সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ বাস্তবায়নে অন্তরায়

এ কে এম শহীদুল হক

0
8

গত ৪ অক্টোবর ২০১৮ তারিখে জাতীয় সংসদে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮ পাশ হয়। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ৮ অক্টোবর, ২০১৮ তারিখে আইনের প্রতি সম্মতি প্রদান করেন। কিন্তু সরকার এর কার্যকারিতা তাত্ক্ষণিকভাবে বলবত্ করেনি। ২০১৯ সালের পহেলা নভেম্বর থেকে এ আইনের কার্যকারিতা শুরু হয়। কিন্তু দুই সপ্তাহ আইন সম্পর্কে প্রচারণা এবং সংশ্লিষ্টদের সচেতন করার লক্ষ্যে আইনের কার্যকারিতা স্থগিত রাখা হয়। দুই সপ্তাহ পর সীমিত আকারে আইনের প্রয়োগ শুরু হলে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকেরা মনে-প্রাণে তা মেনে নিতে পারেননি। অনেক জেলায় পরিবহন শ্রমিকেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে গাড়ি চালনা থেকে বিরত থাকেন বলে মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ দাবি করেন। সচেতন নাগরিকদের মতে, এ ধরনের কর্মবিরতির নেপথ্যে মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দের প্রচ্ছন্ন ইন্ধন আছে। ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মালিকেরা সড়ক পরিবহন আইনের বাস্তবায়ন স্থগিতসহ ৯ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে ২০ নভেম্বর থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট আহ্বান করেছিলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনায় তাদের কিছু ছাড় দেওয়ার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে ধর্মঘট প্রত্যাহারের ঘোষণা আসে।

সড়ক ও মহাসড়কে যানবাহন চলাচল ও পরিবহন ব্যবস্থাপনায় চরম বিশৃঙ্খলা, ট্রাফিক আইন মেনে না চলা, বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো, ওভারলোডিং, ওভারস্পিড, চালক ও হেলপারের দায়িত্বহীনতা, গাড়ির ফিটনেস না থাকা, সড়ক নির্মাণ ও ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি ইত্যাদি কারণে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ঘটছে এবং দুর্ঘটনায় যাত্রী ও পথচারীরা আহত ও নিহত হচ্ছে। এ কারণে দেশের সুশীল সমাজ, সচেতন নাগরিক তথা আপামর জনতা সড়ক-মহাসড়কে শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য দীর্ঘদিন যাবত্ একটি কঠোর আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলে আসছিলেন। আইনের খসড়া ২০১২ থেকেই শুরু হয়। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটি দীর্ঘদিন পর্যালোচনা ও যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে খসড়া চূড়ান্ত করে। তারপরও মালিক ও পরিবহন শ্রমিক নেতৃবৃন্দের অনীহা ও নেপথ্যে আপত্তির কারণে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় ভাটা পড়ে। দীর্ঘদিন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে ফাইল বন্ধি থাকে। ২০১৮ সালে ঢাকায় দুই জন ছাত্রের করুণ মৃত্যুর কারণে কোমলমতি ছাত্রছাত্রীদের নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন করার কারণে তড়িঘড়ি করে আইনটি মন্ত্রিপরিষদের সভায় উপস্থাপন করে অনুমোদন নেওয়া হয় এবং পরে জাতীয় সংসদে আইনটি পাশ করা হয়।

