হতদরিদ্রের ঘর বরাদ্দে দুর্নীতি

রাহুর গ্রাসে গরিবের ঘর

কোনো কোনো স্থানে জনপ্রতিনিধি ও তাদের আত্মীয়স্বজন এবং প্রভাবশালীদের নামে বরাদ্দ * এ পর্যন্ত ঘর দেয়া হয়েছে ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৪ গৃহহীন পরিবারকে * অপরাধীদের ছাড় দেয়া হবে না – ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী

0
11

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় হতদরিদ্রের ঘর শোভা পাচ্ছে চেয়ারম্যান-মেম্বারদের (ইউপি সদস্য) বাড়ির আঙ্গিনায়।

দুর্যোগ সহনীয় প্রকল্পের দুটি ঘর নিয়েছেন উপজেলার চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ নিজেই। বরাদ্দ নিয়েছেন ভাতিজা সিদ্দিকুর রহমান ও মামাতো ভাই মোখলেছুর রহমান মঞ্জুর নামে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ওইসব ঘর নিয়েছেন মেম্বারসহ সমাজের বিত্তবানদের অনেকে।

প্রায় একই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নের অন্তত তিনজন মেম্বারের বিরুদ্ধে। যারা গরিবের এসব ঘর নিজেরাই নিয়েছেন। সরকারি তদন্তেও মিলেছে অভিযোগের সত্যতা। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

এমন চিত্র শুধু জামালপুর বা নাটোর জেলার নয়; সারা দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এসব প্রকল্পের আওতায় ঘর বরাদ্দ নিয়ে উঠেছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ।

হতদরিদ্রের এসব ঘর কোনো কোনো স্থানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, তাদের আত্মীয়স্বজন ও এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অনেকে বরাদ্দ নিয়েছেন।

এভাবেই রাহুর গ্রাসে চলে যাচ্ছে গরিবের ঘর। ফলে দেশের গৃহহীন দরিদ্র মানুষের মাথা গোঁজার সুযোগ করে দিতে প্রধানমন্ত্রীর এ উদ্যোগ ভেস্তে যেতে বসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গেছে, হতদরিদ্র পরিবারের জন্য সরকারের তিনটি প্রকল্পের মাধ্যমে সারা দেশের ২ লাখ ৯ হাজার ৫১৪টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর দেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ২৮ হাজার ৬১২টি গৃহহীন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে। যাদের কমপক্ষে ২ শতাংশ জমি রয়েছে শুধু তাদেরই এই ঘর দেয়া হচ্ছে।

চলতি অর্থবছর (২০২০-২১) আরও ৫০ হাজার পরিবারকে এই ঘর করে দেয়া হবে। অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত এক লাখ ৫৩ হাজার ৭৭৭টি ‘জমি আছে ঘর নেই’ এমন পরিবারকে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুচ্ছগ্রাম প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ২৭ হাজার ১২৫টি ভূমিহীন পরিবারকে ঘর করে দেয়া হয়েছে।

হতদরিদ্রের ঘর বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকারও করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান। সম্প্রতি তিনি বলেন, দুর্যোগ সহনীয় বাড়ি প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের নিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে দুর্যোগ মন্ত্রণালয়।

যাতে গৃহহীন মানুষ মাথা গোঁজার একটু ঠাঁই পান। অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। আপনারাও সুনির্দিষ্ট তথ্য দিয়ে রিপোর্ট করুন, আমরা সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব। এ বিষয়ে কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।’

এ পর্যন্ত কতগুলো অভিযোগ পেয়েছেন-জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘এখনও লিখিতভাবে কোনো অভিযোগ পাইনি। অনেকে টেলিফোনে জানান, কেউবা সরাসরি এসে মৌখিক অভিযোগ দেন। পত্র-পত্রিকার নিউজ দেখেও আমরা তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশনা দিই।’

২০১৮-১৯ অর্থবছরে গৃহহীনদের জন্য দুর্যোগ সহনীয় বাসগৃহ নির্মাণ প্রকল্পে চরগোয়ালিনী ইউনিয়নের নামে ৮টি ঘর বরাদ্দ পায়। সেই বরাদ্দ থেকে চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে ভাতিজা সিদ্দিকুর রহমানের নাম ব্যবহার করে নিজ বাড়িতে সরকারি ঘর নির্মাণ করে ব্যবহার শুরু করেছেন।

আর অপর ঘর তার মামাতো ভাই মোখলেছুর রহমান মঞ্জুর নামে বরাদ্দ দিয়েছেন। এ ছাড়া বাকি ঘর মহিলা মেম্বারসহ আশপাশের বিত্তশালীদের মধ্যেই বরাদ্দ দিয়েছেন।

ঘর বরাদ্দে ২০-৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ নেয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে উৎকোচ নেয়ার কথা অস্বীকার করে ইউপি চেয়ারম্যান শহিদুল্লাহ বলেন, ‘আমি দুটি ঘর নিয়েছি। বাকি ঘরগুলো মেম্বাররা দিয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে ইসলামপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মেহেদী হাসান টিটু বলেন, ‘সুবিধাভোগী নির্বাচন করেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করেছি। যারা ঘর পেয়েছেন তারা চেয়ারম্যানের আত্মীয় হলেও গরিব।

