালিক নির্ধারিত দিনভিত্তিক জমার অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও মিটারে না যাওয়ার শাস্তি কমে হয়েছে ৩ মাসের কারাদণ্ড বা ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।

ট্রাফিক সাইন ও সংকেত না মেনে চলার শাস্তি বর্তমানে সর্বোচ্চ ১ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। এক্ষেত্রে কারাদণ্ড উঠিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা।

বর্তমান আইনে অতিরিক্ত ওজন বহন করে মোটরযান চালানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ২ পয়েন্ট কাটা হবে।

সংশোধিত আইন অনুযায়ী, এখন এই জেল-জরিমানা মালিক, প্রতিষ্ঠান, বন্দোবস্তকারী সমিতি, মধ্যস্বত্বভোগী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, পরিবহন ঠিকাদার ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হবে। চালকের ক্ষেত্রে এই বিধান লঙ্ঘনে শাস্তি ৩ মাসের কারাদণ্ড, ২৫ হাজার টাকা জরিমানা এবং অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে।

নির্ধারিত শব্দমাত্রার অতিরিক্ত উচ্চমাত্রার কোনোরূপ শব্দ সৃষ্টি বা হর্ন বাজানো বা যন্ত্র স্থাপনের ক্ষেত্রে এখন শাস্তি সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হয়। এক্ষেত্রে কারাদণ্ড কমিয়ে এক মাস এবং জরিমানাও কমিয়ে ৫ হাজার টাকা করা হচ্ছে।

পরিবেশ দূষণকারী, ঝুঁকিপূর্ণ ইত্যাদি মোটরযান চালালোর শাস্তিও কমছে। এখন এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩ মাসের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড পেতে হয়। একই সঙ্গে চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। সংশোধিত আইনে কারাদণ্ড কমে একমাস এবং জরিমানা কমে হচ্ছে ১০ হাজার টাকা।

মোটরযান পার্কিং এবং নির্ধারিত স্থান ছাড়া যাত্রী বা পণ্য ওঠা-নামার সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা, চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১ পয়েন্ট কাটা হবে। আইন সংশোধন করে সর্বোচ্চ জরিমানা এক হাজার টাকা করা হচ্ছে। বাদ যাচ্ছে পয়েন্ট কাটার বিধান।

বর্তমান আইনের ১০৫ ধারায় বলা হয়েছে, মোটরযান চালনাজনিত কোনো দুর্ঘটনায় গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে তা ‘পেনাল কোড, ১৮৬০’ এর এ সংশ্লিষ্ট বিধান অনুযায়ী অপরাধ বলে গণ্য হবে।

তবে শর্ত থাকে যে, ‘পেনাল কোড, ১৮৬০’ এর সেকশন ৩০৪বি-এ যা কিছুই থাকুক না কেন, কোনো ব্যক্তির বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালনার কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা তার প্রাণহানি ঘটলে, ওই ব্যক্তি (দায়ী) সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

শাস্তি কমছে সড়ক পরিবহন সংক্রান্ত বিভিন্ন ধরনের অপরাধের

তবে সংশোধিত আইনে ‘গুরুতরভাবে কোনো ব্যক্তি আহত’ হওয়ার বিষয়টি বাদ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জরিমানা ৫ লাখ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ লাখ টাকা করা হয়েছে।

বর্তমান আইনে অতিরিক্ত বা বেপরোয়া গতি বা ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং বা ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালানোর ফলে কোনো দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতি সাধিত হয় এবং মোটরযানের নির্মাণ, সরঞ্জাম বিন্যাস ও রক্ষণাবেক্ষণের সংক্রান্ত অপরাধ জামিন অযোগ্য রাখা হয়েছিল। সংশোধিত আইনে তা তুলে দেয়া হয়েছে।

২০১৭ সালের ২৭ মার্চ সড়ক পরিবহন আইনের খসড়াটি নীতিগত অনুমোদন দিয়েছিল মন্ত্রিসভা। এরপর থেমে ছিল উদ্যোগ। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী আইনটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর আইন মন্ত্রণালয় খসড়া আইনটি দ্রুত ভেটিং (পরীক্ষা-নিরীক্ষা) করে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। অল্প সময়ের মধ্যে আইনটি সংসদেও পাস হয়।

 

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here