পাশ হওয়ার পরও আইনটি এক বছর ফাইলবন্দি ছিল। কার্যকর করা হয়নি। ১৭ নভেম্বর ২০১৯ থেকে যখন কার্যকর শুরু হয়, তখনই পরিবহন মালিক ও নেতৃবৃন্দ এ আইনের কার্যকারিতার বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অবস্থান নেন। পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়ায়, অর্থাত্ খসড়া প্রস্তুত ও পর্যালোচনা সভাগুলোতে উপস্থিত থাকলেও মূলত তারা এ ধরনের আইনের পক্ষে ছিলেন বলে প্রতীয়মান হয় না। যখন আইনের খসড়া মন্ত্রিসভায় যায়, তখন তারা কৌশলগত কারণে আইনের বিরোধিতা করেননি। তখন শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়কের দাবি দেশ জুড়ে গণদাবিতে পরিণত হয়েছিল। ঐ সময় তারা এই আইনের বিপক্ষে গেলে তাদের বিরুদ্ধে জনরোষ সৃষ্টি হতে পারে—এই আশঙ্কায় তারা নীরব ছিলেন। কিন্তু মনে-প্রাণে এই আইনের প্রতি তাদের সমর্থন ছিল না। আইন যখন বাস্তবায়ন শুরু হয়, তখন বিভিন্ন জেলার পরিবহন শ্রমিকেরা গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকেন। তাদের বোঝানো হয়েছে যে দুর্ঘটনায় লোক মারা গেলে চালকের ফাঁসি হবে এবং চালকের বিরুদ্ধে মামলা হলে তারা কখনো জামিন পাবেন না ইত্যাদি ইত্যাদি। এ ধরনের ভীতি মাথায় নিয়ে তারা গাড়ি চালাবেন না। অন্যদিকে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান মালিক সমিতির কথা, তারা তাদের মালের নিরাপত্তা ও ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষার জন্য তাদের পরিবহনে কিছুটা পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন যাবত্ তা চলছে। পুলিশ, প্রশাসন, বিআরটিএ সবাই এটা জানে এবং বাস্তবতার কারণে গাড়ির এই পরিবর্তনের জন্য কোনো সমস্যার সৃষ্টি করেনি। এখন নতুন আইনে এ ধরনের পরিবর্তনের জন্য তিন বছর কারাদণ্ড, অন্যূন এক বছর বা অনধিক ৩ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন। তারা এই সাজার ভয়ে আইনটি স্থগিত বা সংশোধনের দাবিতে ধর্মঘট করছেন।

দুর্ঘটনায় কারো মৃত্যু হলে চালকের মৃত্যুদণ্ড হওয়ার কোনো বিধান নতুন সড়ক পরিবহন আইন কিংবা দণ্ডবিধিতে নেই। তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় চালকের অবহেলা বা বেপরোয়া গাড়ি চালানোর জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে কারো মৃত্যু হয়েছে, সেজন্য সর্বোচ্চ সাজা পাঁচ বছর কারাদণ্ড (ধারা ১০৫)। মৃত্যুদণ্ডের তো কোনো বিধানই নেই। আদালত সাজা কমিয়েও দিতে পারেন।

জামিনের ক্ষেত্রে ৪০টি ধারার (অপরাধসংক্রান্ত) মধ্যে মাত্র তিনটি ধারা জামিন অযোগ্য করা হয়েছে। এগুলো হলো ধারা ৮৪ (মোটরগাড়ির কারিগরির নকশা বিনা অনুমতিতে পরিবর্তন), ধারা ৯৮ (ওভারলোডিং বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে মোটরযান চালানোর কারণে দুর্ঘটনায় জীবন ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন হলে) এবং ধারা ১০৫ (বেপরোয়া বা অবহেলাজনিত মোটরযান চালানোর কারণে সংঘটিত দুর্ঘটনায় কোনো ব্যক্তি গুরুতরভাবে আহত হলে বা কারো প্রাণহানি ঘটলে)। বাকি সব ধারা জামিনযোগ্য। অজামিনযোগ্য ধারার অপরাধেও জামিন হয়। খুন, ডাকাতি, অপহরণের মতো গুরুতর অজামিনযোগ্য অপরাধেও জামিন হচ্ছে। কাজেই জামিন নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর কোনো যুক্তি নেই। এটি পরিবহন শ্রমিকদের ক্ষেপিয়ে তোলার কৌশল।

আইনের ৪৩(৩) ধারায় বর্ণিত আছে, মোটরযানের কারিগরি নকশা পরিবর্তন করা যাবে না। কিন্তু ৪০ (৪) ধারায় উল্লেখ আছে, কর্তৃপক্ষ্যের অনুমোদন নিয়ে এটা পরিবর্তন করা যাবে। কাজেই ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মালিকগণ যে ভয় নিয়ে আইন স্থগিত করে সংশোধনের দাবি তুলেছেন, তার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করি না। তারা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে মালামালের নিরাপত্তার গ্রহণযোগ্য কারণ দেখিয়ে ভূতাপেক্ষা অনুমোদন নিয়ে এ ধরনের পরিবর্তন বৈধ করার সুযোগ নিতে পারেন।