একজন মহিলা মেম্বার তার স্বামীর নামে ঘর নিয়েছেন, তিনিও গরিব।’ তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. নায়েব আলী। তিনি জানান, ‘বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি জানান, নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার মশিন্দা ইউনিয়নে ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ‘জমি আছে ঘর নাই’-এমন অসহায়-দুস্থ পরিবারকে ঘর দেয়ার কথা থাকলেও সরকারি এই ঘর নিয়েছেন অন্তত ৩ জন ইউপি সদস্য।

মশিন্দা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের মেম্বার সাহাদৎ হোসেন মোল্লা, ৪, ৫ ও ৬নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার মর্জিনা বেগম এবং ৭, ৮ ও ৯নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা মেম্বার মালেকা বেগমের বাড়িতে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের ঘর নির্মাণ করা হয়েছে।

স্বামীর নামে ঘর বরাদ্দ নেয়া মহিলা মেম্বার মর্জিনা বেগম বলেন, তিনি মেম্বার হলেও তার স্বামী তো মেম্বার না। তাই তার স্বামীর নামে ওই ঘর বরাদ্দ নিয়েছেন। মেম্বার সাহাদৎ হোসেন মোল্লা জানান, ওই গ্রামের নূরনবীর নামে ওই ঘর বরাদ্দ দেয়া হয়।

নূরনবী মারা গেলে ওই ঘর তার বাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে। তিনি নিজেও গরিব বলে দাবি করেন। মশিন্দা ইউপি চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমানের দাবি, ‘যারা ঘর পেয়েছেন তারা আসলেই হতদরিদ্র। এর মধ্যে মালেকা বেগম ইতোমধ্যে মারা গেছেন। এটি নিয়ে তদন্ত হয়েছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে গুরুদাসপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তমাল হোসেন জানান, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে যে ৩ জন মেম্বার ঘর নিয়েছেন তারা প্রকৃতই গরিব।

এ বিষয়ে ইউপি চেয়ারম্যান লিখিত দিয়েছেন। তাছাড়া এ সংক্রান্ত নীতিমালায় গরিব জনপ্রতিনিধিরা এই ঘর নিতে পারবেন না-এমন কোনো নির্দেশনাও নেই।’

দেওয়ানগঞ্জ (জামালপুর) প্রতিনিধি জানান, হতদরিদ্রের এসব সরকারি ঘর বিনা মূল্যে বরাদ্দ দেয়ার কথা থাকলেও জনপ্রতি ২০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা ঘুষ নেয়া হচ্ছে।

জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার চর আমখাওয়া ইউনিয়নের পাটাধোয়াপাড়া গ্রামের মাকছুদা খাতুন (৩২)  জানান, সরকারি ঘর দেয়ার কথা বলে আমিনুল মেম্বার তার কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা নিয়েছেন।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘ঘর তুলতে দেরি হওয়ায় মাকসুদা সাংবাদিকদের ডেকে এসব অভিযোগ করেছেন। বিষয়টি ঠিক না।’

দেওয়াগঞ্জে ঘর বরাদ্দ পাওয়া অধিকাংশ ব্যক্তি জানান, কিছু সংখ্যক ইউপি সদস্য টাকার বিনিময়ে ঘর বরাদ্দ দিয়েছে। টাকা না দিলে ঘর পাওয়া যায় না। নিরুপায় হয়েই তারা টাকা দিয়েছেন বলে অভিযোগ তাদের।

দুমকি (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি জানান, দুমকিতে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর আওতায় হতদরিদ্র গৃহহীন পরিবারকে সরকারি ঘর নির্মাণ করে দেয়ার তালিকা প্রণয়নে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, গত জুনে দুমকি থেকে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে গৃহহীনদের যে তালিকা পাঠানো হয়েছে তার দুই-তৃতীয়াংশ ব্যক্তিই সচ্ছল ও তাদের পাকা, আধা পাকা ও টিনশেডের বসতঘর রয়েছে। একই পরিবারের একাধিক সদস্যের নাম রয়েছে ওই তালিকায়।

ক্ষেত্রবিশেষে ২০-২৫ হাজার টাকা লেনদেনের মাধ্যমে ওই তালিকায় নাম দেয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে দুমকির সহকারী কমিশনার (ভূমি) আল ইমরান বলেন, ‘প্রকল্পের বিধিবিধান অনুসরণেই তালিকা তৈরি হয়েছে। করোনার কারণে শতভাগ যাচাই-বাছাই সম্ভব হয়নি।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান রোববার বলেন, ‘এটি এখন আর গোপন কোনো সংবাদ নয়। সারা দেশেই এমন চিত্র রয়েছে। গৃহহীনদের ঘর যেসব জনপ্রতিনিধি নিয়েছেন তারা সব প্রতিনিধিদের কলঙ্কিত করেছেন।

তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি তাদের আজীবনের জন্য রাজনীতি থেকে নিষিদ্ধ করা উচিত। কারণ, গরিবের ঘর যদি জনপ্রতিনিধি বা বিত্তশালীরাই নেন, তাহলে সরকারের উদ্দেশ্য ভেস্তে যাবে।’

নীতিমালায় না থাকলেও যারা সরকারের এই মহৎ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত, তারা বা তাদের আত্মীয়স্বজনের সুবিধা নিতে পারেন না-এটাই নিয়ম এবং নৈতিকতার বিষয় বলেও মন্তব্য করেন ড. ইফতেখার।

আপনার কমেন্ট এখানে পোস্ট করুন

Please enter your comment!
Please enter your name here