দুর্ঘটনায় মৃত্যু হলে পুলিশ তদন্ত করবে এটাই দেশের আইন। কিন্তু পুলিশের প্রতি মালিক-শ্রমিকের আস্থা নেই। কী অস্বাভাবিক কথা! পুলিশ ও গণপরিবহনের মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দের মধ্যে বরাবরই সুসম্পর্ক থাকে। নতুন আইন হওয়ার পর কী কারণে আস্থার সংকট হলো? ফৌজদারি কার্যবিধিতে ও ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় পুলিশি তদন্ত অন্যের সঙ্গে শেয়ার করার কোনো বিধান নেই। এ ধরনের অযৌক্তিক দাবি উত্থাপন করে পরিস্থিতি ঘোলাটে না করাই শ্রেয়।

সড়ক পরিবহন আইনের আওতায় সব শ্রেণি-পেশার, অর্থাত্ দেশের ১৬ কোটি নাগরিকই পড়বে। এটা শুধু গণপরিবহনের মালিক ও শ্রমিকের জন্য নয়। যেহেতু এ আইনের বিরুদ্ধে একশ্রেণির লোক বিরোধিতা করতে পারে, সেহেতু আইনটি বাস্তবায়নের আগে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা করা উচিত ছিল। মালিক, শ্রমিক, সুশীল সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সভা, সেমিনার, আলোচনা, প্রশিক্ষণ ও উদ্বুদ্ধকরণ কর্মসূচির মাধ্যমে আইনের বিভিন্ন বিষয় অবহিত করা উচিত ছিল। প্রতি জেলায় টার্মিনালে ও বাস-ট্রাক স্ট্যান্ডে একাধিক কর্মসূচির ব্যবস্থা করে পরিবহন শ্রমিকদের আইনের বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে জ্ঞান দান করে আইন মানার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করা অবশ্যই করণীয় ছিল। প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় আইনের ওপর টকশো, আলোচনা ও প্রতিবেদন ছাপিয়ে এবং বিভিন্ন কৌশলে সাধারণ জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা প্রয়োজন ছিল। যোগাযোগ মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ, পুলিশ, মালিক ও শ্রমিকনেতা সবারই এ দায়িত্ব পালন করা উচিত ছিল। কিন্তু একটি বছরের মধ্যে কেউ এ ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে তেমন কোনো তথ্য নেই। এক বছরের দীর্ঘ সময়েও মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ বা পুলিশের কোনো প্রস্তুতি নেওয়ার কার্যক্রম পরিলক্ষিত হয়নি। একটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আইনের ৪৭ নম্বর ধারায় উল্লেখ আছে, সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দ্বারা মোটরযান পার্কিং এলাকা, থামানোর স্থান এবং যাত্রী ও পণ্য ওঠানামার স্থান ও সময় নির্ধারণ করতে পারবে। এই ধারার অধীনে নির্ধারিত এলাকা ছাড়া মোটরযান পার্কিং করলে এবং যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা করলে ৯০ ধারা মোতাবেক দায়ী ব্যক্তি অনধিক ৫ হাজার টাকা অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন এবং চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত হিসেবে দোষসূচক ১(এক) পয়েন্ট কর্তন হবে। এখন প্রশ্ন হলো, কর্তৃপক্ষ এমন কোনো পার্কিং স্থান বা যাত্রী ওঠানামার জন্য সুনির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করেছে কি? আমার জানামতে, এটা করা হয়নি। তাহলে গাড়ি কোথায় পার্ক করবে? মার্কেট, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রেস্তোরাঁ, অফিস-আদালত কোথাও পর্যাপ্ত পার্কিংয়ের ব্যবস্থা কি আছে? বাস থামানোর জন্য সড়কে বা মহাসড়কে কোথাও বাস-বে আছে? উদ্যোগ নিলে এক বছরে অনেক কিছুই করা যেত। সাধারণ মানুষের কোনো সংগঠন নেই। তাই তারা ক্ষোভ প্রকাশ করতে পারে না। কিন্তু পার্কিংয়ের জন্য কোনো মোটরযান মালিককে যখন হাজার টাকা জরিমানা দিতে হবে, তখন আস্তে আস্তে তার মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হবে। অধিকসংখ্যক লোকের ক্ষোভ সৃষ্টি হলে তার বিস্ফোরণও হতে পারে।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here